চলো বদলে যাই – পুরুষ না, মানুষ হই

0

জিনাত আরা হক:

নারী অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই যে প্রশ্নের মুখোমুখি হই তা হলো, আমরা কি পুরুষবিদ্বেষী? পুরুষের বিরুদ্ধে কি আমাদের লড়াই, বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলে তোরা কি পুরুষ বাদ দিবি নাকি? তাই আজ লিখতে মন চাইলো পুরুষ নিয়ে। শুনলাম কাল নাকি পুরুষ দিবস ছিলো, তাই আরো বেশি করে মন চাইলো পুরুষ তোমাদের নিয়ে লিখতে।
পুরুষের প্রতি ভারি বিস্ময় নিয়ে আমি চেয়ে থাকি। যে পুরুষ আমার ভালবাসা, সেই পুরুষই আমার ঘৃণা। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি পুরুষের দুই ভিন্ন রূপ।

একরূপে পুরুষ ভয়ঙ্কর, কঠোর, অমানবিক। পুরুষের বিভৎসতা তার চলনে-বলনে, কথায়-ভাষায়, পোষাকে-আশাকে সবখানে। এ পুরুষ তার আশপাশের সকলকে অপমান করে, অসম্মান করে। বিশেষ করে নারীর প্রতি তার বিদ্বেষ ভয়ঙ্কর তীব্র। পিতৃত্বের সম্পর্কটিকে যত মহৎ করে তুলে ধরে হোক না কেনো, আমরা দেখি ভয়াবহ পিতার রূপ, যে সন্তানকে বিব্রত করে, বিপদে ফেলে, স্ত্রীর উপর প্রতিশোধ নিতে সন্তানকে ব্যবহার করে। আর স্বামীর ভয়াবহ রূপ তো প্রমাণিত। তথ্যই বলে ১০০ জনের মধ্যে ৮৭ জন নারীকে স্বামী বা তার পরিবার শুধু শারীরিকভাবেই কষ্ট দেয়। এই নিষ্ঠুর পুরুষ যখন সন্তান তখন সে নিশ্চয় একরাতেই ভালো সন্তান হয় না। আর এমন ভয়ংকর পুরুষ সহকর্মি বা বন্ধু হিসেবেও খুব ভিন্ন হবে, তা আশা করা যায় না।

এ পুরুষ স্ত্রীর না, বোনের না, মা-বাবার না, সন্তানের না। এ পুরুষ নিজগুণে কোনো চরিত্র ধারণ করে না। জন্মসূত্রে বা বৈবাহিক কারণে তারা এক একটি ভূমিকায় অধিষ্ঠিত হয়। এই নির্মম পুরুষ শরীরের শক্তিমত্তা দিয়ে সবকিছু বিচার করে, এ পুরুষের কোনো অন্তর নেই, চোখে জল নেই, মাথায় ঘিলু নেই। এ পুরুষ নামে মানুষ আসলে অসুর অথবা পশু।

পশুবৃত্তি তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে, তাই সে নারীর শরীরকে ভোগ করতে চায়। সভ্যতার নির্মাণে মানুষ নাকি শিখেছে মানুষকে খাওয়া যায় না। এ পুরুষ মানুষ খায়, সে নারীকে আচঁড় দেয়, আঘাত করে, হত্যা করে। যদি সুবিধা হয়, সে নারীর মাংসও খাবে। এ পুরুষ জানে, তার পৌরুষ বা বড়ত্ব প্রমাণিত হয় নারীকে ছোট করার মধ্য দিয়ে। সে তার শরীর নিয়ে তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিয়ে অহংকারী। জন্মসূত্রে পাওয়া অঙ্গ নিয়ে সে শাসন করতে চায় সারা বিশ্ব। এ পুরুষের চরিত্র নষ্ট হয় না, কারণ তার চরিত্র নাই। এ পুরুষ সৃষ্টিশীল নয়, বরং বিধ্বংসি। ঘরের মানুষদের সে বিব্রত রাখে, তা নিয়ে সে বাইরে বড়াই করে, সুযোগ পেলে সে যুদ্ধ বাজিয়ে দেয়। রাস্তাঘাটে ঘরে-বাইরে এ পুরুষ চিৎকার করে কথা বলে, একে ওকে ধমকায়, এ পুরুষ চুরি করে, দুর্নীতি করে, ঘুষ খায়। এ পুরুষ আমাদের চতুর্দিকে, নিজের ঘরে, ঘর থেকে বার হয়ে পথে, কাজের জায়গায় সর্বত্র।

তবে কিনা আরেক পুরুষের দেখাও মেলে, যে কিনা আগের নিষ্ঠুর পুরুষের মতো নয় বরং পুরো বিপরীত। এ পুরুষ যত্নশীল, বন্ধুত্বপূর্ণ, ভালবাসাপূর্ণ হৃদয় তার। এ পুরুষ কাঁদে, কবিতা লেখে, ফুল নিয়ে ভালবাসার মানুষের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা, এ পুরুষ মেয়ে বন্ধুর বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে, স্ত্রীর প্রতি মর্যাদাশীল, মা’র জন্য নিজের আনন্দ বিসর্জন দেয়। এ পুরুষ শিশুকে ভালবাসে, নারীকে নিয়ে কবিতা লিখে, নারীর শরীর তার কাছে অপার রহস্যের সৃষ্টি করে। এ পুরুষ কৈশোর থেকে স্বপ্ন দেখে, এ পুরুষ আঘাত করতে জানে না, নরম স্বরে কথা বলে, শার্টের হাতা গুটিয়ে কাউকে শক্তি প্রদর্শন করে না।

প্রশ্ন আসে মনে, কোন জনকে আমি পুরুষ বলবো, প্রথমটিকে না দ্বিতীয় টিকে? আমার প্রিয় কবিতার পুরুষ যে মাঝরাতে বৃষ্টি হলে শয্যা থেকে তুলে নেয়, আমার একান্ত নিজস্ব পুরুষ সে কি এতো ভয়ংকর? এতো ভয়ংকর পুরুষ কিভাবে কারও হয়! যে পুরুষ শিশুকালে মা’র বুকে লুকিয়ে থাকে, সে কেনো সেই বুক নিয়ে অশ্লীল বাক্যবাণ ছুঁড়ে মারে। কী বিস্ময়!! যে “প্রাণ” সৃষ্টি হয় নারীর শরীর থেকে, নারীর রক্ত-মাংস যাকে তিলে তিলে বড় করে, নারীর মমতা যাকে প্রকৃতির প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে, সেই নারীকে এই “প্রাণ” পুরুষ নামে অপমান করে!!

যে জরায়ু মানুষ নামের “প্রাণ”কে ধারণ করে, যে পথে “প্রাণ” এর আগমন ঘটে, সেই পথ হয়ে যায় শুধু যোনিপথ, সেই পথে পীড়ন করে যে পুরুষ, সেও তো এসেছে নারীর সেই যোনিপথ দিয়েই, থেকেছে নারীর জরায়ুতে। প্রশ্ন আসে তবে এ কে, মানুষ? পুরুষ? নাকি অন্য কোনো নামে ডাকতে হবে তাকে!

ধর্ষণ করে যে পুরুষ, সে সবচেয়ে বেশি অপমান করে নিজেকে, পুরুষত্ব জাহির করে যে পুরুষ, সবচেয়ে বেশি সে ছোট করে নিজেকে। পুরুষ মানেই কেনো এক মাংসপেশি সর্বস্ব, হাত-পা ছড়িয়ে হাঁটা, কর্কশ কন্ঠের ভাবমূর্তি চোখের সামনে ভেসে উঠবে? কেনো বিনয়ে ভরা, নরম স্বরে কথা বলা, নরম শরীরের এক ভাবমূর্তি মনে আসবে না?

আমি নিজে এমন কতো পুরুষের সংস্পর্শে এসেছি যাদের হৃদয়ের উত্তাপ, বিনয়, বুদ্ধিমত্তা, ভালবাসা আমার মতো নারীদের শক্তি দিয়েছে। নানা সম্পর্ক নিয়ে এসেছে তারা, বন্ধু, প্রেমিক, শিক্ষক, ভাই, স্বামী, সহকর্মি। কখনো তো মনে হয়নি যে তাদের ভূমিকায় তারা এতোটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বরং এই পুরুষ আমাকে, পুরুষকে ভালবাসতে, শ্রদ্ধা করতে, বিশ্বাস করতে শিখিয়েছে। তবে কেনো এক নিষ্ঠুর ভাবমূর্তির পুরুষকে বয়ে নিয়ে বেড়াবে এ সমাজ? যে পুরুষ নিজের শরীরের আকাঙ্খাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, যে তার চেয়ে দুর্বল “প্রাণ”কে আঘাত করে, যে কিনা মনে করে ক্ষমতা মানে শুধু পেশির ক্ষমতা, তাকে মানুষ হিসেবে খারিজ করে দিতে হবে, তাই প্রথমে প্রয়োজন প্রশ্ন তোলা, তাকে পুরুষ ডাকা হবে কি, নাকি পুরুষের ভাবমূর্তিটি বদলে দিতে হবে?

এই নিষ্ঠুর পুরুষের ভাবমূর্তি কবিতা, গল্প, নাটক, সিনেমায় নায়ক হিসেবে আনা যায় না, এ পুরুষ কখনো নায়ক হতে পারে না, এ ভিলেন। তাই মন চায় আমার পুরুষ বন্ধুদের বলি, তোমাদের আশেপাশে পুরুষ নামের যে কলঙ্কগুলো ঘুরে বেড়ায়, তাদেরকে বলে দাও, ওরা তোমাদের পরিচয়কে হেয় করছে, অথবা পুরুষ নামটা বদলে ফেলে শুধু মানুষ নাম ধারণ করো। যারা পুরুষ বলে নিজের দাপট খাটাতে চায়, তাদেরকে আজ আমাদের ত্যাগ করার সময় এসেছে। চলো বদলে যাই, পুরুষ না মানুষ হই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 566
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    569
    Shares

লেখাটি ৮৬১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.