গৃহিণী মায়ের আধিক্য, দেশের উন্নতিতে অবদান কতটুকু?

0

আমেনা বেগম ছোটন:

ইদানীং মাঝেমধ্যেই তর্ক বিতর্ক দেখি, ওয়ার্কিং মম আর হোম মেকার মম নিয়ে। যে যা যুক্তি আছে দেখায় ফেলে, সবাই তাদের যুক্তিতে অটল।

আর ১০টা কাজের মতো প্যারেন্টিংও আপনার বুদ্ধিবৃত্তি, পার্সোনাল স্কিল, অর্গানাইজিং ক্যাপাসিটির উপর ডিপেন্ড করে। একজন বুদ্ধিমতী নারী ক্যারিয়ার সামলে ভালো সংসার মেইনটেইন করেন। হাবাগোবা টাইপ নারী তিনটা কাজের লোক নিয়েও খাবি খেতে থাকে। বাচ্চাকে খেতে পড়াতে মেরে-ধরে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে ফেলে। সুতরাং হোম মেকিং ভালো, না ক্যারিয়ার ভালো, এ তর্ক লাভ ম্যারেজ ভালো, না এরেঞ্জ ম্যারেজ ভালো, এর মতোই অসমাপ্ত থেকে যায়।

সব মা-ই অসাধারণ, এটি একটি মন ভুলানো বাক্য। সব মা-ই তার সাধ্যমতো আন্তরিক চেষ্টা করে, এটাই সত্য। একেক বাচ্চাও একেক রকম, প্যারেন্টিং এক হলেও আউটকাম ভিন্ন হতে পারে।

আমি যখন ড্রাইভিং শিখি, আমার ইন্সট্রাকটর আমাকে শুধু বলতেন, আমেনা দূরে তাকান, ওই দূরের গাছটা দেখেন, ইলেক্ট্রিক পোল দেখেন, তাহলে আপনি রোডের মাপ বুঝবেন, রাস্তা থেকে চোখ ওঠান।

আসেন, এ ব্যাপারটাও একটু দূর থেকে দেখি। উন্নত দেশ বা অনুন্নত দেশে বেসিক ডিফারেন্সগুলি কী কী বলেন তো? শিক্ষা, সামাজিক সুবিধা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এইসব? আরেকটা ব্যাপার কি দেখেছেন? একটা উন্নত দেশ এবং অনুন্নত দেশের নারীচিত্র? আফ্রিকার হীরা বা মধ্যপ্রাচ্যের তেল থাকা সত্ত্বেও তাদের গায়ে উন্নত দেশের তকমা লাগে না। আবুধাবি, সৌদি আরবে টাকার ছড়াছড়ি হলেও বাংলাদেশের এলিট ক্লাসের লক্ষ্য সে দেশগুলি না। তাদের পছন্দ আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ।

কেন?

আচ্ছা, সে দেশগুলি কেন উন্নত? কানাডা বরফে ঢাকা, অস্ট্রেলিয়ার ৭০ ভাগ পণ্য আমদানিকৃত, প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ বলতে যা বুঝায়, এদের সেরকম কিছু নেই। আমি মোটাদাগে যা দেখি, যে অঞ্চলে নারীরা যতো বেশি উপার্জনক্ষম, সেই অঞ্চলই তত উন্নত। ইন্ডিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। নৃশংস সব রেপ কেস সত্ত্বেও মেয়েরা কাজে সুবিধাজনক পোশাক পরছে, কাজ করছে, স্কুটি চালাচ্ছে। সে জায়গায় আমরা যত দিন যায়, নিজেদের আরো ভালো করে কাপড় পেঁচিয়ে ঘরে ঢুকে যাচ্ছি। বাচ্চাকাচ্চা হলে জব ছেড়ে দিয়ে মাতৃত্বের মহান বাণী ছেড়ে ৫-৭ জন লোক এক ছেলের ঘাড়ে উঠে পড়ছি। কাজ না করার ছুতা হিসেবে ধর্মও ব্যবহার করছি, বাইরে গেলে পর্দা থাকবে না। সহিহ পর্দার হাত মোজা নেকাব ঝোলা বোরখা কাজে সহায়ক না। কেউ পেটের দায়ে বাইরে কাজ করতে এলে তাকে বেপর্দা বলে গাল পারছি।

রাস্তার মতো যদি দূরে তাকাই, তখন দেখা যাচ্ছে দেশের বড় একটা অংশ কোন অর্থোপার্জন করছে না। আপনি উপার্জন না করলেও খরচ কিন্তু কমছে না। সত্যি বলতে কী, ঘরে সময় পেয়ে ডেজার্ট ফাস্ট ফুড এইসব রাঁধতে গিয়ে উলটা খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। আপনাকে ৮-৫ টা কাজ করতে বলছি না। কিন্তু এভারেজ দিনে যদি আপনি ৪০০ টাকাও ইনকাম করতেন, একেকটা ফ্যামিলি এক্সট্রা ১২০০০ টাকা মাসে ইনকাম করতো, সেটা দেশের মূল অর্থনীতিতে কত টাকা যোগ করতো? অথবা নাভিশ্বাস ওঠা সেই একমাত্র পুরুষটাও হয়তো হাঁফ ছেড়ে বাঁচতো।

ভাল স্বচ্ছল হাজবেন্ড পেলে হাউজ ওয়াইফ লাইফটা বেটার। আমি ভালো করে রাঁধবো, খাবো, খাওয়াবো। ইন ফ্যাক্ট আমি ভালো খেতে পছন্দ করি। কিন্তু এই সামান্য টুনি রাঁধিবে, টোনা খাইবে’র ইমপ্যাক্ট পড়ছে সারাদেশের উন্নয়নে। বাড়ির মেয়ে বাচ্চাটি শিখছে, আমি রাঁধবো, রাজপুত্র এসে আমাকে বিয়ে করবে, আমি আবার রাঁধবো, তার মেয়েও তাই শিখছে। রাজপুত্র তো দেশে গণ্ডায় গণ্ডায় থাকে না।

সবার সব সুযোগ থাকে না, ক্যারিয়ার সংসার এক সাথে চালাতে হাজবেন্ডের, ফ্যামিলির, শ্বশুর-শাশুড়ির অনেকের সাপোর্ট লাগে। অনেক সময় সব কাজ সামলে ক্যারিয়ার কন্টিনিউ করা মুশকিল হয়ে যায়। ১-৩ বছরের বাচ্চার ওয়ার্কিং মাদারের জীবন ভয়াবহ রকমের কঠিন। সেসব আমরা বুঝি, কিন্তু আপনি যদি কিছু করতেই না চান, বা কিছু না করার আইডলজি প্রমোট করেন, সেটা সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাচ্চার ডে কেয়ার, ম্যাটারনাল লিভ, বেশি বয়সে এমপ্লয়মেন্ট বা বিজনেস অপরচুনিটি এসবের অভাবে অনেকে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পিছিয়ে পড়েন, এসবের ব্যবস্থা আজ নেই, কাল হয়তো হবে। কিন্তু যদি আগেই বলে বসেন, কাজের দরকার নেই, তাহলে কী করে হবে? বুড়ো বয়সে ছেলের বউয়ের মনমতো চলবেন, না ওল্ড হোম যাবেন? নিজের ভবিষ্যতটা একবার ভাববেন না?

নারায়ণগঞ্জ এ আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন চান মিয়া কাকা, শুনেছি তিনি শিক্ষিত ব্যাংকে জব করতেন। উনার দোতলা অসমাপ্ত বাড়ি, দুই ছেলে মেয়ে। উনি মারা গেলেন, কিছুকাল পর আমার বাবাও মারা গেলেন, আমার মা স্কুল টিচার, কাকী সাধারণ গৃহবধু। উনারা পেটে-পিঠে চললেন। আম্মু আমাদের পড়ালেন, আব্বুর পাওয়া টাকায় বনশ্রীতে জায়গা কিনলেন। চান মিয়া কাকার ছেলে লেখাপড়া ছেড়ে বখাটে হয়ে গেল, শিমু আপা ছিলেন সেরকম সুন্দর। বখাটেদের উৎপাত শেষে কোনো ধনী গৃহে বউ হয়ে তাদের জীবন আর এগুলো না। আম্মু একলা হাতে সব গুছিয়ে আনলেন। এখনো আম্মু আমার ভাইদের উপর ডিপেন্ডেন্ট না, যদিও ভাইরা সংসারের দায়িত্ব নিয়েছে, তবুও আম্মুর কথাই আমাদের বাড়িতে শেষ কথা।
কী বুঝলেন?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

লেখাটি ১,৭৫৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.