How To Train Your Husband

তামান্না ইসলাম:

প্রতিটি বিবাহিত মেয়ে চায় তার স্বামী তার প্রকৃত জীবনসঙ্গী হোক। সংসারের দায় দায়িত্ব, কাজ, কর্ম সবকিছুতেই সমানভাবে অংশ নিক। কোনো কাজকে ছোট, বড় মনে না করে বা এটা ছেলেদের কাজ, ওটা মেয়েদের কাজ এমন না ভেবে স্ত্রীর পাশাপাশি সাংসারিক কাজকে নিজের কাজ মনে করুক।

এইটুকু পড়ে নিশ্চয়ই অনেকেই হাসছেন, ভাবছেন আমি রূপকথার গল্প শোনাচ্ছি। এরকম স্বামী কি আসলেই বাস্তবে মেলে? কিন্তু, একবার ভেবে দেখুন তো, বর্তমান যুগে যেখানে মেয়েরাও স্বামীদের পাশাপাশি চাকরি করছে, অর্থ উপার্জনসহ বাইরের নানাবিধ কাজ করছে, সেখানে সংসার নামক টিমে যদি টিমওয়ার্ক না থাকে, যদি কাজের ভাগাভাগিটা ভারসাম্যহীন হয়, তাহলে সেটা কতখানি বাস্তবসম্মত?

মানছি যে, আমরা যেই অন্ধকার যুগ পেরিয়ে এসেছি, যেখানে বেশিরভাগ মেয়েই ছিল অন্তঃপুরবাসিনী, যেখানে রুটি রুজির প্রধান দায়িত্ব ছিল পুরুষের ঘাড়ে এবং বাইরের সব কাজও করতো পুরুষ, সেখানে মেয়েরা ঘরের কাজ, সন্তান পালন করলে এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ দায়িত্বের ভাগ বণ্টন হতো। কিন্তু বর্তমান যুগে তো চিত্রটা পাল্টে গেছে। দুজনেই যদি রুটি রুজি করেন, দুজনেই যদি বাজারে যান, ব্যাঙ্কে যান, বাচ্চাকে স্কুলে আনা নেওয়া করেন, বাচ্চার পড়ালেখা দেখাতে পারেন, তাহলে কেন রান্না ঘর সামলাবে খালি একজন? ঘর পরিষ্কার করবে খালি একজন? বাচ্চা লালন পালন করবে খালি একজন? সেটা তো যুক্তিযুক্ত হলো না।

আপনার স্বামী গৃহকর্ম করতে কতটুকু সক্ষম তার আগে বেশি জরুরি জানা এ ব্যাপারে তার মতামত কী? তার আগ্রহ কতোটুকু? সে কী ঘরের কাজ করাটাকে তার পুরুষ সত্তার জন্য অবমাননাকর মনে করে? সে কী ভয় পায় যে এসব কাজ সে করতে পারবে না? সে কী অলস, আরাম প্রিয় এবং মনে করে এই আরাম তার প্রাপ্য পুরুষ হিসাবে? এই সব চিন্তাগুলোর গভীরে যে কারণ সেটি হলো তার নিজ পরিবারের শিক্ষা, তার বেড়ে ওঠা, তার শৈশব। যে পরিবারে ছেলে, মেয়েরা দেখেছে বাবা, মাকে সম্মান করে, কাজে সাহায্য করে, যে মা তার ছেলেকে মেয়ের পাশাপাশি ঘরের কাজের দায়িত্ব দেয় সে পরিবারের ছেলেদের মনোভাব এ ব্যাপারে অনেক উদার হয়, সহনশীল এবং বন্ধুত্বপূর্ণ হয়।

একটা গল্প বলি। আমার দাদীর চার ছেলে, কোনো মেয়ে ছিল না। দাদী নিজে একমাত্র কন্যা, তাই আদরে মানুষ। উপরন্তু শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ। তাই আমার দাদা এবং বাবা, চাচারা দাদীকে ঘরের কাজে সাহায্য করতেন। এদের মধ্যে আমার বাবা নাকি সব চেয়ে বেশি সাহায্য করতেন। পুকুর থেকে পানি এনে দেওয়া, কাপড় কাচা থেকে শুরু করে যাবতীয় ঘরের কাজে সাহায্য করতেন। জানি না, গ্রামের স্বল্প শিক্ষিত মানুষেরা এটা নিয়ে হাসাহাসি করতেন কিনা। তবে আমার দাদী শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও মানসিকভাবে অনেক শক্তিশালী ছিলেন, তাই লোকের কথায় তিনি খুব একটা পাত্তা দিতেন না।

পরবর্তীতে এর সুফল ভোগ করেছি আমরা বংশানুক্রমে। আমার চাকরিজীবী মাকে ঘরের অনেক কাজে সাহায্য করতেন আমার বাবা। এখনো করেন। রান্না-বান্না, কাটা, বাছা, ঘর গুছানো কোনো কাজকেই তিনি অবজ্ঞা করেন না। এর ফলে আমার মায়ের পক্ষে ক্যরিয়ারে মন দেওয়া অনেক সহজ হয়েছে, সুন্দরভাবে সন্তান লালন পালনও সম্ভব হয়েছে। বাবাকে ঘরের কাজ করতে দেখার কারণে আমার ছোট দুই ভাই ছোটবেলা থেকেই আমার মতোই ঘরের সব কাজ শিখেছে। ওরাও রান্না, ঘর পরিষ্কার, বাচ্চা লালন-পালন সব কাজেই ওদের স্ত্রীদের মতোই দক্ষ। যে কারণে বিদেশে দুটো ছোট বাচ্চা পরপর নিয়ে স্বামী-স্ত্রী একই সাথে পিএইচডি শেষ করতে পেরেছে অন্য কোনো সাহায্য ছাড়া।

এতো গেল আমার বাবার পরিবারের কথা। আমার শ্বশুর বাড়ির চিত্র সাধারণ বাঙ্গালি পরিবারের মতোই। অর্থাৎ সংসারের কর্তা রোজগার করেন এবং কর্ত্রী গৃহের সব কাজ সামলান। তবে একটা ব্যতিক্রম ছিল, সেটা হলো আমার শ্বশুর, শাশুড়িকে প্রচণ্ড সম্মান করেন এবং ভালবাসেন। গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত তাকে আমি একা নিতে দেখি নাই। উপরন্তু উচ্চ শিক্ষিত বলে ছেলের বউ হিসাবে আমাকেও তিনি খুব স্নেহ করতেন। বিয়ের পরে অবাক হয়ে দেখলাম খাওয়ার টেবিলে, বিকেলের নাস্তায় শাশুড়ি আসতে দেরি করলে তিনি তার জন্য অপেক্ষা করেন। আমি ভীষণ বিস্মিত হয়েছি, কারণ সব সময় উল্টোটাই দেখে এসেছি। বাবাকে দেখে, ছেলে সম্পর্কে আশান্বিত হয়েছি।

আশান্বিত হওয়ার আরও একটা বড় কারণ আমার স্বামী ক্যাডেট কলেজের ছাত্র, পরিশ্রমী। তার মানে তাকে শেখালে সে কাজ করতে অনাগ্রহ দেখাবে না। কোনো কাজকে সে অবজ্ঞা করবে না এই বিশ্বাসটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট ছিল। আমি যেভাবে বড় হয়েছি, সেখানে আমি একাই সংসারের কাজ করবো এটা আমি কখনওই মেনে নিতে পারতাম না।

বিয়ের এক বছরর মাথায় দেড় মাসের বাচ্চা নিয়ে বিদেশে পড়তে চলে আসি। তখন উপায় কী? সে তো বাচ্চাকে ব্রেস্ট ফিড করাতে পারবে না। কিন্তু বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াতে পারবে, ডায়াপার বদলাতে পারবে। ব্রেস্ট ফিড করানোটা অনেক সময়সাপেক্ষ এবং ধৈর্যের কাজ। আমার পড়ালেখাও ছিল। তাই বাকি অনেক কাজের দায়িত্ব তাকে নিতে হলো। সে জীবনে কখনো রান্না করে নাই, মশলার নাম জানলেও কিছুই চিনে না। তবে চা বানাতে পারে। চায়ের ব্যাপারে সে কিছুটা খুঁতখুঁতেও। তাই চা বানানোর দায়িত্বটা সে নিয়ে নিল। এবং দিন দিন চায়ের স্বাদ ভালো হতে লাগলো। সেই থেকে গত বিশ বছরের সংসারে সেই চা বানায়।

রান্না আমি করলেও, তরকারি কাটা, হাঁড়ি, পাতিল ধুতে সাহায্য করতো। হ্যাঁ, তরকারি কাটা হয়তো খুব ভালো হতো না। এখনো হয়তো পেঁয়াজ কাটলে মোটা মোটা হয়। কিন্তু আমি তাতেই অনেক খুশি হই। আমার অনেকটা সময় বাঁচে। একজন বাচ্চাকে ধরলে, আরেকজন রান্নঘরের কাজ করতাম। একজন লন্ড্রি করলে, আরেকজন কাপড় ভাঁজ করতাম। এখনো তাই করি, একসাথে কাপড় ভাঁজ করি, বা যার যখন হাতে সময় থাকে সেই করে ফেলে কাপড় গোছানোর কাজটা।

আমি তাকে হাতে ধরে মশলার নাম শিখিয়েছি। যেহেতু খেতে পছন্দ করে, নিজ আগ্রহে ডিম ভাজি, ডিম পোঁচ করতে করতে ধীরে ধীরে মাংস, তারপরে মাছ এমনি করে বিদেশী খাওয়ার এক্সপেরিমেন্ট করতে শিখে গেছে দিব্যি। আমি অনেক মেয়েদেরকেই বলতে শুনি, স্বামী রান্না ঘরে আসলে তাদের অসুবিধা লাগে, কারণ কাজ পছন্দ হয় না। এটা একেবারেই বাদ দিতে হবে। ওদেরকে উৎসাহিত করতে হবে। উৎসাহ পেলে সব মানুষেরই কাজ করার আগ্রহ বাড়ে। সে নিজে কোন কোন ধরনের খাওয়া খেতে পছন্দ করে সেগুলো রান্না করতে উৎসাহ দিলে সে আরও বেশি আগ্রহ পাবে।

সবচেয়ে ভালো হয় দুজন দুই ধরনের রান্না ভাগ করে নিলে। বা যে কোনো কাজ আগ্রহ, সময়, পারদর্শিতা অনুযায়ী ভাগ করে ফেললে। একজন ঘরের মেঝে পরিষ্কার করলে, আরেকজন বাথরুম পরিষ্কার করতে পারে। আগেই বলেছি, একজন কাপড় পরিষ্কার করলে আরেকজন ভাঁজ করতে পারে। আমার স্বামী বাচ্চাদের পড়াতে গেলে খুব একটা সুবিধা করতে পারে না।

আমার বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে দেখেছি, ছোটবেলা দুজন দুই ধরনের বিষয় পড়াতো। আমার বাসায় পড়ালেখার সাথে জড়িত বিষয় আমি দেখি, আমার স্বামী দেখে ওদের খেলাধুলা, আনা নেওয়া ধরনের ব্যাপার। এর কোন বাঁধা ধরা ফরমুলা নেই, তবে মূল ব্যপার হলো, একে অন্যের জন্য সহমর্মিতা থাকতে হবে, সম্মান থাকতে হবে এবং দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে। একে অন্যের কর্মক্ষমতায় বিশ্বাস রাখতে হবে, উৎসাহ দিতে হবে। আরেকটি ব্যাপার আমার মনে হয়, বাংলাদেশে বাসায় বাইরের গৃহ পরিচারিকা রাখার কারণে স্বামীদের পক্ষে রান্নাঘরে গিয়ে কাজ করাটা অস্বস্তিকর। আপনারা এ ব্যাপারে পুরোপুরি সাফল্য চাইলে, নিজের সংসারের পুরো দায়িত্ব দুজনে মিলে নিন, বাইরের কোনো সাহায্যের দরকার নাই।

সবশেষে আমি মনে করি, মা হিসেবে ও এ ব্যাপারে আমার দায়িত্ব অনেক। আমি আমার মেয়েকে শেখাবো সে মানুষ, তার ভাইয়ের নিজেকে নিয়ে যতোটুকু স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে, তারও আছে। সংসারে তার এবং তার স্বামীর দায়িত্ব সমান সে এই মনোভাব নিয়েই বড় হবে। তাকে এটা শেখানোর দায়িত্ব আমার যেন এ ব্যাপারে সে আপোস না করে। স্বামীর সাথে শুরু থেকেই এই বোঝাপড়া থাকাটা জরুরি। শুরুতে এই এক্সপেকটেশন সেট না করলে, পরে আর সেটা বদলানো যায় না।

একইভাবে আমার ছেলেকেও এই মানসিকতা গড়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার। ছুটিতে এসে সকাল বেলা, মা ছেলে এক সাথে নাস্তা করছি। ও কলেজ থেকে বাসায় এসেছে। আমি নাস্তা বানাতে বানাতে ওকে বললাম কফি বানাতে। ওর বাবা সেদিন তাড়াহুড়োয় আমার জন্য চা বানিয়ে না রেখেই অফিসে চলে গেছে। ছেলেকে বললাম, সকালের চা’টা আমার নিজে বানাতে ইচ্ছে হয় না। স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া সকালের এই এক কাপ চা আমার সারাদিনের এক সুন্দর সূচনা।

তাই ছেলেকে বললাম ‘বাবা, তুমি যখন বিয়ে করবে বউকে প্রতিদিন সকালে কফি বানিয়ে দিও, সে অনেক খুশি হবে।’ আমি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছিলাম, সেই না দেখা মেয়েটি এই এক কাপ চায়ের বিনিময়ে নিজেকে অনেক অনেক ভাগ্যবতী মনে করছে।
মনে রাখবেন, আপনার আজকের ছেলে সন্তান আগামীতে কারও স্বামী হবে, ওদের সুখী পরিবার দেখতে চাইলে এখন থেকেই আপনার ছেলেকে একজন আদর্শ স্বামী হিসাবে গড়ে তোলার শিক্ষা দিন, যেমন স্বামীর স্বপ্ন আপনি দেখেন।

শেয়ার করুন:
  • 5.7K
  •  
  •  
  •  
  •  
    5.7K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.