মেয়েশিশুর প্রথম নরক তার পরিবার

0

শেখ তাসলিমা মুন:

মেয়েটি প্রথম শিকার হয় তার পরিবারে। খুব কাছের কেউ তার সাথে প্রথম বিশ্বাসঘাতকতাটি করে।
একটি মেয়ের বেড়ে ওঠার মনোজগতিক যুদ্ধটি কঠিন। বয়োসন্ধিক্ষণের একাকীত্ব নিদারুণ। এ সময় তার শরীর এবং মনে এমন কিছু বিষয় ঘটে, এ সময়ে খুব সহজেই সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া তখন তার জন্য খুব সহজ।
পরিবারের বিশ্বস্ত কেউ, সম্মানিত কেউ একাকী মেয়েটির দুর্বোধ্য সময়ের পাশে এসে দাঁড়ানোর ভান করে। মেয়েটির সে সময়টি থাকে সংবেদনশীল।

পরিবারের অবহেলা স্নেহহীনতা তাকে একটি দুর্বোধ্য সময়ের ভেতর রাখে। গর্ভধারিণী জননীও যেন তখন দূরের কেউ। তার শরীর এবং মনের দুর্বোধ্য কষ্টগুলোর সুযোগ কেউ নেয় পূর্ণভাবে। উল্লেখ্য এ সময় তাদের মনোযোগ পাওয়ার আকাঙ্খা খুব কাজ করে। অথচ ঠিক এ সময়েই থাকে অবহেলিত। সংসারে তারা ঝঞ্ঝাট এবং বিরক্তির বিষয় হয়ে ওঠে। কোনকিছুর ব্যাখ্যা সে ঠিকমত পায় না। চারপাশে প্রশ্নবোধক চিহ্নের ছড়াছড়ি। বড়দের পৃথিবীটা তার জন্য এতো রহস্যে ভরা থাকে, আর তার সাথে নিজের শরীরে ঘটা পরিবর্তনগুলো তাকে নিজেকে ঘৃণা করতে শেখায়। সে বিষণ্ণতায় নিমজ্জিত হয়। এ সংবেদনশীলতার সুযোগে কোন বিশ্বাসভাজন আত্মীয় কাছে আসে। তাকে গুরুত্ব দেয়। তাকে অনুভুতি দেয়, সে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অ্যাডরেবল একজন মানুষ। এটুকুর জন্য সে তৃষ্ণার্ত থাকে। আস্তে আস্তে কিশোরী মেয়েটি কোনো চাচা মামা বা আরও কোনো ঘনিষ্ঠ কারও সান্নিধ্যে চলে আসে। থাবাটি তার উপর তখনই বসে।

এ বয়সে প্রকৃতপক্ষে ক ঘটে? মেয়েটির শরীরে নানান পরিবর্তন ঘটলেও সে থাকে সম্পূর্ণ একজন শিশু। এ সময় তার পরিচর্যা দরকার সবচাইতে বেশি। প্রকৃতপক্ষে সে তখনও শিশু। ঋতুচক্রের ধাক্কা বেশ জোরে সোরেই আসে তার কাছে। হঠাত বড়দের পৃথিবীর একটি দরোজা ওপেন হওয়ায় সে হতবিহবল হয়ে পড়ে। বড় হওয়াকে ঘৃণা করে। সে চুপসে যায়। সে কাতর হয়ে পড়ে। সব কিছুর নিজেকে দায়ী মনে করে। নিদারুণ মনোযাতনায় ভোগে। এ সময় পরিবারের মা বা বড়রা যে ভুলটি করেন, সেটি হলো, তারা মনে করে সে বড় হয়ে গেছে। তাকে বড় হবার নানান এসাইনমেন্ট দেওয়া শুরু করে। মূলত সে থাকে একটি শিশুই। শিশু যেভাবে বুঝতে পারে তাকে সেভাবেই বুঝাতে হবে পরিবর্তনটি। শরীরের এ সময়ের করণীয়গুলো তার উপর না চাপিয়ে পরিবারের বড়দের গ্রহণ করা দরকারি। তাকে ধীরে ধীরে বিষয়টির সাথে অভ্যস্ত করতে হবে ভালবাসা এবং পরিচর্যার সাথে। তাকে এ সময় সঙ্গ দেওয়াও দরকারি। এ সময় তাকে একাকী করা ভুল। তাকে আনন্দে রাখা দরকার পরিবারের। এ সময় তার আত্মবিশ্বাসের সিঁড়িগুলো তৈরি করে দেওয়া মা এবং পরিবারের বড়দের খুব দরকারি একটি কাজ।

যদিও একটি মেয়ে তার জীবনব্যাপী যৌনসন্ত্রাসের শিকার থাকে কিন্তু শিশু ও কৈশরের ঘটনাকে অতিক্রম করতে তার সময় লাগে সারাজীবন। এ সময়ের একটি ঘটনা তার জীবনকে তছনছ করে দিতে পারে। আমি অনেক মেয়েকে জানি, ছোটবেলায় তবু সে সেগুলো চাপা দিয়ে জীবন চলেছে। কিন্তু এ বয়সে এসে তারা সাফার করছে বেশি। ছেলেমেয়ে হয়ে গেছে। তারা বড় হয়ে গেছে। কিন্তু সেই শিশু বয়সের নাইটমেয়ার তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

আমাদের বাবামায়ের জন্যও সন্তান পালনের এ সময়টি থাকে অনভিজ্ঞতার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাঁরাও অবাক বনে যান, হতভম্ব হয়ে যান, তাঁদের এই সেদিন জন্ম নেওয়া শিশু বাচ্চাটির পিরিয়ড শুরু হয়ে গেল? মায়েরা এ বিষয়টি মেনে নিতে পারেননা। তাঁদের ভেতরও একটি যুদ্ধ চলে। মেয়ে বড় হয়ে গেছে অথচ মা হিসেবে তার রোল নিয়ে তিনি ততটা দক্ষ হয়ে ওঠেননি। সে মিশ্র অনুভব অনুভবের প্রভাব পড়ে মেয়েটির উপর। অনেক্ষেত্রে নিষ্ঠুরতার শিকার হয় মেয়ে। ‘এইতো সেদিন মেয়েটি হামাগুড়ি দিয়ে উঠলো। কবে কখন সে গায়ে পায়ে বেড়ে গিয়ে রীতিমত ‘সাবালিকা’ হয়ে উঠলো?’ এ হতবিহবলতা কাটাতে তারা মেয়ের প্রতি কঠোর হয়ে উঠতে দ্বিধা করেননা।

অস্ট্রেলিয়ান ছবি দ্য থরন বার্ডস দেখেছিলাম। আমরা যারা ছবিটি দেখেছি ম্যাগি চরিত্রের সাথে একাত্ব হয়নি এমন মেয়ে খুব কম আছে। বয়োসন্ধিক্ষণের সে সংবেদনশীল সময়ে পরিবারের বন্ধু পাদ্রী ‘ফাদার’ এর প্রতি নির্ভরশীলতা ম্যাগি সারাজীবন কাটাতে পারেনি। এ গল্প আমাদের কার নয়?

একটি মেয়ের জীবনে বাবা রোল যে কতখানি দরকারি আর এ অভাবের সুযোগ নিয়ে মেয়েটির জীবনের সবচাইতে ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটায় পরিবারের খুব কাছের জন।

(লেখাটি শেখ তাসলিমা মুনের ব্লগ থেকে নেয়া)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 438
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    442
    Shares

লেখাটি ২,১৬৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.