সাইবার হয়রানির ক্ষেত্রে বয়সভেদে তারতম্য নেই

লিপিকা তাপসী:

ঘটনা ১: বছর খানেক আগে একটি কাপড়ের দোকানে ৫০% সেল চলছিল। গুলশানের আউটলেটে গিয়ে কাঙ্খিত সাইজ পাওয়া না গেলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া আপাতত সুবোধ বলে মনে হওয়া এক কিশোরকে আমার ফোন নম্বর দিয়েছিলাম। কথা ছিল, সে কাঙ্খিত প্রোডাক্ট এলে আমাকে ফোনে জানাবে।

কিছুদিন পর থেকেই আমাকে রাত ১২ টা, ১ টার দিকে ফোন দেওয়া শুরু করে। প্রথমে উদ্দেশ্যহীন ফোন না দিতে অনুরোধ করলাম। কিন্তু অনুরোধে কাজ হলো না, বরং সময়ে অসময়ে অকারণ ফোন বেড়ে চললো। পরে বেশ জোরেশোরে একটা ঝাড়ি লাগানোর পর ফোন দেওয়া বন্ধ হলো। কিন্তু এর পরিবর্তে ফেসবুকে মেসেজ দেওয়া শুরু হলো। সেখানেও ব্লক করলাম। বেশ কয়েকমাস পরে দেশের বাইরের নাম্বার থেকে ফোনে আবার তাকে পাওয়া গেলো। তিনি বিদেশ পাড়ি জমিয়েছেন, কিন্তু নারীদের নম্বর ভোলেননি, তাদের ফোন নম্বরে ফোন দিতেও ভোলেননি। অটো রিসিভের ব্যবস্থা করার পর বেচারা থামলেন। হঠাৎ তিনি আবার উদয় হলেন একটি নারীর ছবি এবং নাম ব্যবহৃত ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মেসেজ দেওয়ার মাধ্যমে। প্রোফাইল ব্লক করার পর বন্ধ হলো সেটি।

ঘটনা ২: একদিন ভোর রাতে এক আত্মীয়ের বিপদের খবর পেয়ে আমরা জেগে ছিলাম। একটু পর পরই বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন আসছিল। তো, মাঝে মাঝেই ফোন আসছে কথা বলছি, তারই মধ্যে ম্যাসেঞ্জারে কল। সাধারণত খুব কাছের না হলে ম্যাসেঞ্জারে কল ধরা হয় না, রাতে তো নয়ই। কিন্তু সে মুহুর্তে এসব ভাবার সময় ছিল না। রিসিভ করতে গিয়ে টের পেলাম সেটি ভিডিও কল। রিসিভ করার পর স্ক্রিনে কেমন একটা আলো অন্ধকারের ছবি, বুঝে উঠতে উঠতেই ভেসে উঠলো একটি পুরুষাঙ্গের ছবি। নারী প্রোফাইলের আড়ালে এই বিশেষ যন্ত্রটির অধিকারী অমানুষটাকে বিকৃত ছাড়া আর কিইবা বলা যেতে পারে। তার বিশেষ একটি অঙ্গ দেখাতে জায়গা খুঁজে বেড়াতে হয়, নারীর মুখোশ ধরতে হয়, তখন তার আশেপাশে থাকা অন্যরা কতটুকু নিরাপদ, সেটা নি:সন্দেহে অনুমান করা যায়। কলের ওপাশে বিকৃত লোকটিকে গালি দিতে দিতে ব্লককরলাম এবং ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে রিপোর্ট করলাম। প্রোফাইল দেখলাম চারজন মিউচুয়াল বন্ধু আছে তার সাথে। এই ঘটনা ফেসবুকে নিজের ছবি নিরাপদ করার প্রয়োজনীয়তা আবারও নতুন করে মনে করিয়ে দিল।

ঘটনা ৩: কিছুদিন আগে একজন বয়স্ক নারীর সাথে কথা হচ্ছিল হয়রানির বিভিন্ন ধরন নিয়ে। তিনিও বাদ যান না হয়রানি থেকে। তার ঘটনাটি এরকম। একটি নাম্বার থেকে তার মোবাইলে প্রতিনিয়ত কল আসে। রিসিভ করলেই লোকটি বলতে থাকে, আমি তোমাকে কিস করছি, কিস করছি….। একটা ব্লক করলে আরেকটা থেকে করে। যেহেতু তার অনেকদিনের নাম্বার, তাই নাম্বারটি পরিবর্তন করতে পারেন না। তার পার্টনার, কলিগ দিয়ে বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেও কাজ হয় না, ফোন করতে তার ক্লান্তি আসে না। ফোন না ধরলে ৩০-৪০ বার মিসড কল মারেন। শেষমেষ নাম্বার পরিবর্তন করে হয়রানি থেকে মুক্তি মিলেছে।

ঘটনা ৪: এখন যোগ হয়েছে গোপনে ভিডিও করে সেগুলো বিভিন্ন সাইটে ছেড়ে দিয়ে হয়রানি এবং অভাব নেই সেখান থেকে ফায়দা নেয়ার লোকেরও। একজন পরিচিত বন্ধুর তার ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে কোনো একটি ব্যক্তিগত মুহুর্তের দৃশ্য ভিডিও করে তার এক প্রতিবেশী। তাদের মধ্যে যখন বন্ধুত্বে ফাটল ধরে, তখন সেই ভিডিওটি দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্ল্যাকমেইল করে আসছিল। তাকে ফাঁসাতে বিভিন্ন সাইটে ভিডিওটি ছেড়ে দেয় একপর্যায়ে। লোকাল প্রশাসন পর্যন্ত গড়িয়ে অনেক হয়রানির পর বিষয়টির মীমাংসা হয়।

এরকম বহু ঘটনা পাওয়া যাবে। ইন্টারনেটের বদৌলতে হয়রানিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এর ভিক্টিম বেশিরভাগই নারী। নারীর ছবি ব্যবহার করে ভুরি ভুরি ফেসবুক একাউন্ট পাওয়া যাবে। হয়রানির ঘটনা আমরা চেপে যাই, এ লজ্জা নিজের দিকে টেনে চেপে রাখি। আর এভাবেই অপরাধী বার বার সানন্দে একই ঘটনা ঘটিয়ে যায়। হয়রানির শিকার হওয়ার দায় আমার নয়, তাই এ লজ্জাও আমার নয়। এ লজ্জা অপরাধীর।

বিটিআরসির একটি সেল আছে সাইবার, ক্রাইম, অনলাইন হয়রানি বন্ধ করার জন্য, এ সম্পর্কিত অভিযোগ গ্রহণের জন্যে। ২৮৭২ নম্বরের একটি হেল্প লাইনও আছে । এই নম্বরে ফোন করলে ভীষণ সহযোগিতারপূর্ণ আচরণ পাওয়া যাবে এবং তথ্যও মিলবে। অভিযোগ প্রদানের জন্যে [email protected] এই ঠিকানায় ইমেইলও করা যায় কিন্তু অধিকাংশ সময় মেসেজ আসবে গ্রহীতার মেইল বক্স ফুল এইমুহুর্তে আপনার মেসেজ গ্রহণ করতে পারছেন না। পরবর্তীতে আবার চেষ্টা করুন।
এ সম্পর্কিত কোনো সমস্যা সমাধান করতে শেষ ভরসা স্থল সশরীরে বিটিআরসির অফিসে (Bangladesh Telecommunication Regulatory Commission (BTRC), IEB Bhaban (5,6 & 7 floor), Ramna, Dhaka-1000) দৌড়াতে হবে।

এরকম হয়রানি বন্ধের জন্যে সবার সোচ্চার হওয়াই কাম্য।

শেয়ার করুন:
  • 710
  •  
  •  
  •  
  •  
    710
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.