চিৎকার দেয়াটা জরুরি

0

প্রমা ইসরাত:

যৌন হয়রানির শিকার হওয়া, এবং যেকোনো সময় যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার সম্ভাব্যতা আমাদের দেশে, সমাজে, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে শতভাগ। উন্নত দেশগুলোতে সেগুলোর প্রতিকার পাওয়ার উপায় আছে, আমাদের মতো দেশে সেই “উপায়” এর লিস্ট আছে, চার্ট আছে, সিলেবাস আছে।

ধরুন, আপনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছেন, আপনার বয়ফ্রেন্ড, কিংবা স্বামী, কিংবা পরিবারের যেকোনো আত্মীয়ের সাথেই, এবং পাশের বিল্ডিং এর বারান্দায় আপনার নারী কন্ঠের উপস্থিতি টের পেয়ে এক ব্যক্তি তার মোবাইল বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস বের করে, পর্নো দেখা শুরু করলো, এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সেই ভিডিওর ভলিউম বাড়িয়ে দিল।

আপনি কী করবেন?
১) অত্যন্ত মেজাজ খারাপ করে রাগে দুঃখে কাঁপতে কাঁপতে বারান্দা থেকে চলে আসবেন।
২) পাছে লোকে কিছু বলে তাই ঘটনাটি আপনি চেপে যাবেন, এবং রাগে দুঃখে ঘৃণায় কিছুক্ষণ কাঁদবেন
৩) অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে ব্যাপারটি নিয়ে উইমেন চ্যাপ্টারে লিখবেন
৪) একটা চিৎকার দিবেন এবং চিৎকার করে বলবেন, এই কে আছো দেখে যাও, পাশের বারান্দায় লোকটা কী বদমায়েশি করছে। (এবং এর পর এই পদক্ষেপ এর ব্যাপারে উইমেন চ্যাপ্টারে লিখবেন, হিহি)

একটা চিৎকার দেয়া জরুরি।

পয়েন্ট আউট এন্ড শাউট। এটা আমার কাজিন আমাকে শিখিয়েছে। একদিন আমি আমার কাজিনরা মিলে নিউমার্কেট যাচ্ছিলাম, তিনজন এক রিক্সায় উঠেছিলাম, এবং খুবই মাস্তি মুডে ছিলাম, হাসছিলাম, খল খল করছিলাম। আমার কাজিন উপরে বসেছিল। তো রিকশা ট্র্যাফিক এর জন্য থামলো, এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার কাজিন চিৎকার করে একটা লোকের দিকে পয়েন্ট আউট করে বললো, এই লোক আমার পাছায় হাত দিয়েছে। আমি তৎক্ষণাৎ “এই লোক , এই বদমায়েশ লোক বলে লোকটার দিকে পয়েন্ট করলাম”।
রাস্তায় জ্যাম ছিল, সব রিকশা দাঁড়ানো এবং সব রিকশার যাত্রীরা ওই লোকটাকে দেখলো। আমার কাজিন আমাকে বলল, জানো প্রমা, এই যে আমি চিৎকার করলাম, এবং বললাম যে এই লোকটা আমার পাছায় হাত দিয়েছে, এতে তুমি ভাবতে পারো আমার জন্য ব্যাপারটা লজ্জার, কিন্তু যে কাজটা করেছে তাকে চিহ্নিত করে দেয়া তার জন্য আরো লজ্জার। চুপ করে থাকলে হয়তো কেউ জানতো না যে আমার সাথে কী হয়েছে, কিন্তু লোকটা আরামে চলে যেতো, দিস ইজ নট জাস্টিস, তাই আমি তাকে পয়েন্ট আউট করেছি চিৎকার দিয়ে, এবং সমস্ত লোক এই ঘটনার জানান পেয়েছে, প্লাস লোকটাকে দেখেছে এইটা হচ্ছে জাস্টিস।

আমি ময়মনসিংহের মেয়ে, তো ইউনিভার্সিটির বন্ধ শেষে ঢাকার উদ্দেশ্যে আমি বাসে উঠেছি। একাই যাচ্ছি। বাসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম যে আমার বাম কাঁধে স্পর্শ। আমি খেয়াল করে উঠে বসলাম। এবং লোকটা তৎক্ষণাৎ হাত সরিয়ে নিলো। আমি একটু অপেক্ষা করলাম, তারপর দেখলাম আবার হাতটা আমার কাঁধ ছোঁয়ার চেষ্টা করছে, আর একটা কাগজ সিটের চিপায় দিয়ে ফিস ফিস করে বলছে, এইটা তার ফোন নাম্বার। কাগজটা নিলাম আর উঠে দাঁড়িয়ে , কাগজ তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বাসে চিৎকার করে বললাম, শালা বদমাইশ বাসে উঠে গায়ে হাত দিতেছিস, টুটের টুট, শুয়োরের… । দেখেছেন সবাই, এই লোকটা আমার গায়ে হাত দিচ্ছিল!

যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলাম একবার, তখন কলেজে পড়ি। বান্ধবীকে তার বাসা থেকে ডাকতে গিয়েছিলাম একসাথে কলেজ যাবো বলে। সকাল সাতটা , সাড়ে সাতটা বাজে তখন। গেইটের কাছে কলিং বেল টিপে দাঁড়িয়ে আছি দোতলা থেকে বান্ধবী বললো, নামছে। আমি নিচে দাঁড়িয়ে আছি, দূরে হঠাৎ দেখি যে এক লোক, প্যান্টের ভিতর হাত ঢুকিয়ে হাত নাড়া চাড়া করছে আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে। আমি তখন এই পরিস্থিতিতে কী করবো বুঝতে পারিনি।

অসম্ভব ঘেন্না লাগছিল। নিজের উপর রাগ লাগছিল, বান্ধবীর দেরি দেখে রাগ লাগছিল। বান্ধবী নিচে নামতেই বললাম যে, দেখ দূরের কুত্তা লোকটা কী কুত্তামি মার্কা কাজ করতেছে, আমার বান্ধবী ‘আররে বাদ দে তো’ বলে আমার সাথে হাঁটা দিলো, ওই গলির মোড়ে যখন লোকটাকে আমরা ক্রস করছিলাম, আমি চাইছিলাম চিৎকার করে লোক জড়ো করি, চিৎকার করি যেন লোকটা ওই জায়গা থেকে পালিয়ে যায়, যেমন করে পালায় রাস্তার কুকুর। কিন্তু আমি সেটা করতে পারিনি। পারিনি কারণ আমার মনে হয়েছিল আমারই দোষ আছে, পারিনি কারণ আমি ভেবেছিলাম, পুরুষ একা পেলে এইরকম করতেই পারে, পারিনি কারণ আমি ভেবেছিলাম যে চিৎকার করে লোক জড়ো করলে, আমারই অপমান হবে, পারিনি কারণ এই এখন যদি চিৎকার দেই, তবে আমাদের অভিভাবকেরা আমাকে আর হয়তো একা চলতে ফিরতে দেবে না। আমার চলাফেরায়, আসা যাওয়ায় নজরদারি পড়ে যাবে।

আমাদের সোসাইটিতে ভিক্টিম ব্লেমিং যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ভিক্টিমকেই বন্দি বানিয়ে রাখার চর্চা।
আমার সেই বান্ধবী ওই ঘটনার পর শেয়ার করেছিল, যে গ্রামের বাড়িতে তারা তাদের আম বাগানে বেশ কিছু নানান বয়সী মেয়ে মিলে খেলছিল। এক লোক সেই সময় এসে লুঙ্গি তুলে তার যৌনাঙ্গ দেখিয়েছিল আমার বান্ধবীকে। সেই বাজে অভিজ্ঞতায় তারা সকলেই বিমর্ষ হয়ে বাড়িতে গিয়ে উঠেছিল, এবং এক ফুপু গোছের কাউকে এই ঘটনা জানালে, তাদের বাড়ির বাইরে খেলতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে হয়রানির শিকার হলে বারান্দায় যাওয়া নিষেধ, ছাদে হলে ছাদে যাওয়া নিষেধ, জানালা বন্ধ, দরজা বন্ধ, স্কুলে যাওয়া বন্ধ, কলেজে যাওয়া বন্ধ, দোকানে যাওয়া বন্ধ, খেলতে যাওয়া বন্ধ, ইচ্ছেমতো পোশাক পরা বন্ধ, ফেসবুক চালানো বন্ধ, ফেসবুকে লেখালেখি বন্ধ। আহা, বেঁচে থাকা বন্ধ, নিঃশ্বাস নেয়া বন্ধ।

কিন্তু তবুও আমাদের চিৎকার দেয়াটা জরুরি। যখনই আপত্তিকর কোনো কিছু আমাদের অস্বস্তিতে ফেলবে আমাদের দায়িত্ব চিৎকার দেয়া। আমাদের চিৎকার দিতে হবে, ততক্ষণ চিৎকার দিতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই অপরাধী দূরে না সরে যায়, আমাদের চিৎকার করে চিহ্নিত করে দিতে হবে যে, অপরাধী কী কী অপরাধ করার চেষ্টা করছে।

প্রতিটা মা এবং বাবার তার সন্তানদের শেখানো উচিৎ, যেন তার সাথে যৌন হয়রানির সময় সে চিৎকার দেয়, চিৎকার দিয়ে চিহ্নিত করে বলে দেয়, ব্যক্তিটা তার সাথে কী করেছে। কারণ আমাদের চিৎকার, অপরাধীর মনে ভীতি তৈরি করে। সেই চিৎকার ভয়ের নয়, ঢালিউড বা বলিউডের নায়িকাদের মতো, বাঁচাও, বাঁচাও ন্যাকামি না, সেই চিৎকার দিতে হবে রাগ থেকে, ক্রোধ থেকে, নিজের ভেতরের সমস্ত আগ্রাসন দিয়ে আমাদের চিৎকার দিতে হবে। কারণ চিৎকার দেয়া জরুরি।

লেখক- আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 350
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    354
    Shares

লেখাটি ১,০৭১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.