“নারী, তুমি প্রতিবাদী হও, সাবধানে থাকো”

সালমা তালুকদার:

এই মুহুর্তে মনে করতে পারছি না ঘটনাটা কারো কাছ থেকে শুনেছি, নাকি কোনো একদিনের পেপারে পড়েছি! কিন্তু ঘটনাটা মনে খুব দাগ কেটেছে বলেই আজকে লিখছি।

ফেইসবুকে ছেলেটার সাথে মেয়েটার পরিচয়। দুই বছরের পরিচয়ে সম্পর্ক অনেকটাই ঘনিষ্ঠ হয়। যার কারণে ছেলেটার ডাকে সাড়া দিয়ে মেয়েটা চট্টগ্রামে দেখা করতে যায়। ছেলেটা তার পরিচিত এক বন্ধুর রুমে মেয়েটাকে নিয়ে যায়। এবং দুজনের সম্মতিক্রমেই শারীরিকভাবে মিলিত হয়। কিন্তু তারপরই ছেলেটা একটা কাজের কথা বলে বাইরে যায় এবং যার রুম তাকে পাঠিয়ে দেয়। যে কাজটায় প্রথমে আনন্দ ছিলো, সে কাজটাই মেয়েটার জীবনে বিভীষিকা হয়ে দাঁড়ায়। একটা অচেনা ছেলের দ্বারা মেয়েটা ধর্ষণের শিকার হয়।

এই কথার মাঝেই চলে এলো ভার্চুয়াল যুগ। ভার্চুয়াল যুগের কার্যকলাপ। আমাদের দেশে এখন যেসব অনৈতিক কাজগুলো ঘটছে, তার জন্য কি ফেইসবুক, ম্যাসেঞ্জার, ভাইবার, ইমো দায়ী না? এই প্রশ্ন তুললে পক্ষে-বিপক্ষে লোকজন দাঁড়িয়ে যাবে।

আমি যে আজকে লিখতে বসেছি, আমিও যেকোনো এক পক্ষে খুব জোরালোভাবে দাঁড়াবো। কিন্তু কথা পক্ষ বা বিপক্ষ নিয়ে না। কথা হচ্ছে মানুষের ইমোশন নিয়ে, বিশ্বাস নিয়ে, সর্বোপরি মানুষের মনুষ্যত্ব নিয়ে। ঘরে ঘরে যখন ইন্টারনেটের ব্যবহার ছিলো না, তখনও এসব হতো। হয়তো কম হতো। তাহলে কি ইন্টারনেট ব্যবহার কমিয়ে দিব আমরা? তাই বা কি করে হয়? পুরো বিশ্বটাকে জানতে হবে না আমাদের? যাই হোক, এতো বিস্তারিত আলোচনায় না যাই আমরা।

আজকের এই লেখাটা শুধু মেয়েদের উদ্দেশ্যে লেখা।
ফেইসবুক আমরা চালাই। এবং এর সুবাদে ইনবক্সে ও ফেইসবুক বন্ধুরা নক করে। কথা বলতে চায়। হয়তো কারো কারো সাথে একটা সুন্দর সম্পর্কও তৈরি হয়। কারো দ্বারা উপকৃতও হওয়া যায়। আবার কেউ হয়তো শুধু অশালীন কথা বলার জন্যই ইনবক্সে নক করে। মেয়েরা মায়ের জাত। যারা নির্যাতিতা হয়, তাদের মনটা কোমল থাকে। খুব তাড়াতাড়ি বিশ্বাস করে ফেলে। যার পরিণতি ভয়ানক হয়।

কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে নিজেকে কেন শুধু শুধু বিপদের মাঝে ঠেলে দেয়া! নূন্যতম একটু জ্ঞান কাজে লাগালে এই অঘটনগুলো পাশ কাটানো যায়। নারী-পুরুষ দুই বিপরীত লিঙ্গের মানুষ। প্রাকৃতিক ভাবে আকর্ষণ থাকবেই। তবে প্রথমেই ভাবতে হবে আমরা কিন্তু মানুষ। জন্তু জানোয়ার নই। জন্তু জানোয়ারের বিবেক নেই বলেই সেক্স মেটানোর জন্য কয়েকটা মর্দা গণ্ডার একটা সদ্য যৌবনে পা দেয়া মাদীকে আক্রমণ করে রক্তাক্ত করে শেষ পর্যন্ত মেরেই ফেললো।

কিছুদিন এই খবরটা ভাইরাল হয়ে ঘুরেছে ফেইসবুকে। জরিপে দেখা গেলো, মর্দা গণ্ডারের চাহিদা মেটানোর মতো মাদী যথেষ্ট পরিমাণে নেই। তাই এরকম অঘটন যেন আর না ঘটে, তাই মাদী আমদানী করা হবে। আমাদের সমাজে যেসব পুরুষ এগুলো করে বেড়াচ্ছে, তাদের কি একবারও নিজেকে জন্তু জানোয়ারের মতো মনে হয় না?

এখন এমন অবস্থা হয়ে গেছে পাশ দিয়ে একটা ছোট বাচ্চা মেয়ে, তরুণী মেয়ে, নারী যেই যাক না কেন, অসুস্থ মস্তিষ্কের পুরুষগুলো মনে করে, একদলা মাংস হেঁটে যাচ্ছে। যেন কতদিনের ক্ষুধার্থ, এমনভাবে তাকিয়ে থাকে। যার ঘরে বউ আছে, সেও স্কুল পড়ুয়া, কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের দিকে আকৃষ্ট হয়। ছলেবলে কৌশলে তাকে বিছানায় নেয়ার চেষ্টা করে।

কী শুরু হলো আমাদের সমাজে এগুলো! কেন কেউ প্রকাশ্যে আওয়াজ তুলছে না? এখন আবার শুরু হয়েছে ফেইসবুকের মাধ্যমে শিকার ধরা। মেয়েরা সাবধান। নিজের সম্মান নিজের কাছে। আমাদের দেশে প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ খুব কমই আছে। এখনকার এডুকেশন সিস্টেমে তো আসলে মানুষ প্রকৃত শিক্ষিত হয় না। শিক্ষা মানে কি সেটাই তো জানে না মানুষ। শুধু সার্টিফিকেট জমানোর প্রতিযোগিতা চলছে। বিবেক না থাকলে কি তারা আবার মানুষ হয় নাকি? আর মানুষ না হলে তো এদের কাছে মায়ের জাতিকে মাংসপিণ্ড মনে হবেই। এসব মানুষের বিরুদ্ধে প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের সোচ্চার হতে হবে। এবং সমাজ থেকে এদের নির্মূলের ব্যবস্থা করতে হবে। মনুষ্য সমাজে কোনো জন্তু জানোয়ারের জায়গা হয় কী করে!

একটা মেয়ে হিসেবে মেয়েদের প্রতি অনুরোধ রইলো, নিজের ভালো নিজেকেই দেখতে হবে। সাবধানে প্রতিটা পদক্ষেপ ফেলতে হবে। আমরা নারী বলে দুর্বল না। এটা বুঝিয়ে দিতে হবে। বন্ধু বা জীবন সঙ্গী নির্বাচনে সাবধান হতে হবে। আর অবশ্যই সাময়িক ভালো লাগাকে প্রশ্রয় দিতে গিয়ে ভবিষ্যতের সুন্দর দিনগুলো যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

অনেকে বলে, মেয়েদের জামা কাপড়ের জন্য নাকি মেয়েরা নির্যাতিত হয়। আমার প্রশ্ন কোনো হিজাবী মেয়ে কি ধর্ষণের শিকার হয়নি? আসল কথা হচ্ছে, মনুষ্য সমাজে কতগুলো জন্তু জানোয়ারের জন্ম হয়েছে। যাদের সমূলে ধ্বংস না করলে এই সমাজ সুষ্ঠ সুন্দরভাবে বাঁচার পরিবেশ হারাবে।

তাই সবাইকে এ ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে। মেয়েদের আরো প্রতিবাদী হতে হবে। অশালীন মন্তব্য, অশালীন আচরণের প্রতিবাদ তাৎক্ষণিকভাবে করতে হবে। জন্তুগুলো কয়জনকে ভয় দেখাবে? একজন দুইজন তিনজন? প্রতিবাদী মেয়েদের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে সমাজের এসব অনৈতিক কাজও কমে আসবে। আর একেবারে নির্মূল হবে তখনই যখন প্রতিটা ধর্ষককে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলানো হবে।

জানি না কেন এখনো এই শাস্তি চালু হচ্ছে না বা কার্যকর হচ্ছে না। আর কত বাচ্চা মেয়ে, তরুণী, গৃহিনীর ধর্ষিত রক্তাক্ত লাশের গন্ধ পাওয়া গেলে ধর্ষকের প্রকাশ্য শাস্তি হবে। নির্যাতিতের ক্রন্দনে বাংলাদেশের বাতাস আর কত ভারী হওয়া লাগবে? এখনই তো নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায়। ধন্যবাদ।

প্রাক্তন প্রভাষক(বাংলা বিভাগ)
নর্থ ওয়েস্টার্ন কলেজ

শেয়ার করুন:
  • 397
  •  
  •  
  •  
  •  
    397
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.