মায়ের প্রতি সহিংসতা: বিধ্বস্ত শিশুর মনোজগৎ

ফারহানা আফরোজ রেইনী:

মহুয়ার বিয়ে হয়েছে দশ বছর। এর মধ্যে সে আট বছরের একটি ছেলে ও ছয় বছরের একটি মেয়ে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। স্বামী ব্যবসায়ী, নিজেদের পছন্দের বিয়ে। কিন্তু কী কাণ্ড! বিয়ের পর মহুয়া শোনে, তার স্বামীর নাকি পছন্দের অন্য কেউ আছে!

বিয়ের প্রথম থেকেই মানসিকভাবে তো বটেই, শারীরিক নির্যাতনও চলতে থাকে তার উপর। সম্পর্কটা ভেঙে তাই বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলো সে। কিন্তু পরিবার থেকে বলা হলো, প্রথম প্রথম এরকম হলেও বাচ্চা হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। সে ভরসা আর আশাতেই থেকে যাওয়া। সময় গড়িয়ে দু’দুটি বাচ্চার জন্ম হলেও স্বামী তার আগের জায়গাতেই অনড়। অত্যাচারের মাত্রা তো কমেনি, বরং নতুন নতুন আঙ্গিকে তার প্রকাশ ঘটতে শুরু করেছে।

মহুয়া বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে স্বামীর সব অত্যাচার মেনে নিয়েছিল, কারণ সে তার বাচ্চাদের তাদের বাবার আদর থেকে বঞ্চিত করতে চায়নি। মহুয়া ভাবতো, তার স্বামী তাকে যতই অত্যাচার করুক না কেন, বাচ্চাদের তিনি ভালোবাসেন! কিন্তু বাচ্চারা একটু বড় হলে মায়ের প্রতি এই অত্যাচার তারা মেনে নিতে পারেনি, তাই তারাই মাকে বলে, বাবার কাছ থেকে আলাদা হতে এবং তারা মায়ের সঙ্গী হয়। ছোট ছোট বাচ্চাগুলো কী জানি কী ভেবে বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতো। তাদের বুকের মধ্যে কীসের যেন চাপা কষ্ট কুণ্ডলী বেঁধে ঘুরে বেড়াতো ।

নারীর প্রতি সহিংসতা একটি বৈশ্বিক সমস্যা। নারীর প্রতি সহিংসতার অবসানে ২৫ নভেম্বর নারীর প্রতি আন্তর্জাতিক সহিংসতা প্রতিরোধ দিবস এবং ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ পক্ষ পালন করা হয়। কে এই নারী? তারাই তো মা। নারী একটি আলাদা সত্ত্বা, আবার তার সাথে সাথে নারী সত্তার একটি গৌরবময় দিক হচ্ছে তার মাতৃত্ব। এই নারীর প্রতি সহিংসতা মানে তো মায়ের প্রতি সহিংসতাই ।

এমনিতেই শিশুদের নরম কোমল মন যেকোনো ধরনের মারামারি বা সহিংসতার অভিজ্ঞতা পেলে তার মনোজগতের উপর বিরূপ প্রভাব বিস্তার করতে পারে। আর সেটা যদি হয় তার সব চাইতে কাছের, সব চাইতে আপন মায়ের সাথে, তাহলে তার মনোজগৎটা পুরোপুরি ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়। দোদুল্যমান হয়ে যায় তার পৃথিবী।

একবার কিশোর-কিশোরীদের সাথে গবেষণার একটি কাজে এক কিশোরীর সাথে কথা হচ্ছিলো; কিশোরীটি বলেছিলো, তার বাবা আর মা সবসময় ঝগড়া করতো, তার মা তাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে। সে বলছিলো, তার বাবা যদি তার মাকে না মারতো, তাহলে তার মা তাদের ছেড়ে যেত না। মাকে ছাড়া থাকতে তার ভালো লাগে না। তাই সে মাঝে মাঝে আত্মহত্যার কথা ভাবে। এটি কিশোরী মনের আবেগ আর বুক ভরা অভিমানের বহিঃপ্রকাশ। নিশ্চয় তার মনের মধ্যে এমন কোনো টানাপোড়েন চলছিল যার জন্য এমন করে ভাবতে সে বাধ্য হয়েছে।

সন্তানরা বাবাকেও ভালোবাসে। মায়ের সাথে সন্তানের ভালোবাসার সম্পর্কটা খুব সহজেই সংজ্ঞায়িত করা যায়; মায়ের সাথে সন্তানের রয়েছে নাড়ির টান। আর বাবার সাথে রয়েছে রক্তের টান। কোনোটাকেই তারা ছোট করে দেখতে পারে না। অনেক বাবা যারা সন্তানের মাকে অবলীলায় নির্যাতন করে যাচ্ছেন, আবার তারাই সন্তানের উপর তার একশো ভাগ দাবি করছেন এবং সন্তান তার বংশধর বলে মায়ের কোল থেকে জোর করে আলাদা করছেন। এটা আসলে সন্তানের প্রতি ভালোবাসার দাবি, নাকি মাকে অত্যাচারের একটি মোক্ষম অস্ত্র, তা কেবল সে বাবাই জানেন। যদি ধরে নেই সেটা সন্তানের প্রতি তার ভালোবাসা, তাহলে আমার মনে প্রশ্ন জাগে, যদি এটা ভালোবাসাই হবে, তাহলে তার ভালোবাসার সন্তানের নিষ্পাপ আনন্দের জায়গা তার মাকে রক্তাক্ত করার মতো বুকের জোর তারা পান কোথা থেকে?

সন্তানকে ভালোবাসবেন, আর তার দুর্বল জায়গা তার মাকে তারই সামনে আঘাত করতে থাকবেন, এটা থেকে শিশুর মন কোনটা গ্রহণ করবে? তার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে মায়ের আঘাতের দৃশ্য গুলো ঘুরে ফিরে আসতে থাকবে। এতে করে সন্তান হয় মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে বেড়ে উঠবে এটা ভেবে যে, তার মাকে সে আঘাতের হাত থেকে রক্ষা করতে পারছে না। নতুবা সে প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে বেড়ে উঠবে, মাদকাসক্ত হতে পারে, হতে পারে নেতিবাচক আরও অনেক কিছু।

বাংলাদেশে দুই তৃতীয়াংশ বিবাহিত নারী তাদের পুরো বিবাহিত জীবনে স্বামীর দ্বারা কোনো না কোনো ভাবে নির্যাতিত। সব নারী না হলেও এই বিবাহিত নারীদের বেশির ভাগ ই হয়তো মা। তার মানে এই ভাবে বলা যায় বাংলাদেশে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ মা তাদের সন্তান দের বাবা দ্বারা নির্যাতিত। এই দুই তৃতীয়াংশ মায়ের যদি একটি করেও বাচ্চা থাকে তাহলে কি পরিমান বাচ্চা কোনো না কোনো মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়।

যে বাবারা তার সন্তানের মায়ের প্রতি এরকম সহিংস আচরণ করছেন, নির্যাতন করছেন তারাও কি তাদের ছেলেবেলায় তাদের বাবাদের এরকম করতে দেখেছেন? যদি দেখে থাকেন তাহলে আমি বলবো এখন তারা যে নির্যাতন করছেন তার সন্তানের মাকে সেটাও ওই ছোট্ট বেলাকার বিকৃত শিক্ষার কারণে; স্ত্রী নির্যাতনের মতো কাজটি সে করতে পারছে তার বিকৃত মানসিকতা নিয়ে বড় হয়ে উঠার কারণে। আবার উল্টো ভাবেও ভাবি মাঝে মাঝে, যখন তাদের বাবারা তাদের মায়েদেরকে নির্যাতন করতো তখন কি তাদের কষ্ট হতো না? যদি হয়ে থাকে তার কি একবার মনে হয় না তার সন্তানের মাকে নির্যাতন করলে তার সন্তান ও এক ই রকম কষ্ট অনুভব করে?

প্রতিটা শিশুই অপার সম্ভবনা নিয়ে জন্ম নেয়। তার সে সম্ভনাকে কাজে লাগিয়ে সে যেন আত্মপ্রত্যয়ী একজন মানুষ হিসেবে বড় হয়ে উঠতে পারে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মা, বাবা দুজনের ই। তাকে যদি প্রতিনিয়ত মায়ের কষ্টমাখা মুখ টা দেখতে হয় তাহলে তার ছোট্ট মস্তিষ্কে ভিড় করবে অজানা সব আশংকা, যার থেকে তার ছিন্ন ভিন্ন মনোজগৎ প্রতিনিয়ত পরিত্রান পাওয়ার চেষ্টা করবে। নিজের মতো করে খুঁজে নিতে চাইবে মুক্তি।

শেয়ার করুন:
  • 529
  •  
  •  
  •  
  •  
    529
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.