‘পুরুষ দিবস’ উপলক্ষে একটি নারীবাদী বাণী …

0

রাফী শামস:

আমাদের মধ্যে ‘পুরুষতন্ত্র’ নিয়ে একটা মিসকনসেপশন আছে। আমরা পুরুষ আর পুরুষতন্ত্রকে এক করে ফেলি। পুরুষতন্ত্র কোনো ব্যক্তি-পুরুষ নয়, এটা একটা সিস্টেম। আমরা যখন পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলি, তখন মূলত এই সিস্টেমের বিরুদ্ধেই কথা বলি, কোনো ব্যক্তি পুরুষের বিরুদ্ধে নয়।

এই সিস্টেমে সব থেকে বেশি ক্ষতির শিকার হয় নারীরা। তাই সমগ্র বিশ্বজুড়ে যারা মানুষের সম-অধিকারে বিশ্বাস করে, নারী-পুরুষ-জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবতাবাদের চর্চা করে, তারাই এই পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার। কিন্তু আমরা অনেকেই এটা ভুলে যাই, নারীর পাশাপাশি পুরুষও পুরুষতন্ত্রের নির্মম শিকারে পরিণত হয়ে থাকে!

যে পুরুষ পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেমকে আত্মস্থ করে, বিশ্বাস করে এবং অনুসরণ করে তার দ্বারাই নারী বৈষম্যের শিকার হয়। এই পুরুষটি নিজের অজান্তে একটি ক্ষতিকর সিস্টেমকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে নিজেকে কলুষিত করলো।

পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তাকেও যে অতিরিক্ত চাপ নিতে হয়, অতিরিক্ত নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকতে হয়- এটা কিন্তু সে বুঝতেও পারলো না। অধিকাংশ নারীর মতো পুরুষটিও এই কৃত্রিম ধ্যান-ধারণা গুলোকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিল। পুরুষ কিভাবে পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেমের শিকার হতে পারে? একটু খুঁজে দেখার চেষ্টা করি।

এই ব্যাপারটা দেখার আগে আমাদের প্রথমে ‘জেন্ডার’ এবং ‘সেক্স’ এর মধ্যে পার্থক্যটা বুঝতে হবে। বাংলায় দুটোকেই ‘লিঙ্গ’ হিসেবে অনুবাদ করা গেলেও, দুটোর মধ্যে পার্থক্য ব্যাপক। ‘সেক্স’ হচ্ছে আমার বায়োলজিকাল ওরিয়েন্টেশন। অর্থাৎ বায়োলজিকালি আমার মধ্যে XX আছে না XY আছে, সেটার প্রকাশ হচ্ছে সেক্স।

সোজা কথায় বললে, সেক্স শারীরিক একটা ব্যাপার। অন্যদিকে জেন্ডার হচ্ছে সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক ওরিয়েন্টেশন। যে বৈশিষ্ট্যগুলোকে আমরা ‘পুরুষালী’ বা ‘মেয়েলী’ বলি, সেগুলো বলি জেন্ডারের আলোকে, সেক্সের আলোকে নয়। অর্থাৎ নারী ও পুরুষের পোশাক-পরিচ্ছদ, পেশা, পছন্দ, আচার-আচরণ, আকাঙ্ক্ষা কেমন হবে, সেটা নির্ধারিত হয় জেন্ডার দিয়ে। পার্থক্যটা যদি আমরা বুঝে থাকি, তাহলে এটাও বুঝতে পারছি- পুরুষতন্ত্র কাজ করে মূলত জেন্ডারের ক্ষেত্রে।

যেহেতু আমাদের বসবাস কোন না কোন সমাজে, সেই সমাজ ঠিক করে দেয় আমাদের সকল কিছু। সেই সমাজের বিচারেই আমরা কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যকে পুরুষালী, আর কিছু বৈশিষ্ট্যকে মেয়েলী বলে থাকি। পুরুষতন্ত্র হচ্ছে সেই সিস্টেম যেখানে যাবতীয় পজেটিভ, বীরত্বসূচক ও আগ্রাসী ব্যাপারগুলোতে পুরুষের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। আর বিপরীতটা হয় নারীদের ক্ষেত্রে। যেমন ‘কান্না করা’ মেয়েলী কাজ (যদিও নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই কাঁদে!), পুরুষের কাঁদতে হয় আড়ালে, সাহস নেই তো বাড়িতে চুড়ি পরে বসে থাকো (চুড়ি পরা বলতে নারীদের মত ভীতু বুঝানো হয়), হাতে পশম নেই-মেয়েদের মতো হাত, নারীরা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়- ইত্যাদি ইত্যাদি। এমন আরো অসংখ্য উদাহরণ দেয়া সম্ভব। যার কোনটারই বায়োলজিক্যাল ভিত্তি নেই। এগুলো সৃষ্টি করেছে সমাজ, তার বিভিন্ন টুলস (প্রতিষ্ঠান,ধর্ম, কাস্টমস) ব্যবহার করে।

আর এধরনের মানসিকতাই হলো পুরুষতন্ত্র, যা নারীকে দুর্বল অসহায় হিসেবে চিহ্নিত করে এবং দমিত করে রাখে।
এখন হয়তো আমরা অনেকেই ধরতে পারছি পুরুষতন্ত্র কিভাবে পুরুষকেও তার শিকারে পরিণত করে। পুরুষতন্ত্র যেভাবে বিভিন্ন মানব ও সমাজসৃষ্ট বিধি বিধান, নিয়ম, প্রথা নারীর উপরে চাপিয়ে দেয়, একইভাবে চাপিয়ে দেয় পুরুষের উপরেও। এই সিস্টেমে পরিপুষ্ট একজন পুরুষ এগুলোকে অমোঘ বিধান হিসেবে ভাবতে শেখে।

ছোটবেলা থেকেই সে শেখে একজন পুরুষ মানেই তাকে হতে হবে শক্তিশালী, সাহসী। পুরুষ মানেই তার কন্ঠে থাকতে হবে জোর, তাকে হতে হবে আগ্রাসী। পুরুষ মানে তার নিজের আবেগকে দমিত করে রাখতে হবে, আবেগ প্রকাশিত হলে প্রকাশ পাবে তার দুর্বলতা। পুরুষ হিসেবে তাকে নিতে পরিবারের নারীদের দায়িত্ব, কারণ নারীরা নিজেরা নিজেদের দায়িত্ব নিতে অক্ষম। পুরুষ মানে সে পরিবারের বাকিদের রক্ষাকর্তা, এবং রক্ষাকর্তা হিসেবে সে দাবি করতে পারবে নারীর একচ্ছত্র আনুগত্য। নারী তাকে মেনে নেবে ত্রাণকর্তা হিসেবে কারণ সে-ই রক্ষা করছে নারীটিকে। তাই নারীটির প্রতি তার এক ধরনের অধিকার আছে, যাকে কখনো প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না।

তাই পুরুষতন্ত্রের শিকার পুরুষেরা দমন করে নিজেদের আবেগকে, নিজের উপরে নেয় অতিরিক্ত চাপ, তার ফলশ্রুতিতে দাবী করে প্রশ্নাতীত আনুগত্য। আর এগুলোকে মনে করে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়ম হিসেবে। তাই পুরুষতন্ত্রের প্রথম শিকার হয় পুরুষ নিজেই এবং তারপর শিকারে পরিণত করে নারীকে। এই পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলাই নারীবাদ, পুরুষের বিরুদ্ধে কথা বলা নারীবাদ নয়। নারীবাদ মানে পুরুষতন্ত্র হটিয়ে নারীতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়, বরং সমাজের এই ক্ষতিকর সিস্টেমকে উৎপাটন করার জন্য লাগাতার সংগ্রাম।

আমাদের সমাজের দিকে একবার দৃষ্টি দিন। দেখবেন এখানে পুরুষতান্ত্রিকতার যাঁতাকলে কীভাবে পিষ্ট হচ্ছে নারীরা এবং পুরুষেরা। নারীদের উপর যেমন চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে নানা রকম অযৌক্তিক বিধি-বিধান, একই ভাবে পুরুষও হচ্ছে ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এই সমাজের একজন পুরুষকে কোন রকম পড়াশুনা শেষ করে চাকরি খুঁজতে হয়, স্বাবলম্বী হতে হয়, কারণ তাকে প্রস্তুত হতে হবে সংসারের অতিরিক্ত চাপ নিতে। যেহেতু এই সমাজ মনে করে নারীরা ‘অবলা’ এবং ‘অসহায়’, তাই তাকে প্রস্তুত হতে হবে নারীর নিরাপত্তা দিতেও। একই সাথে সে দমন করতে শিখবে নিজের আবেগকে, নিজের মধ্যে’পুরুষালী’ বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত না হলে ভুগবে হীনমন্যতায়।

নারী-পুরুষ নির্বেশেষে সবাইকেই বুঝতে হবে পুরুষতন্ত্র কিভাবে তাদের ক্ষতি করছে, বিনষ্ট করছে স্বাভাবিক মানবিক বৈশিষ্ট্য। গতকাল ছিল’পুরুষ দিবস’। এটা অনেকের কাছেই কৌতুকের বিষয়। নারীরা যে পুরো পৃথিবী জুড়েই বঞ্চিত, এটাতো খালি চোখেই দেখা যায়, তাই নারীদের নিয়ে দিবসে কেউ আপত্তি করে না। সে দিনটিতে নারী মুক্তির বিষয়ে নানা রকম আলোচনা হয়, সেমিনার সিম্পোজিয়াম হয়। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, পুরুষ দিবসটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষরাও যে পুরুষতন্ত্রের শিকার- এই ব্যাপারটা বোঝার জন্য হলেও গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের বুঝতে শিখতে হবে, পুরুষতন্ত্র কিভাবে আমাদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে অযৌক্তিক বিধি বিধান। আপনি পুরুষ, তার মানে এই নয় আপনাকে প্রচণ্ড শক্তিশালী হতে হবে, কন্ঠস্বর হতে হবে ভারী। এর মানে এই নয় আপনার উপরে কোন শ্রেষ্ঠত্ব আরোপিত হয়েছে কিংবা আপনার সাথের নারীটি আপনার থেকে দুর্বল।

পুরুষতন্ত্র উৎপাটনে পুরুষরাই এগিয়ে আসুক, নারীদের হাত ধরে- ‘পুরুষ দিবস’টা এই কথা বলেই উদযাপন করা যেতে পারে। আপনার কী মনে হয়?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 397
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    400
    Shares

লেখাটি ৬৭৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.