পুরুষের মালিকানার শৃঙ্খলে কতদিন আর কাটাবে নারী!

0

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

(১)
চন্দনা শুক্তি ডাক্তার। চশমা পরা চোখের ডাক্তার। চশমা পরা প্রিয়দর্শিনী চোখের ডাক্তার। তিনি একটা ফেসবুক পোস্ট দিয়েছেন গতকাল। সকালে সেটা পড়তে গিয়ে মনটা ভারি ভারি হয়ে গেল। না, কেবল দুঃখে ভারি ভারি না। দুঃখ তো আছেই। সাথে একটু ক্রোধ একটু শঙ্কা এইসব মিশেছে। বয়সের ভারে ক্রোধের মাত্রাটা কমে যাচ্ছে আজকাল যদিও।

শুক্তির পোস্টটা কপি পেস্ট করে দিই:

“কমবয়সী একটা মেয়ে। ২৩,২৪ বছর বয়স। ২,৩ বছর আগে ওর চোখে আমরা কর্নিয়া সংযোজন করেছি। ভালোই ছিল। পরশুদিন এলো কাঁদতে কাঁদতে। স্বামী ওই চোখেই ঘুষি মেরেছে। সংযোজন করা কর্নিয়া ফেটে গেছে। সাথে স্বামী এসেছে; দোষ স্বীকারও করলো। তার নাকি খুব রাগ হয়েছিল। জিজ্ঞাসা করলাম, ” কেন এত রাগ?” মেয়েটি বললো, শশুর শাশুড়ির সাথে কোনো ঝামেলা হলেই স্বামী ওকে মারে।

ভর্তি করা হলো। জোড়াতালি লাগানো হলো আবার। কিন্তু যে অবস্থা, শেষ পর্যন্ত এই চোখ টিকবে না। আজ সকালে ছুটি দিলাম। মেয়েটি লুকিয়ে আস্তে আস্তে বললো, ” আমার শাশুড়িকে বলবেন, আমার দুধ ডিম খাওয়া দরকার”। আহা, মেয়েটির হয়তো খেতে ইচ্ছা করে; দেয়া হয়না। শাশুড়িকে নিয়ে এলো, ওষুধ দেখানোর ভান করে। বলে দিলাম, ” ওকে বেশি করে দুধ, ডিম, মাছ, মাংস খেতে হবে।”

রবীন্দ্রনাথের “শাস্তি” মনে পড়লো। বউ গেলে তো বউ পাওয়া যায়! চিন্তা কি!”

(২)
আমি যেন মেয়েটাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। পাতলা ছিপছিপে কম বয়সী মেয়েটি- আমার বড় মেয়ের চেয়ে একটু বেশী বয়স। অপুষ্টিতে চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে আছে, দৃষ্টি জুড়ে আতঙ্ক ক্লান্তি ভীতি। নিজের নারী জন্ম, নারী শরীর নিয়ে যেন ওর যত গ্লানি। মাথা নিচু করে থাকে। কারো চোখে চোখ রেখে কথা বলতে সাহস পায়না। প্রেম ভালোবাসা কামনা এইসব যেন ওর কাছে ভিন্ন দেশ বা ভিন্ন দুনিয়ার কোন ধারনা যা কিনা কেবল স্বপ্নেই মিলে আর রঙিন সিনেমাতে। জীবন ওর কাছে কেবলই দুই বেলা চারটা খেয়ে দিন শেষে স্বামীর প্রয়োজনটি মিটিয়ে কোনওরকমে ঘুমিয়ে পড়া।
আমি কল্পনায় দেখি মেয়েটি কি করুণভাবে সলজ্জ চেহারা করে চশমা পরা চোখের ডাক্তার শুক্তিকে অনুনয় করে বলছে, “আমার শাশুড়িকে বলবেন, আমার দুধ ডিম খাওয়া দরকার”।

আহারে, কোন বাপের না জানি মেয়ে! ওর বাপটা কি জানে শ্বশুর বাড়ীতে ওর কলিজার টুকরা আদরের কন্যাটি কেমন আছে? সম্ভবত জানেই না। দেখবেন হয়তো মেয়েটিই ওর বাপকে বা মাকে কখনো বলেনি। বলেনি, ওর দুই একদিন পরপর স্বামীর নিষ্ঠুর প্রহারের কথা। বলেনি সামান্য একটু খাওয়ার ইচ্ছা পূরণ না হওয়ার কথা। আমাদের মেয়েরা সবসময় বলেও না। পোষা গাই গরুটার মতো মুখ বুঝে সহ্য করে চুপচাপ।

একদম গাই গরুটার মতোই। প্রভুর জন্য শারীরিক খাটাখাটনি করে। রাতে প্রভুর যদি ইচ্ছা হয় সেই ইচ্ছা পূরণের জন্যে পা ফাঁক করে দেয়। বাচ্চা ফুটায়। বাচ্চাকে দুধ খাওয়ায় আর বড় করে। কোনদিন ওর মনে হওয়ার সুযোগ হয় না সে কি একজন মানুষ কিনা।

(৩)
অবাক হইনি তো। নারীদের এইরকম অবস্থা কি আমরা দেখি না চারপাশে? প্রতদিনই দেখি তো। মধ্যবিত্ত বলেন, কী বিত্তবান ঘরে, কী অতি পয়সাওয়ালা ঘরে- নারীর স্ট্যাটাস কী? ঐটাই তো! ঐ যে মেয়েটার শাশুড়িটা। ওরা উপরও আবার রাগ করতে পারি না। সেই বুড়ীও দেখেন গিয়ে যৌবনে এইভাবেই কাটিয়েছে। জীবনের কঠিন দিনগুলি পার করতে করতে সে টের পেয়েছে সে হচ্ছে আসলে পুরুষের দাস। ওর দখলে একটি পুরুষ থাকলে তবেই না ওর জীবন
সার্থক হবে। নিজের স্বামী পুরুষটিকে নিয়ে সে লড়েছে হয়তো তার শাশুড়ির সাথে। পারেনি। নিজের যখন একখান পুরুষ সন্তান হয়েছে, নবজাত সন্তানের দুই পায়ের ফাঁকে যখন এক টুকরা বাড়তি মাংস দেখেছে, সেদিন থেকেই হয়তো তার জীবনের ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘এইটা আমার পুরুষ, এইটাকে আমি ছাড়বো না, এইটাই আমার জীবন
সার্থক করবে।’

শাশুড়ি ওর বেটাকে বৌয়ের হাতে কেন ছাড়বে? ছাড়বে না। একজন পুরুষ রাখতে হবে না? পুরুষ ছাড়া তো সংসার অর্থহীন। মায়েরা তাই পুরুষ সন্তানটিকে ছাড়বে না।

আপনি কি আপনার মাকে দেখেননি? সুক্তি ডাক্তারের রোগিনী মতো ক্রুড হয়তো আপনার পরিস্থিতি নয়। কিন্তু আপনার মা, আপনার দাদী, বুয়া এইরকম যত সম্পর্ক আছে, সবগুলিই কি কম বেশী একই নয়? নীতিগতভাবে একই। মধ্যবিত্ত সাহেবরা এইটাকে একটু চিনির প্রলেপ দিয়ে রাখে। বলে কিনা নারী হচ্ছে মায়ের জাত, নারী হচ্ছে বোনের জাত, নারী মমতাময়ী, দুখিনী নারী- এইরকম কতো কথা।

ওরে শয়তানের দল, বেটা এইসব মায়ের জাত, বোনের জাত না বলে সোজা এই কথাটা বলতে পারিস না যে নারীও মানুষ, আমার মতোই মানুষ। সেটা বলবে না। কেন? কারণ নারীকে আমরা তো মানুষ ধরি না।
ঐ যে মায়ের জাত, বোনের জাত ঐসব বলে, ঐগুলি আসলে মালিকানা নির্দেশ করার জন্যে বলে। এইগুলি নারীকে সম্মান করার জন্যে বলে না। নারীর উপর পুরুষের মালিকানার শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যে বলে।

(৪)
নারীর উপর পুরুষের মালিকানা আর সেটা নিয়ে শৃঙ্খলা এইটা মানে কি?
আমরা পুরুষরা মনে করি যে প্রতিটি নারীই কোন না কোন পুরুষের সম্পত্তি এবং নারীর দায়িত্ব হচ্ছে তার প্রভুর প্রতি সম্পূর্ণ নিবেদিত বিশ্বস্ত থাকা। আমরা যখন বলি যে ঐ নারীটি আমার মায়ের মতো, আমরা আসলে মিন করি যে এই মালটার মালিক আমার পিতার মতো, সুতরাং এই মালটাকে ঐভাবে ট্রিট করা যাবে না। আমরা যখন বলি যে কন্যার মতো বা বনের মতো- এর মানে হচ্ছে যে আমি এই মালটার কাস্টডিয়ান হতে পারি, কিন্তু ভোগ করতে পারবো না। এইটা কিন্তু আবার আমরা বলিও- প্রকাশ্যেই বলি। কন্যা শিশু হচ্ছে পিতা ও ভাইয়ের বোঝা, আমানত। পিতা ও ভাইয়ের কাজ হচ্ছে এই আমানত সহি সালামতে রাখা ওর মালিকের জন্যে- যেন মালিক একটি অক্ষত মাল পায়। ফ্রেশ মাল- কথাটা শোনেন নাই?

এইজন্যেই দেখবেন মালিকানা ছাড়া নারীর কোন সম্মান নাই। যদি কোনো নারী একাধিক পুরুষের সাথে শোয়, সে হবে বেশ্যা। বারোয়ারি মাল। সে হয়তো নিজের পছন্দের কারণেই একাধিক পুরুষের সাথে মিলেছে- নিতান্ত শারীরিক কামনা থেকেই। পুরুষরা ওকে বেশ্যা বলবেই। এবং যে নারী একাধিক পুরুষের সাথে মিলবে- অন্য পুরুষরা তখন মনে করে ওর শরীরের উপর সকল পুরুষের অধিকার জন্মে যায়।
কেন? আরে, তুই যদি ঐ পাঁচজনের সাথে শুইতে পারিস, তাইলে আমার সাথে তোর কি অসুবিধা? কিন্তু সেগুলি তো নারীটি তার পছন্দ থেকেই করেছে, তোমাকে তো নারীটি পছন্দ করছে না। নারীর আবার পছন্দ অপছন্দ কী? নারী হচ্ছে মাল- হয় এটার কোন মালিক থাকবে, নাইলে সে বারোয়ারি- নারীরই শরীরের মালিক কি আবার নারী নিজে হতে পারে নাকি? দূর!

(৫)
এবং আমাদের যেসব মেয়েরা একটু মুখ ফুটে জোরে বা মৃদু গলায় বলতে চায়, যে না, আমার মালিক তো আমি নিজে, আমিও তো মানুষ- পুরুষরা ওদেরকে কী বলে দেখেন না? শোনেন না? দর্শন হচ্ছে ঐটা- নারীর একজন মালিক থাকবে, যদি সে মালিকের বশ্যতা অস্বীকার করে, তাইলে সে বেশ্যা, সকলেই তাকে ইয়ে করার অধিকার রাখে।

অনলাইনে তো অল্প কিছু বোকা পাগল আর ঘাড় ত্যাড়া টাইপ মেয়ে আজকাল নিজেদেরকে মানুষ দাবি করে নানারকম কথা বলে। অদেরক দিকে তাকান। ওদের প্রসঙ্গে আপনার আশেপাশের মানুষ কী বলে? কেন বলে? এমনি এমনিই তো আর সকলে একই সুরে কথা বলে না আরকি- এর তো একটা দার্শনিক সামাজিক রাজনৈতিক ভিত্তি আর প্রেক্ষাপট আছে আরকি! এইটা হচ্ছে সেই দর্শন, সেই রাজনীতি সেই প্রেক্ষাপট- যে নারী হচ্ছে মাল, একটু উন্নত মাল, গরুর মতো, বা হিরে জহরতের মতো- তবে মালই। মালের আবার মতামত কী? মাল কি নিজেই নিজের মালিক হতে পারে? পারে না।

এইজন্যে দেখবেন, আপনার পবিত্র গ্রন্থেও ধর্ষণের জন্যে আলাদা কোন শাস্তির বিধান নাই। কিন্তু ব্যাভিচারের জন্যে আছে কঠিন শাস্তি। ধর্ষণকে আলাদা অপরাধই বিবেচনা করা হয়না। কেন? মালের আবার সম্মতি আর অসম্মতি! কিন্তু ব্যাভচারের জন্যে শাস্তি হবে, দুইজনের সম্মতি থাকলেও হবে। কেন? ঐ যে মালিকানার শৃঙ্খলা ভঙ্গ হচ্ছে, সেইজন্যে। থাক, বিস্তারিত লিখলাম না।
ঐ যে মেয়েটার কথা বলছিলাম। চশমা পরা চোখের ডাক্তারের রোগী মেয়েটা। ওর মতো মেয়েদের অবস্থাটা তোমরা চিন্তা কর।

(৬)
আজকের ছোট মেয়েরা যারা কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়, বা পড়া শেষ করেছ- তোমরা সিদ্ধান্ত নাও। তোমরা কি নিজেকে একটি হিরে জহরতের মতো মূল্যবান মাল বা সুস্বাদুতম খাবার হিসাবে মালিকের আদর নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে চাও? নাকি মাটিতে পা ঠুকে মেরুদণ্ড সোজা করে বলতে চাও যে, ‘আমি মানুষ, আমিই আমার মালিক’।

শেষের পথটা কঠিন। যাদেরকে তুমি তোমার মালিকানা থেকে সরিয়ে দিচ্ছ, ওরা তোমাকে ছাড়বে না। মারতে আসবে পদে পদে। লড়বে? পছন্দ তোমাদের। তোমাদের ইচ্ছা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 772
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    776
    Shares

লেখাটি ১,৬৯৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.