একজন যোদ্ধার ডায়েরি (চতুর্থ পর্ব): কিছু কথা, কিছু চিন্তা!

tania morrshed
তানিয়া মোর্শেদ

তানিয়া মোর্শেদ, অগাস্ট ১৫, ২০১২: দীপ্ত বাবার সাথে অফিসে গেছে। আজ তার বাবার কর্মক্ষেত্রে সন্তানদের নিয়ে যাবার দিন (কিডস টু ওয়ার্ক ডে)। এ’দিন সন্তানরা বাবা/মা’দের কাজের জায়গায় যায়, কিছুটা ধারণা পাবার জন্য বাবা/মা’রা কোথায়/কিভাবে কাজ করেন সে বিষয়ে। বাচ্চাদের আনন্দ দেবার জন্য কিছু ব্যবস্থাও করা হয়। দীপ্ত প্রথমবার গিয়েছিলো যখন ওর বয়স ২+। প্রতি বৎসরই যাচ্ছে। ও যাবার সময় ওর গালে, কপালে চুমো দেবার সময় মনে হলো, ও যখন নিজের কর্মক্ষেত্রে যাবে তা আমার দেখবার সামান্যতম সম্ভাবনা আছে কি?!

“নেই” শব্দটিই টানছে আমায়। দুপুরে আর্ট ক্লাস করে ফিরবে। গতরাতে ঘুমুবার আগ মুহূর্তে দীপ্ত জিজ্ঞেস করলো, আমি সারাদিন একাকী ঠিক থাকবো কিনা (ওর এখন স্কুলে গ্রীষ্মের ছুটি, বাড়িতে থাকছে সারাদিন)। সকালে বাবাকে প্রথম যে কথাগুলো বললো তার একটি হচ্ছে, তার নানার মাথা থেকে ডাক্তার ফ্লুয়িড বের করেছেন। কথাটি ঘুমুতে যাবার আগে শুনেছিল। আমি আম্মার সাথে কথা শেষ করবার পর সে জানতে চেয়েছিল তার নানা কেমন আছেন (আব্বা বেশ ক’দিন ধরে হাসপাতালে)। ঘুম থেকে উঠেই নানার কথা মনে করেছে।

রোযা শুরু হ’বার পর ক’দিন এক কথা শুরু করলো, সে রোজা রাখতে চায়। আমি বলেছি, তোমার রোজা হচ্ছে, ল্যাপটপ, সব ধরনের গেইমস না খেলে থাকা। তার কথা হচ্ছে না খেয়ে থাকলে সে বেশী করে বুঝবে কিছু না পাবার কষ্ট। এর জন্য তার ল্যাপটপ/গেইমসের আসক্তিও কমে যাবে। হয়ত ঠিক, তবে পরীক্ষা করা হচ্ছে না, জানিয়ে দিয়েছি। তার বাবার আমার থেকে কিছুটা ভিন্নমত এ বিষয়ে। কয়েকটি রোজার পরামর্শ দিয়েছে। আমার কথা হচ্ছে, কারো জুতায় না হাঁটলে বোঝা যায় না তার কষ্ট সঠিকভাবে তা কতটুকু। তবে অনুভূতিশীল মানুষ হবার জন্য, সবার সব জুতোয় হাঁটাই জরুরি নয়। আমার ধারণা, মানুষ জন্মগতভাবে অনুভূতিশীল (কেউ বেশী, কেউ খুব বেশী, কেউ কম, কেউ খুব কম ইত্যাদি)। এটি চর্চা/সাধনা করে অর্জিত হয় না। একমাস রোজা রাখবার পরেও কতজনের মানসিকতার পরিবর্তন হয়! অথচ হ’বার কথা। রোজার মাসেই বাংলাদেশে খাবার নিয়ে বাড়াবাড়ি দেখি। ঈদে পোশাক নিয়ে বাড়াবাড়ি দেখি। পরিমিতি বোধ নিয়েও আনন্দ করা/পাওয়া যায়।

ক’দিন আগে এক বন্ধুর বাসায় পূজার নিমন্ত্রণে যাবার আগে দীপ্ত’র কিছু প্রশ্নের উত্তর দিলাম। আরেকদিন রোজা ইত্যাদি বিষয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর দেবার সময় বলেছি, ধর্ম (সব ধর্ম) নিয়ে প্রাথমিক জ্ঞান অবশ্যই রাখতে হবে, তা নাহলে অজান্তে কারো মনে আঘাত দেবার আশংকা থাকবে। বেশ ক’ বৎসর থেকে সে শুনে আসছে, ধর্ম মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। ধর্মে বিশ্বাস থাকা বা না থাকা/ ধর্ম পালন করা বা না করা/ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকা/ না থাকা একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়, অধিকার। সেদিন এক পর্যায়ে বলেছি, ধর্ম নিয়ে খুব অল্প জানাই ভালো, বেশি জানলে কষ্ট পাবে। প্রশ্ন, কেন? বলেছি, সব ধর্মে মেয়েদের ছোট করে দেখা হয়। আবার প্রশ্ন, কি রকম? ক’জন পুরুষ মানুষকে দেখেছো হিযাব পরা? এই গরমে আর ব্যাখ্যা করতে হয়নি হিযাব পরার কষ্ট। এটা বলা হয়নি যে, পুরুষদের একদিন প্রচণ্ড গরমের মধ্যে সারাদিন হিযাব পরিয়ে মেয়েদের প্রতিটি কাজ করতে দিলেই বেশ কিছু মানুষ আর হিযাবের পক্ষে কথা বলবেন না।

আমার হিযাব নিয়ে কথা বলা দেখে কেউ যদি ভাবেন আমি কেন এই বিষয়ে বলছি, অন্য ধর্মের উদাহরণ দিচ্ছিনা ইত্যাদি। তাদের জানবার জন্য বলছি, আমি আত্ম সমালোচনায় বিশ্বাসী। আমি প্রথমে নিজের সমালোচনা করবো, নিজের জাতির সমালোচনা করবো, নিজের সংস্কৃতির সমালোচনা করবো, নিজে যে ধর্মে জন্মেছি তার সমালোচনা করবো (যদি সমালোচনা করবার কিছু না থাকে এসব বিষয়ে, খুব ভালো কথা)। অন্য জাতি, অন্য সংস্কৃতি, অন্য ধর্ম নিয়ে সেই জাতির, সেই সংস্কৃতির, সেই ধর্মের মানুষ কথা বলবেন। না আমি বলছিনা যে অন্য জাতি/সংস্কৃতি/ধর্ম সমালোচনা করবার বিষয়গুলো আমি জানবো না। আমি জানব সব, কিন্তু কিছু বলবো না। যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব, হানাহানি তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ অন্য জাতের/সংস্কৃতির/ধর্মের বিষয়ে কথা বলে/আঘাত করে। একইভাবে হিযাব পরা নিয়ে কোন পুরুষের ব্যাখ্যা আমি শুনবো না। ধর্মের নামে নারীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া নিয়মের যেমন আমি প্রতিবাদ করি (অন্য ধর্মের নারীদের সাথে আমি নীরবে আছি, সরব তাদেরই হতে হবে), একইভাবে সংস্কৃতি/ব্যাণিজ্যের নামে/দেশের নামে শুধু নারী নয়, যেকোনো মানুষের উপর অন্যায়ভাবে কিছু চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদ করি, কখনো সরবে/কখনো নীরবে।

আমার এ’লেখা পরে কেউ যদি ভাবেন যে, আমি হিযাব পরা নারী দেখতে পারি না, ভুল করবেন। আমি যেখানে থাকি সেখানে হিযাবি মানুষই বেশী। তাঁদের অনেকেই আমার ও আমার পরিবারের দু:সময়ে পাশে থেকেছেন, আছেন। কারো পোশাক তার একান্ত ব্যক্তিগত অধিকার। আমি তা পছন্দ করি বা না করি। দু:খ এখানেই, কেউ ধর্মের নামে অতিরিক্ত পরছেন, কেউ স্বাধীনতার নামে অতি সংক্ষিপ্ত পরছেন। কিন্তু বুঝছেন না যে, উদ্দেশ্য একটিই, নারীকে পণ্য/ভোগের বস্তু হিসাবে দেখা। অতি ধার্মিকরা নারীকে ভোগের বস্তু হিসাবে দেখেন বলেই তাকে আপাদমস্তক ঢেকে রাখতে চান (নিজের ভোগের “বস্তুগুলো” আর কেউ চোখ দিয়েও যেন না দেখে)। আর পণ্যবাদী/ভোগবাদী সমাজে স্বাধীনতার নাম দেখিয়ে চোখ দিয়েও ভোগ করতে চান। ভাবনা একটিই, নারী পণ্য, ভোগের বস্তু।

ক’বৎসর আগে দীপ্ত একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, “মা ফেমিনিস্ট কি?” আমি ওর বুঝবার মত করে ব্যাখ্যা করেছি। তারপর প্রশ্ন ,”তুমি কি ফেমিনিস্ট?” আমার সংক্ষিপ্ত উত্তর, “না, আমি তার থেকেও আরো বেশী ভাবি/বুঝি/করবার চেষ্টা করি। আমি মানবতাবাদী। তুমি কি বুঝতে পারছো?” তার আরো সংক্ষিপ্ত উত্তর, মাথা ঝাঁকিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলা!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.