পুরুষের ইগো হার্ট করা নারীর জন্য ব্লাসফেমির মধ্যে পড়ে

0

প্রমা ইসরাত:

আমাদের দেশের পুলিশ প্রশাসনে যে পুরুষ এবং নারীরা বসে আছে, তাদের মধ্যে শতকরা ৯৯.৯৯ ভাগই পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনা পোষণ করেন। একজন মানুষের উপর আরেকজন মানুষ জোর জবরদস্তিমূলক আচার আচরণ করতে পারে না, সে তার পরিবারের লোক হোক কিংবা হোক কোন অপরিচিত, অজ্ঞাতনামা। অথচ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী অপহরণের ঘটনায় পুলিশ বলেছে, তাকে তার স্বামীই তুলে নিয়ে গেছে, তারপরও আমরা দেখছি”।

জানা গেছে, শোভা নামের মেয়েটার ডিভোর্সের আর এক মাস বাকি ছিল, মানে তাদের মধ্যে সম্পর্ক যেটা ছিল, সেটা আইনের একটা বিধানের কারণে। যেহেতু ডিভোর্স কার্যকর হতে ৯০ দিন সময় লাগে। এখন ওই লোক শোভাকে ধর্ষণ করলেও দেখা যাবে যে পুলিশ বলছে, তাকে তো তার স্বামীই ধর্ষণ করেছে। তাহলে সেই হিসেবে মেয়েটি কে মেরে ফেললে পুলিশ কী বলবে? তাকে তো তার স্বামীই খুন করেছে, এই কথা বলবে?

পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা ভাবনা একজন পুরুষকে বলে দেয় যে, তার স্ত্রী হচ্ছে তার মালিকানাধীন একটি প্রাণী। আমাদের দেশের সকল শ্রেণি এবং পেশার মানুষের মধ্যে এই ধারণা রয়েছে। অনেক সময় ছেলে সন্তানের অহেতুক আবদার শুনে অনেক মা আহ্লাদ করেই বলে থাকেন, এই শোন, যখন বউ আসবে তখন বউকে জ্বালাইস, আমাকে না। আহারে ! আমাদের দেশের আহ্লাদের ঢেঁকি মাতার পুত্রের দল।

বউ এই শব্দটা একজন ছেলের মনে কাল্পনিক এবং অবাস্তব একটা ধারণা তৈরি করে। বউ হবে নরম, সুন্দর, ঘরের কাজ জানবে, রেঁধে মুখে তুলে খাওয়াবে, শরীর টিপে দিবে, ঘুম পাড়িয়ে দিবে, ভালোবাসবে, সে হবে স্বামীর বাধ্য, তাকে নানান ভাবে আদরে সোহাগে ভরিয়ে তুলবে, তার খেয়াল রাখবে, তার সুখে-দুঃখে পাশে থাকবে, তার যত্ন-আত্তি করবে, তার বাবা-মাকে ভালোবাসবে, তার ভাই-বোনকে ভালোবাসবে, তার জ্ঞাতী গুষ্ঠিকে ভালবাসবে, তার বাড়ির পোষা প্রাণীকেও ভালোবাসবে।

এই যে বউ বা স্ত্রী এর কাঠামো, এই কাঠামোর মধ্যে যখনই কোনো নারী পড়েন না, বা পড়তে চান না, তখনই সেই খারাপ স্ত্রীকে শায়েস্তা করার বিধান নিয়ে স্বামী হাজির হোন। কিছু কুলাঙ্গার আবার স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার বিধান এর বেলায় বলে যে, আরে না না চুল ধরে বা মুখে মারতে কিন্তু নিষেধ করা আছে কিন্তু। বাহ ! বাহ! তওবা তেরা জ্বালওয়া, তওবা তেরা প্যায়ার।

এখন একজন নারী যদি তার অপছন্দের সেই বিবাহিত জীবন থেকে বের হয়ে আসতে চায়, তাহলে সমাজের নানান ধ্বজাধারীরা তো বাধা দিতে আসেই, তার উপর সেই স্বামীটি যে প্রাক্তন হতে চলেছে, বা হচ্ছে, নানান ভাবে সেই নারীর জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা শুরু করে।

বিবাহিত জীবনে তো সেই মেয়েটিকে সুখী হতেই দেয়নি, বিবাহ বিচ্ছেদের পরও কী করে মেয়েটির জীবনকে নরক করা যায়, সেই চিন্তায় অস্থির হয়ে থাকে এরা। কারণ কী? কারণ হচ্ছে, সে নিজেকে পুরুষতান্ত্রিক চেতনার একজন সংগ্রামী যোদ্ধা মনে করে, যার কাজ হচ্ছে নারীকে পুরুষের অধীনে রাখার ব্যাপারটি যে কোনো মূল্যে প্রতিষ্ঠা করা। নারী জাতকে পুরুষের পায়ের নিচে রাখার মানসিকতা পোষণ করা সেই পুরুষরা যে নারীর গর্ভ থেকে বেরিয়েছে সেটা তারা ভুলে যায়।

শোভাকে যে লোকটি তুলে নিয়ে গেছে, সে নাকি আইনজীবী! ছিঃ কী নিকৃষ্ট! আইনের একটা সনদ পেয়ে গিয়ে নিশ্চয়ই এই লোক ধরে নিয়েছে, সে এক বিরাট তীর মেরেছে, সে একটা বিরাট কিছু, এবং তার মতো বিরাট কিছুর সাথে মেয়েটি যেহেতু ঘর করতে চায় না, তাই সেই অহং বোধ থেকে সে একটা শিক্ষা দিতে মেয়েটিকে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস থেকে তুলে নিয়ে গেল। আর ভার্সিটির ভিসি বা প্রক্টর, তারা হাত উঠিয়ে বলে দিলেন, স্বামী স্ত্রীর ব্যাপারে আমাদের কোন কিছু বলার নেই। বাহ বাহ, তওবা তেরা জ্বালওয়া, তওবা তেরা পেয়ার….

শোভার সাথে অনেক কিছুই হতে পারে, সে খুন হতে পারে, ধর্ষণের শিকার হতে পারে, তার ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছেঁড়ে দেবার হুমকি দিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারে, অনেক অনেক যন্ত্রণদায়ক ঘটনাই ঘটতে পারে শোভার সাথে। একজন নারী যে অসহায়, এবং অবলা, এবং তাকে যে কোন মূহুর্তে যে কোনো কিছু করার ক্ষমতা পুরুষ রাখে, সেটাই প্রমাণ এর চেষ্টা আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার।

আর তাই আমাদের দেশের গার্হস্থ্য বিজ্ঞানের বইয়ে মেয়েদের কী করে সামলে সুমলে কৌশলে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া থেকে বাঁচতে হবে সেই কৌশলগুলো লেখা থাকে, বাড়িতে একা থাকা যাবে না, আকর্ষণীয় পোশাক পরা যাবে না, কেউ কিছু বললে, গালি দেয়া বা জুতা দেখানো যাবে না।

কারণ পুরুষকে জুতা দেখালে তার ইগো হার্ট হয়, আর পুরুষের ইগো হার্ট করা ব্লাসফেমির মধ্যে পড়ে, কেননা পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে পুরুষই নারীর ইশ্বর। তাই সেখানে লেখা থাকে না নারীকে প্রতিবাদী হতে হবে, নারীকে আত্মরক্ষার কৌশল রপ্ত করতে হবে, কেউ গায়ে হাত দিলে জুতিয়ে ওর বিষ নামাতে হবে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 284
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    285
    Shares

লেখাটি ৯০৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.