সমাজে LGBT কমিউনিটিও সহমর্মিতার হকদার

শিল্পী জলি:

কাজে LGBT কমিউনিটির উপর বাধ্যতামূলকভাবে আট ঘন্টা প্রশিক্ষণ নিয়েছি। মূলকথা যা শেখানো হলো, তাহলো কাউকে তার লৈঙ্গিক অবস্হান বা সেক্সচ্যুয়ালিটির উপর ভিত্তি করে ভিন্ন নজরে দেখবার কোনো অবকাশ নেই। যদিও আগের চাকরিতেই আমার গে, লেসবিয়ান কলিগস ছিল, আবার প্যারেন্টস হিসেবেও লেসবিয়ান দম্পতি দেখেছি যারা তার সন্তানের ব্যাপারে শতভাগ ডেভোটেড।

প্রশিক্ষণে বাড়তি যেটুকু শিখলাম তাতে বুঝলাম, কখনও কখনও চিকিৎসার খাতিরে ওদেরকে জিজ্ঞেস করেও জেনে নিতে হবে ওরা নিজেকে কী মনে করে–মেয়ে, ছেলে, হিজরা, অথবা নিরপেক্ষ বা কিছুই না। পাশাপাশি জন্মের সময়ের লিঙ্গটিও জানা জরুরি যেনো নারী/পুরুষ সংক্রান্ত রোগবালাই, চিকিৎসা, সঠিক বাথরুমের ব্যবস্হা ইত্যাদি অফার করা সহজ হয়।

এতো কিছুর ব্যবস্হা এবং এতো চিন্তাভাবনার পরও যেটুকু জানলাম তাতে বোঝা গেল আমেরিকার মত জায়গাতেও এলজিবিটি কমিউনিটি নানাভাবে নেগলেকটেড। তাই তারা সময়ে চিকিৎসা নিতে আসে না, রোগ জটিল আকার ধারণ করে এবং পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদিও আমার হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খৃষ্টান, নারী-পুরুষ-হিজড়া, গে-লেসবিয়ান কারও দিকেই তীর্যক দৃষ্টিতে তাকাবার স্বভাব নেই তবুও নিজেকে বোঝালাম আরেকটু সচেতনতা জরুরি যেনো আগে মানুষ হিসেবে মানুষকে মূল্যায়ণ করতে পারি। পরে তার ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ যেনো স্হান পায়।

অতঃপর দুবার বিপদ হলো–
এক রোগীকে ডেকেছি, উঠে দাঁড়ালেন এক গাট্টাগোট্টা পুরুষ। আমি আবার নাম ধরে ডাকলাম, তিনি হাঁটা ধরলেন আমার দিকে। ওদিকে কাগজে দেখছি লেখা, ফিমেল। মুশকিলে পড়ে গেলাম, কী করি এখন? ততক্ষণে লোকটি গেইট খুলে বাইরে থেকে তার ফিমেল পার্টনারকে ডেকে আনলেন।
ওমনি আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

আরেকদিন এক নারীকে এক্স-রে করাতে নিয়েছি অথচ কাগজে দেখি পুরুষ লেখা। রোগীকে জিজ্ঞেস করার আগে দৌঁড়ালাম রিসেপশনে যদি কোন ভুল হয়ে থাকে তাদের।
আমেরিকাতে শত নিরপেক্ষতার চেষ্টা সত্ত্বেও জরিপে দেখা গিয়েছে, এলজিবিটি কমিউনিটি মনে করে চিকিৎসা ক্ষেত্রেও তারা বৈষম্যের শিকার। অকারণ দেরিসহ এটা ওটায় ভোগানো হয় তাদেরকে। ফলে চেষ্টা চলছে সব বৈষম্য দূরসহ লিঙ্গ নিরপেক্ষ টয়লেট সরবরাহেরও। আমেরিকাতেই যদি এই অবস্হা হয়, তাহলে আমাদের দেশগুলোতে কী অবস্হা হতে পারে?

ছোটবেলাতে আমাদের ছোটভাইকে নাচাতে এসেছিল একদল হিজড়া। বাবা ছিলেন জেলার বাইরে। মা-সহ আমরা সবাই ভয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়েছিলাম যুদ্ধের সময়ের মতো, যেন দেখতে না পায়। ধারণা ছিল ধরতে পারলেই ভাইকে নিয়ে যাবে ওরা। আর যদি নাও নেয়, তবুও ভাইয়ের ক্ষতি হয়ে যাবে যদি তাকে নাচায় অথবা ছুঁয়ে দেয়। হৈ হৈ করে তারা এক জানালা থেকে আরেক জানালায় ছুটছিল, উঁকি দিচ্ছিল…ভয়াবহ সেই অনুভূতি।

আজ ভাবলে সত্যিই অবাক লাগে, একই সমাজে থেকেও মানুষে মানুষে কতো দূরত্ব থাকতে পারে, আর আমরা কতো সহজে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তৈরি করে ফেলি। ভুলে যাই ওরাও মানুষ। শুধু আমরা কেন, হিজড়া হলে আপন বাবামাও ভুলে যায় নিজের সন্তানের কথা! মায়া-মমতা, স্নেহ-সম্পদ সবকিছু থেকে বঞ্চিত করে অবলীলায়। অথচ একজন মায়ের গর্ভেই তাদের জন্ম। যদিও কোলনেও জন্ম নেয় হিজড়া।

দেখলাম, পাকিস্তানে মাত্র চার দিনের এক মেয়ে এবং চার মাসের এক ছেলে হিজড়া শিশুকে নিজ বাবা-মা হিজড়া সমাজে গিয়ে দিয়ে এসেছে, তারা যখন বোঝেওনি তারা কী? এখানে উল্লেখ্য যে ভারতের লক্ষীর বাবা বলেছিলেন, আমরা যদি বিকলাঙ্গ সন্তানকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করতে পারি, তাহলে কেন হিজড়া সন্তানকে নয়?
সন্তান যেমনই হোক সে সন্তান এবং সেটাই সম্পর্কের মূল ভিত।

একটি শিশু ছেলে বা মেয়ের লিঙ্গ নিয়ে জন্ম নিলেও কারও কারও মধ্যে ভেতরের মানুষটির অনুভূতি থাকে আলাদা। কেউ দেখতে ছেলে কিন্তু নিজেকে মনে করে মেয়ে। অথচ একটি ছেলের শরীর নিয়ে পুরোপুরি মেয়ে হতে পারে না। তখন হয়তো আচরণে মেয়ে হয় সে। তীব্রভাবে এমন অনুভূত হলে জার্মানিতে সরকারিভাবেই অপারেশনের ব্যবস্হা করে দেয়া হয়। উন্নত বিশ্বে তারা নানারকম কাজেরও সুযোগ পায় জীবন চালিয়ে নেবার। কিন্তু আমাদের সমাজে বাচ্চা নাচানো এবং ভিক্ষাকর্ম ছাড়া তাদের আর তেমন কোনো কর্ম কোথায়? তাদের জন্যে না থাকে কোন শিক্ষার ব্যবস্হা, না কোন কাজের? তবুও তাদের কাজ খুঁজতে হয় জীবনের প্রয়োজনে।

পাকিস্তান-ইন্ডিয়ায় হিজড়াদের একটি বৃহৎ অংশ যৌনকর্মী। অনেক সময়ই তাদের গুরু নিজ হাতে তাদের লিঙ্গ কেটে মেয়ে বানান। ক্যান্সারসহ অন্য স্বাস্হ্য সংক্রান্ত ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মাসে মাসে বার্থ কন্ট্রোল ইনজেকশন পুশ করে ব্রেষ্ট গ্রো করানো হয় বুকে। আয়ও ভালো। সাধারণ পুরুষরাই তাদের খদ্দের– ওরাল এবং এ্যানাল সেক্স মাধ্যম। উক্ত পুরুষগণ বৌ কর্তৃক উহা পান না বলে ‘ইহা’ করেন বলে তাদের অভিমত। কেউ কেউ আবার হিজড়াদেরকে বিয়েও করে। আবার বাবা-মায়ের চাপে ঘরেও তাদের একটি বউ থাকে।

পাকিস্তান ভারতে যেটা চলে বাংলাদেশে তা একেবারেই চলে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?
যাই হোক, অনেক হিজড়াই সম্মানজনক কাজ খোঁজেন। জন্মের স্বীকৃতির জন্যে হাহাকার করেন। যৌনকর্মী হতে চান না। ভারতে হিজড়াদের অবস্হা মোটামুটি–চেষ্টা করলে সুযোগ আছে। কেউ কেউ ভালোই প্রতিষ্ঠিত, উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত। তারা বিউটি কম্পিটিশন করে, নানারকম সম্মেলনে মিলিত হয়, আবার একে অন্যকে সহযোগিতা দিয়ে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

পাকিস্তানে হিজড়াদের ট্যাক্স কালেকটরের কাজ দেবার পর থেকে কালেকশন ২৫% বেড়েছে।
আমরা এখনও হিজড়া এবং এলজিবিটি কমিউনিটি নিয়ে নীরবতা পালন করি, যদিও সমাজে ওরাও রয়েছেন। এই এড়িয়ে চলার প্রবণতায় ভেতরে ভেতরে যা ঘটে, তাতে রোগবালাই ছড়ায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজ।
সমাজে যা কিছু বিরাজমান, তার সবটুকুই সমাজেরই অংশ–সমাজের এটেনশন এবং সহমর্মিতার হকদার!

শেয়ার করুন:
  • 120
  •  
  •  
  •  
  •  
    120
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.