ট্যাবু না ভাঙলে শরীরকেন্দ্রিক শৃঙ্খলে সমাজ আমাকে বাঁধবেই

0

খাদিজাতুল কোবরা ইভা:

মোটর সাইকেলে আমার ভীষণ ভয় ছিলো। এখন যে নাই তা না। ‘পাঠাও’ চালু হওয়ার শুরু থেকে এই সার্ভিস নিচ্ছি আমি। এর আগে আমার বাইক নামে একটা সার্ভিস নিতাম।

আমি আদাবরে থাকি। আমার অফিস তেজগাঁও। তো এই দূরত্বের কষ্ট থেকে পাঠাও আমাকে অনেকাংশে মুক্তি দিয়েছে। শুরুর দিকে প্রতিদিন এক জায়গা থেকে বিভিন্ন জনের বাইকে উঠে যাওয়াটা আশপাশের পরিবেশটাকে অস্বাভাবিক করে তুললেও, এখন আর এমন হয় না। মানে কৌতূহলি চোখগুলো তার উত্তর জেনে গেছে। কিংবা থাকলেও আমার কিছু মনে হয় না।

কিন্তু পরিচিতদের মধ্যে অনেকেই নিজের জায়গা থেকে অস্বস্তির অনেক বিষয় জানান। যেমন, অপরিচিত একটা লোক.. কে না কে, ঘামের গন্ধ, গা ঘেঁষে বসা, যদি অন্যরকম কিছু করে.. এইরকম আরকি। খুব স্বাভাবিক হয়তো এগুলো। অন্যগুলো আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না হলেও এটা তো সত্যি যে, যৌন হয়রানির বিষয়টা ইগনোর করা যায় না। এক্ষত্রে অবশ্য পাঠাও তাদের রাইডারদের কিছু রেস্ট্রিকশানের মধ্যে এনেছে।

আর যেহেতু অর্থযোগের বিষয় আছে, সেকারণে পেশাদারিত্বর জায়গাটাও গড়ে উঠছে। আমার যেটা ভালো লাগছে যে, এরকম একটা সার্ভিসের মধ্য দিয়ে একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠির মধ্যে হলেও, ছোট করে হলেও নারী-পুরুষে, পুরুষে-পুরুষে এক ধরনের আস্থার জায়গা তৈরি হচ্ছে। আগে বাইকওয়ালা ছেলে-পিলে দেখলে কিংবা তাদের ঘো ঘো করে বাইক চালানোর ভঙ্গি তারুণ্যের ঔদ্ধত্য জানান দেয়ার জন্য হলেও……. তাদের ভাবসাব দেখে কেমন একটা ভয় ভয় লাগতো। একটু সতর্কও থাকতাম এসব ছেলেপিলেদের কাছ থেকে। পাঠাওয়ের এই সার্ভিসটা এই দূরত্বটাও কমিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, চাকরিজীবী থেকে শুরু করে গ্যারাজের মেকানিক পর্যন্তও তাদের রাইডার। নিরাপদে লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়া তাদের কাজ। তারা এই দায়িত্বটা নিতে পারলে আমাদের অস্বস্তির জায়গাটা কোথায়!

শুরুতেই বলছিলাম যে পাঠাও সবার জন্য না…হ্যাঁ, তাদের কথা বলেছি, যারা ভাবেন আমার একটা শরীর আছে, উহ অন্যের একটা স্পর্শ লাগলে কেমন হবে, কীরকম ঘেন্না ঘেন্না লাগবে, এইসব যারা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেন নাই, তাদের জন্য আসলে পাঠাও না।

বাসেও পাশে একজন বসলে তারও গায়ের সঙ্গে গা লাগে..তো কী! নির্ভরতার জায়গা তৈরি হতে সময় লাগে, কিন্তু আগে তো আমার শরীরের খোলস থেকে আমাকে বের হতে হবে। আমরা চাকরি করছি, একা একা ঘুরছি, আড্ডা দিচ্ছি….আমি আমার স্বাধীন মতো পোশাক পরার কথা বলছি, স্বাধীন মেলামেশার কথা বলছি। কিন্তু আমার শরীরেই যদি আমি বন্দী থাকি, তবে আমাকে কে মুক্ত করবে? নারী শরীরকে শুদ্ধ-অশুদ্ধ-বিশুদ্ধর ট্যাবু থেকে না বের হলে শরীরকেন্দ্রিক শৃঙ্খলে সমাজ তো আমাকে বাঁধবেই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 450
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    452
    Shares

লেখাটি ১,২৮৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.