‘পাশ করলে মিষ্টি, ফেল করলে জুতা পেটা, এই যখন পরীক্ষা’

0

দিলশানা পারুল:

থ্রি ইডিয়টস মোটামুটি সবাই আমরা দেখেছি। ওইখানে রাজকুমার হিরানী এক কথায়, অসম্ভব সুন্দর করে আমির খানের মুখ দিয়ে বলে দিয়েছেন, পরীক্ষার উদ্দেশ্য আসলে কী!
আমির খান বললেন, কারো যদি রোগ হয়, তাহলে কী করা উচিত? তার ব্লাড টেস্টের রিপোর্ট্ সবার মধ্যে ঝোলানো উচিত, নাকি সেই মতো তাকে চিকিৎসা দেয়া উচিত?

আমার সাড়ে পাঁচ বছরের ছেলে এই দেশে ট্র্যানজিশনে পরে মানে ক্লাস ওয়ানে যাবে। ওর দাদী ওকে জিজ্ঞেস করলো, দাদা তুমি কেমন করছো? তুমি কি ওইখানে ফার্স্ট-সেকেন্ড হচ্ছো? আমার ছেলে গম্ভিরভাবে উত্তর দিলো, “দাদী, ইটস নট এ রেস। এইখানে কেউ ফার্স্ট-সেকেন্ড হয় না।” এইটুকু ছেলের এইটা বলার কথা না, তার মানে এইটা ওদের স্কুলে শিখানো হয়।
শিক্ষায় পরীক্ষা বা যাচাইয়ের উদ্দেশ্য কে প্রথম, কে দ্বিতীয়, কে তৃতীয় এইটা জানা না। এক কথায় পরীক্ষার উদ্দেশ্য শিক্ষার্থী শিখতে গিয়ে কোথায় সমস্যা হচ্ছে, সেইটা চিহ্নিত করা। কেন সে পারছে না, বা পারলো না, সেইটা চিহ্নিত করে তাকে শিখতে সহযোগিতা করা।

কিন্তু আমাদের দেশে পরীক্ষার নামে আসলে কী হচ্ছে? শিক্ষক প্রথমে পরীক্ষার ফলাফলের নামে শিক্ষার্থীকে চূড়ান্ত রকমের হিউমিলিয়েট করে বলছেন, এই যে তোর রেজাল্ট দেখছিস? তোর তো পড়াশোনা করার যোগ্যতাই নাই।
আমাদের বাবা-মারা তো আরও এক কাঠি সরেস। পুত্রের রেজাল্টের শোকে মা পা বিছিয়ে কাঁদতে লেগে যান, আর বাবা সোজা জুতা পেটা করতে লেগে যান, রেজাল্ট কেন খারাপ হলো। আমার কথা হলো, আপনি রেস যদি দেখতে চান, ঘোড়া দৌড়ের ময়দানে যান, শিক্ষা পদ্ধতিতে আইসেন না। কিন্তু শিক্ষার্থী কেন খারাপ করলো? কোথায় সমস্যা ছিলো? সেইটা আমরা কেউ কখনো ভাবি কিনা? না, শিক্ষার্থীদের কথা কেউই ভাবে না। শিক্ষকরা ভাবেন না, বাবা মা ভাবেন না, রাষ্ট্র তো ভাবেই না।

আমরা সকল দোষ ১০ বছরের একটি শিশুর ঘাড়ে দিয়ে নিজেরা স্পিকটি নট হয়ে বসে থাকি।
ক্লাস ওয়ানে যে শিশুটি পড়ে, তার বয়স কত? ছয় বছরের একটি শিশু যখন পারে না, তখন তার দায় কার? আরে ওতো বোকা, মাথায় বুদ্ধি কম, বাসায় ওর মা ওকে ঠিকমতো পড়ায় না, আরো কত ইত্য কাহানি। আসলে দায় কার? আপনার শিশু যে বয়সে যা পারার কথা, তা যখন পারে না, সেই দায় আপনার শিশুর বা আপনার না। সেই দায় শতকরা একশ ভাগ স্কুলের এবং এডুকেশন সিস্টেমের। ফেল করা শিক্ষার্থী আমাদের এডুকেশন সিস্টেমের ভিকটিম বই আর কিছু না। এই যে শিশুটি যে পারলো না, বা পারছে না সেইটা কেন? এইটা বুঝতে না পারার দায় শিক্ষকের, একক ভাবে শিক্ষকের। শিক্ষক যে বুঝতে পারলেন না শিশুটি কেন পারছে না , শিশুটির প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে সহযোগিতা করতে পারলেন না, তার পিছনে দায়ী এডুকেশন সিস্টেম।

বিদ্যমান এডুকেশন সিস্টেম একজন শিক্ষককে সেই দক্ষতাটুকু দেয় না এবং সেই সহযোগিতাটা করতে পারে না, যেটুকু হলে একজন শিক্ষক একজন ছাত্রকে ঠিকঠাক মতো শিখাতে পারেন।

এইবার আসি পরীক্ষা বলতে বিদ্যমান শিক্ষা সংস্কৃতিতে আমরা আসলে কী বুঝি? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষা মানেই একজন শিক্ষার্থী যে পারে বা পারে না, কার চেয়ে কে বেশি পারে, কে কে কম পারে, কে কে বেশি পারে, কয়জন ফেল আর কয়জন পাশ এইগুলা স্টাবলিশ করা এবং জনসম্মুখে দেখিয়ে বেড়ানো।

কেনো, পাশ-ফেল জেনে শিক্ষক আপনি কী করবেন? শিক্ষক একদলকে আহলাদ দেবেন, আরেক দলকে তিরষ্কার করবেন। বাবা মায়েরা শিক্ষার্থীর পাশ ফেল জেনে কী করবেন? হয় মিষ্টি বিলাবেন, নয় জুতা পেটা করবেন। আর আমাদের রাষ্ট্র পাশ-ফেলে জেনে কী করে? বগল বাজায়। লিটারেলি রাষ্ট্র এক দুই করে গোনে কয়জন জিপিএ ফাইভ পেলো, তারপর নিজের অর্জনে আত্মতুষ্টিতে ভুগে।

কিন্তু পরীক্ষার আসল মানে কী, আমি পরীক্ষা কেন নেবো এবং নেয়ার পর আমার দায়িত্ব কী, সেই জায়গাগুলো থেকে আমরা শত হস্ত দূরে থাকি। একজন শিক্ষার্থীকে যাচাই করা মানে আসলে শিক্ষকের যাচাই হয়ে যাওয়া, পুরো এডুকেশন সিস্টেমটার যাচাই হয়ে যাওয়া, এই বিষয়টাই আমরা জানি না। শ্রেণি কক্ষে পড়ানোর পর সব শিক্ষার্থী যখন একভাবে পারে, তখন বুঝতে হবে উনি একজন ভালো শিক্ষক, উনি ভালো পড়িয়েছেন। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী যখন পারে না, তখন বুঝতে হবে শিক্ষক পড়াতে পারেননি।

এইটা মানা না মানার কিছু নাই। আপনি বা আপনারা স্বীকার করেন আর নাই করেন এইটাই ফ্যাক্টস। এখন শিক্ষক বলতে পারেন তিনি যে ঠিকঠাক মতো পড়াতে পারেননি, তার পিছনে অনেক কারণ ছিল। সেই কারণগুলো কী রকম? ক্লাস সাইজ বড় ছিলো মানে শ্রেণি কক্ষে অনেক বেশি ছাত্রছাত্রী, অথবা তার হাতে প্রয়োজনীয় উপকরণ ছিলো না, অথবা তাকে বিভিন্ন কাজে সরকারি দপ্তরে যেতে হয়েছে ফলে তিনি ঠিকঠাক মতো ক্লাসই নিতে পারেননি, অথবা তার প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি আছে। এরকম বিষয় গুলো।

এখন রাষ্ট্র এইখানে একটা জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারে। শিক্ষকের দক্ষতার ঘাটতি থাকলে তাকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে, দাপ্তরিক কাজে তাকে ইনভলভ না করা, যাতে ঠিকমতো ক্লাস নিতে পারে, এক শ্রেণিতে ৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থী না দেয়া, এই রকম ক্রুশিয়াল জায়গাগুলোতে রাষ্ট্র ভূমিকা পালন করবে। রাষ্ট্র যখন ঠিকঠাক মতো তার দায়িত্ব পালন করবে, তখন একজন শিক্ষকের জন্যও তার কাজটি ঠিকঠাক মতো করা অনেকখানি সহজ হয়ে যায়। উনি তখন চমৎকারভাবে শ্রেণি কক্ষে ক্লাস নিতে পারবেন এবং সব শিক্ষার্থী যেন শিখতে পারে, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারবেন। রাষ্ট্র এবং শিক্ষক, এই দুই জন যদি তাদের কাজটি ঠিকঠাক মতো করে, তাহলে একজন শিক্ষার্থী শিখবে না কেন ? আর একজন শিক্ষার্থীকে যদি একজন শিক্ষক ঠিকঠাক মতো শিখাতেই পারে, তখন এই প্রশ্ন পত্র ফাঁস, পরীক্ষায় নকল, সাজেশন নিয়ে পরীক্ষা দেয়া, কোচিং করে পরীক্ষা দেয়া এইগুলার আদৌ কোন দরকার হবে না।

শুরুটা শুরু করতে হবে শ্রেণি কক্ষের ভিতর থেকে, এবং নেতৃত্ব দিতে হবে শিক্ষকদের। আর রাষ্ট্রকে পটের বিবি হয়ে বসে থাকলে আসলে হবে না। তার যেটুকু করণীয়, সেইটুকু অন্তত করতে হবে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 366
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    370
    Shares

লেখাটি ৭১৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.