তালাক বনাম রাইট পারসন

0

জেসিকা ইরফান:

অনেকদিন ধরেই ভাবছি খুব সাদামাটা বাংলায় কিছু কথা লেখা আমার প্রয়োজন। আইনি কথা। প্রতিদিন বেশ ফোন আসে আত্মীয় স্বজন, বন্ধু, পরিচিত, পরিচিতের পরিচিত’র কাছ থেকে। আর ইনবক্স তো আছেই। আছে মেসেঞ্জার।

সবার ফোন এনটারটেইন করা সম্ভব হয় না। কারণ আমারও নানান সীমাবদ্ধতা আছে।
আজকের বিষয়টা শুধুই তালাকে সীমাবদ্ধ রাখি। এতো এতো ভাঙ্গন ও অবিশ্বাস সবার মধ্যে আর ভালো লাগে না। মনে হয় বিয়ে নামের ইন্সটিটিউশনটাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে বুঝি!

প্রথমেই বলি, যখন একটা পুরুষের সাথে একটা মেয়ের সংসার শুরু হয়, পুরুষটার সম্পর্ক হয় শুধুমাত্র একজন নারীর সাথে। (প্রায় ৯৫ % ক্ষেত্রে)

কিন্তু যখন একজন বাঙ্গালী মেয়ের সাথে একজন পুরুষের বিয়ের পর সংসার শুরু হয়, তখন মেয়েটার সম্পর্ক হয় সংসারের প্রতিটি খুঁটিনাটি জিনিষের সাথে। সেই রান্না ঘরের ভিম বার থেকে বাড়ির জানালায় ঝুলে থাকা পর্দার সেলাই খুলে যাওয়া সুতোটার সাথেও। এই সম্পর্ক ছিন্ন করা খুব কষ্টের, বেদনার!

একটা মেয়ে মা-বাবা-ভাই-বোন পরিচিত পরিবেশ সমাজ শহর, অনেক সময় দেশও এমনকি ছোটবেলার প্রথম প্রেমও ছাড়ে একটা সুন্দর সংসারের আশায়, সেই তুলনায় আমাদের দেশের ছেলেদের খুব কমই বিসর্জন দিতে হয় সংসার শুরু করার জন্য।

তবে এইটুকু ধ্রুব সত্য, কেউ সংসার ভাঙার জন্য সংসার শুরু করে না।

আমার কাছে বিয়ে মানে বিশ্বাস। বিয়ে মানে পরস্পরের ওপর শ্রদ্ধাবোধ। মানিয়ে নেওয়া, দুইপক্ষেরই সমঝোতা সহনশীলতা।

তারপরও এতো ভাঙ্গন কেন?
এর আগে লিখেছিলাম অনেকগুলো কমন কারণ। আজ আর যাচ্ছি না ওদিকে।

সঙ্গীর ওপর প্রতিশোধ, কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা, ও করছে আমিও করবো, আমি কম কীসে, আমিও দেখিয়ে দেবো এসব বস্তাপচা ইগো ঝেড়ে ফেলুন। অন্য কেউ ভুল করছে বলে আপনিও কেন করবেন?

প্রথমেই বলি, বিয়ের পর সাত তাড়াতাড়ি সন্তান নিতে যাবেন না, সন্তান হলে সব ঠিক হয়ে যাবে, এই কনসেপ্ট সব জায়গায় কাজ নাও করতে পারে।

১ – আপনার দাম্পত্য সংকটের সময় কারও কাছে প্রশ্ন করে কোনো লাভ নেই, আপনি কি তালাক দেবেন, নাকি দেবেন না। কারণ এটা এমন একটা সিদ্ধান্ত যেটা কেবল আপনাকেই নিতে হবে। ভালো বা মন্দ দিকগুলো আমরা বলতে পারি আপনাকে, কিন্তু সিদ্ধান্ত একান্তই আপনার। সুতরাং এই ব্যাপার নিয়ে আমাকে বা অন্য কাউকে বিব্রত না করাই ভালো।কারণ এতে আপনারা আরও কনফিউজ হবেন।

২- তালাক দেওয়া খুব সোজা। পৃথিবীর এমন কোনো আইন নেই, যে আইন আপনাকে জোর করে সংসার করাতে পারে। কিন্তু পরবর্তী সংসার (যদি করেন ) তা যে এর চেয়ে কষ্টের হবে না, তার গ্যারান্টি কে দেবে? মনে রাখবেন, পৃথিবীতে রাইট পারসন বলে দাম্পত্য জীবনে কেউ নেই। সুতরাং জ্যারা সামালকে …

৩ – আসল সমস্যা শুরু হয় তালাকের পরে। স্ত্রীর কাবিনের টাকা, তালাক চলাকালিন বা সেপারেসনে থাকাকালিন স্ত্রীর খোরপোষ। যদি সন্তান থাকে তাদের খোরপোষ। তাদের কাসটডি বা গার্ডিয়ানশিপ। তাঁদের সাথে দুই জনের সম্পর্ক রাখা।
স্ত্রী বা স্বামী যদি অন্য আরও কোনো মামলা করে তাহলে তো আর কথাই নেই। যৌতুক, নারী নির্যাতন আরও অনেক …

৪ – এগুলো চাইতে গেলে আদালতে আপনাকে যেতেই হবে। শুরু হবে কাদা ছোঁড়াছুড়ি। আপনার পরিবারের জন্য, বাচ্চাদের জন্য এবং পরবর্তী জীবনের জন্য এটা কতটুকু মঙ্গল বয়ে আনবে? দুজনেই ভাবুন।

৫ – আজ হয়তো আপনি আপনার সন্তানের কোন দায়িত্ব নিলেন না, কিন্তু এই সন্তান একদিন বড় হয়ে ঠিকই দাবি করে বসবে আদালতে। বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা আপনি কাঠগড়ায়, তখন কী বলে নিস্তার পাবেন? পাবেন না। কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দিতে হবে সমস্ত পাওনা। এমনকি আমার সম্পদের ভাগও আইন অনুযায়ী দিতে হবে তাদের। মধ্যে পরে আপনি একজন নিকৃষ্ট বাবা বা মা বলে চিহ্নিত হবেন। এর চেয়ে বড় ভার এই পৃথিবীতে আর কিছু নেই মনে রাখবেন।

৬ – দিলেন। কিন্তু আপনার সন্তান যদি বখে যায়? পারবেন মা বা বাবা কেউ এই দায়িত্ব এড়াতে? পারবেন সন্তানের সেই শৈশবকে ফিরিয়ে এনে তাকে একটা সুস্থ মানুষ হিসাবে বড় করতে? সময় একবার চলে গেলে আর ফেরে না। কেউ ফেরাতে পারেনি, আপনিও পারবেন না।

৭- মাও কিন্তু একেবারে নির্দোষ থাকবেন না। উনার প্রতিটা ভুল পদক্ষেপও কিন্তু এক একজন সন্তানের মনে তীক্ষ্ণ কাঁটা হয়ে সেইফটিপিনের মতো গাঁথা থাকবে। একদিন আপনাকে দাঁড়াতে হবেই তার মুখোমুখি। এর চেয়ে বড় আদালত পৃথিবীতে আর নেই।

এতো কথার অর্থ একটাই দাঁড়ায়, যা কিছু করবেন ভেবে চিনতে করুন। সময় নিন। আগে নিজে বিবেচনা করুন, পরে পরামর্শ নিন। ভালো ও মন্দ দিকগুলো আলাদা করুন। পাল্লায় তুলে ভাবুন। অন্যের জীবনের সাথে নিজের জীবন মেলাতে যাবেন না। স্রেফ ঠকে যাবেন। দুজন সামনা-সামনি বসুন। কথা বলুন নিজেদের মধ্যে। পজিটিভ ওয়েতে কথা বলুন। বাইরের মানুষকে পারতে ইনভল্ভ করবেন না। বোঝার চেষ্টা করুন, বোঝাতে চেষ্টা করুন আন্তরিকভাবে।

তারপরও যদি না পারেন আইনের আশ্রয় নিন। (টেলিফোনে বা ইনবক্সে আমি পরামর্শ বিতরন করি না, করা সম্ভবও নয়, উচিৎও নয়)।

শুভ কামনা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 238
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    242
    Shares

লেখাটি ১,২৬৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.