প্রবাসে হকারগিরি আর বাঙালির মান সম্মান!

0

ফারজানা আকসা জহুরা:

অনেকে বলেন যে, প্রবাসে হকার’রা নাকি বাংলাদেশের মান সম্মানের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে! আর এইসব লোকদের (ছোট লোক) জন্যে এলিট শ্রেণীর প্রবাসী বাঙালিরা বিদেশীদের কাছে মুখ দেখাতে পারছেন না! কারণ বিদেশীরা নাকি ভাবেন যে, সব বাঙালি বুঝি হকারগিরি করেন!

আচ্ছা, ইউরোপ-আমেরিকায় যারা আসেন, তারা সবাই কি দেশের নাম করতে পারেন? এই যে, কত উচ্চ শিক্ষিত লোক ইউরোপে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থী হয়, তারা কি দেশের মান সম্মান বৃদ্ধি করেন? রিফুজি হওয়া কী কোনো সম্মানিত স্ট্যাস্টাস?

না আমি বলছি না যে, হকারি করা ভালো কাজ। কিন্তু আমি এটাও তো জোর গলায় বলতে পারি না যে, প্রবাসী হকার’রা বাংলাদেশের মান সম্মানের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছেন!

আসলে কিছু শিক্ষিত মানুষের মান সম্মান থাকে পোশাকে, পেশায় আর টাকায়। সততা আর পরিশ্রম তাদের কাছে অগ্রাহ্য। দুর্নীতিগ্রস্ত বাংলাদেশের দুর্নীতিতে জড়িত উচ্চশিক্ষিত কোট-টাই পরা লোকেরাই তাদের কাছে সম্মানিত! আর দরিদ্র কৃষকরা খাদ্যের যোগান দিয়েও চাষাভুষো, মানে ভদ্র সমাজের গালি হয়েই থেকে যায়!

উচ্চশিক্ষিত ডাক্তারের কারণে যখন হাসপাতালের সামনেই নারী বাচ্চা প্রসব করেন, তখন দেশের মান সম্মান নষ্ট হয় না। যখন স্বাধীন বাংলাদেশে দিনে রাতে ধর্ষণ, খুন আর গুমের মতো ঘটনা ঘটে, তখনো দেশের মান সম্মান নষ্ট হয় না। কিন্তু দারিদ্র্য পিষ্ট বেকার জনগণ যখন দেশে/বিদেশে এসে হকারের কাজ শুরু করেন, তখনই তাদের সম্মানহানি হয়!

অশিক্ষিত কৃষক আর গার্মেন্ট শ্রমিকদের কারণেই দেশের অর্থনীতি সচল আজ। আর অর্ধশিক্ষিত প্রবাসী কামলা আর হকারদের পয়সায় ব্যাংকের রিজার্ভ ফুলে ফেঁপে ওঠে। কিন্তু এই অর্থে বেতন-ভাতা বাড়ে উচ্চ শ্রেণীর শিক্ষিত আমলাদের! অথচ তৈরি হয় না সবার জন্য নতুন নুতন কর্ম সংস্থান। তেলা মাথায় আরো ভালো করে তেল দেওয়া হয়! অন্যদের জন্য থাকে না কিছুই!

পর্যাপ্ত কর্ম সংস্থানের অভাব, দারিদ্রতা আর বেকার সমস্যায় জর্জরিত মানুষেরা যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে আসেন, তখনও এলিট শ্রেণীর শিক্ষিত জনগণের টনক নড়ে না। তখন তারা সরকারি টাকায় বৌ বাচ্চা নিয়ে বিদেশ ভ্রমণে ব্যস্ত থাকেন। দেশের মানুষ না খেয়ে থাকলে থাক, দেশের কথা কে চিন্তা করে? তারা তো সাতদিনব্যাপি রাজকীয় বিয়ের অনুষ্ঠান করে স্ট্যাস্টাস দেখান!

প্রবাসে যারা একটু শিক্ষিত হয়ে আসেন, তারা হয়তো ভাষা শিখে ভালো কাজ যোগাড় করতে পারেন। অন্য যারা অশিক্ষিত কিংবা অল্পশিক্ষিত, তারা সেটা পারেন না। আর তাই তারা হকারের কাজ করেন। আবার কিছু শিক্ষিত লোকেরাও প্রথম প্রথম কাজ না পেয়ে এই একই কাজ করেন। পরবর্তীতে ভালো কাজ পেলে ছেড়ে দেন। অনেকে হয়তো কাজ চলে যাওয়ার কারণে আবার হকারি পেশায় ফেরৎ আসেন। আর যাদের কাগজ হয়নি, তারা হকারি ছাড়া আর কীই বা করবেন?

যে কারণেই হোক, হকাররা হকারি করে আরাম আয়েশ করেন না। হকারি কোনো সমাদৃত পেশা না। নিতান্ত বাধ্য হয়েই তারা এটা করেন। চক্ষু লজ্জা বিসর্জন দিয়েই কাজটি করেন। আর এই কষ্টে অর্জিত টাকাটা তারা দেশে পাঠান। মা-বাবা ভাই-বোন কিংবা বৌ-বাচ্চার জন্যে। তাদের পেট চালানোর জন্যে।

তবুও আপনারা বলেন যে, প্রবাসী হকারদের জন্য আপনার মান-সম্মান নষ্ট হয়! আপনারা ভাবেন, গরিব মানুষ না খেয়ে মরুক, দেশে বসে মরুক। বিদেশ এসে আপনাদের ভাষায় এমন নিকৃষ্ট ধরনের করবে? এতে যে আপনাদের মান-সম্মান ডোবে! অথচ ভাবেন না যে, কেন মানুষ দেশান্তরী হয়? কেন এতো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেয়? বিদেশে এসে আনন্দ ফুর্তি করবে বলে? নাকি একটু জীবনের আশায়?

দেশে যদি বেকার সমস্য না থাকতো ,তাহলে কী এতো শিক্ষিত লোকেরা বিদেশে আসতো? সরকার যদি দারিদ্র বিমোচনের জন্য সঠিক ব্যবস্থা নিতো, যদি দেশের মধ্যে পর্যাপ্ত কর্ম সংস্থান তৈরি করতো, তাহলে কী এতো মানুষ অবৈধ উপায়ে দেশান্তরী হতো?

কেন স্বাধীন ৪৬ বছর পরেও আমাদের খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান ও শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদাগুলির কোনো নিশ্চয়তা নেই? কেনো স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ সাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশে আসতে হয়? কোন সেই অন্ধকার গলি, যাতে প্রতিবছর নারী শিশু বিদেশে পাচার হয়? কেন স্বাধীন বাংলাদেশের নারীদের গৃহপরিচারিকার নামে রক্ষিতার চাকরি করতে হয়? কারা আমাদের এই দুর্দশার জন্য দায়ী? কারা এই অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির সাথে জড়িত? এই প্রবাসী হকাররা? গ্রামের চাষাভুষারা? নাকি শিক্ষিত এলিট শ্রেণী? সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আর আমলারা?

আপনারা শিক্ষিত এলিট শ্রেণীর মানুষ, গরিব দেখলেই আপনাদের রাগ হয়! রাস্তার পাশে নেংটা বাচ্চা দেখলে গা ঘিনঘিন করে! রোদ বৃষ্টিতে ভেজা অসহায় গরিব দেখলে মেজাজ খারাপ হয়! ভাবেন, এরা আপনাদের সাজানো গোছানো সুন্দর পরিবেশটা নষ্ট করছে! কখনও কি ভেবেছেন এরা কোথায় যাবে? কিভাবে এই সমস্যার সুন্দর সমাধান করা যায়? নাকি আপনারা ভাবেন, গরিবের জন্মই তো আজন্ম পাপ! তাদের আবার জীবন কিসের? হোক না তা দেশে, কিংবা মানবাধিকারের দেশে !

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 659
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    661
    Shares

লেখাটি ১,৮০০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.