লেটস ডাচ

মাসকাওয়াথ আহসান:

পুরুষতন্ত্র শব্দটিকে যে রকম ঢালাওভাবে আমরা ব্যবহার করি; তা পুরুষকে অত্যন্ত নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করে। যে কোনো তন্ত্রই অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। যেসব নারী পুরুষের আয়ের ওপর নির্ভরশীল; পুরুষতন্ত্র তাদের ঘাড়েই সওয়ার হয়। অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নারীর ওপর পুরুষতন্ত্র ক্রিয়াশীল হবার কোন যৌক্তিক কারণ নেই।

অনগ্রসর সমাজে নারীর নিয়তি যেভাবে পুরুষ নির্ভর; অগ্রসর সমাজে তা নয়। অগ্রসর সমাজে নারী যথাযোগ্য ক্ষমতায়িত। এই ক্ষমতা লাভের পর অগ্রসর সমাজের নারী অহোরহো পুরুষতন্ত্র শব্দটি বলে নারীতন্ত্র কায়েমের চেষ্টা করে। এই চেষ্টাটি অমূলক। প্রান্তিক নারীর দুর্ভাগ্য নিরসনে কাজ করতে প্রান্তিক পুরুষতন্ত্রকে সংস্কার করতে হবে। প্রান্তিক নারীর শিক্ষা বিকাশ; কাজের সুযোগ সৃষ্টির মাঝ দিয়ে তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করে গড়ে তুলতে হবে। মনোযোগ দিতে হবে নিম্নবিত্ত সমাজের দিকে। মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত জীবনের শখের নারী-পুরুষ দ্বন্দ্বে সময় ক্ষেপন অপ্রয়োজনীয়।

অগ্রসর সমাজে নারী-পুরুষ কফিশপে বা রেস্টুরেন্টে গেলে বিল দেবার সময় উভয়েই বলে, লেটস ডাচ। যা বিল এসেছে তার অর্ধেকটা দেয় নারী; অর্ধেকটা দেয় পুরুষ। এই ছোট্ট অনুশীলিত সংস্কৃতির বিষয়ের মাঝেই প্রতীকী সমতার বিষয়টি লুকিয়ে আছে। অগ্রসর সমাজে কোনো নারী যখন কোনো পুরুষের সঙ্গে প্রেম বা বিয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলে; তা হয় দুজন মানুষের মাঝে সমতার ভিত্তিতে সামাজিক চুক্তি। “অমুক আমাকে বিয়ের অঙ্গীকার করে বিয়ে করে নাই” বলে হাত-পা ছুঁড়ে সিন ক্রিয়েট করার ব্যাপারটা অগ্রসর সমাজের নারী বা পুরুষ কেউই করে না।

অথচ এরকম প্রবণতা দক্ষিণ এশীয় কথিত অগ্রসর সমাজে চোখে পড়ে। শান্তিপূর্ণভাবে প্রেম বা বিবাহের চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার মতো সভ্য সংস্কৃতি অর্জন করতে পেরেছে খুব অল্প সংখ্যক মানুষ। আবার অন্যের প্রাইভেসিতে বা দুজন মানুষের মাঝের নিজস্ব জায়গায় অন্য মানুষের উঁকিঝুঁকি দেবার অনগ্রসর প্রবণতাটিও দৃশ্যমান। এর কারণ দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক গতিশীলতা। একজন মানুষ অর্থবিত্তে মধ্য উপার্জন বা উচ্চ উপার্জনে পৌঁছে গেলেও সাংস্কৃতিক স্তর সেই অনগ্রসর সমাজে পড়ে থাকায় “দ্রুত রেগে যাওয়া” “অশ্লীল গালাগাল করা” “অন্যকে নিয়ে কুৎসা রচনার ও প্রচারের” খুবই পশ্চাৎপদ আচরণগুলো দৃশ্যমান হয়।

সেকারণে এরকম অসম সাংস্কৃতিক বিত্তের সমাজে নারী-পুরুষ উভয়কেই সচেতন থাকতে হবে মেলামেশা ও বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে। একজন পুরুষ বা নারী শুধুই উচ্চবিত্ত; কিন্তু অন্তর্গত আলোকায়ন ঘটেনি; যার সাহিত্য-সংগীত-চিত্রকলা-চলচ্চিত্রের সঙ্গে শৈশব থেকে একটা সহজাত সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি; তার সঙ্গে সাংস্কৃতিকভাবে অগ্রসর নারী বা পুরুষের বন্ধুত্ব টিকবে না; কারণ তাদের গল্প করার বিষয় ফুরিয়ে যাবে। সংলাপ ফুরিয়ে যাওয়া মানেই অশান্তি বা যুদ্ধ।
সাংস্কৃতিকভাবে আলোকায়িত মানুষের বন্ধুত্ব আর শুভ প্রত্যাশা থেকে যায় যোগাযোগ-প্রেম-বিয়ের অবসানেও। আর সম্পর্কের লেবু চিপে তেতো করে সাংস্কৃতিকভাবে অনগ্রসর মানুষ।

ব্যক্তিগতভাবে আমার নারীর সঙ্গে সম্পর্কের তিক্ততার অভিজ্ঞতা না থাকায় আমার পক্ষে নারীর সমালোচনা করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। আবার একটু শিল্প-সাহিত্য রসিক পুরুষদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করায় পুরুষের সমালোচনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। সব মানুষের সঙ্গে বিনয়ী ও কার্টিয়াস হয়ে বন্ধুত্বটা সাংস্কৃতিক রুচি বা ঝোঁক মিলিয়ে করলে নারীতন্ত্র-পুরুষতন্ত্র নিয়ে এতো মাথা না ঘামালেও চলে বলে মনে হয়।

তবে দেখতে পাই অসম সংস্কৃতির সমাজে নারী ধর্ষণের মহামারী রয়ে গেছে। নারী শারীরিকভাবে দুর্বল এই মিথ চালু থাকায় তাদের যত্রতত্র যৌন নিগ্রহের শিকার হতে হয়। নারী শিশুদের স্কুল থেকেই আত্মরক্ষা কৌশল প্রশিক্ষক দিয়ে ধর্ষণ ও যৌন নিগ্রহের অবসান ঘটানো সম্ভব। আর ধর্ষণবিরোধী আইনের যথাযথ প্রয়োগের জন্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সামষ্টিক সক্রিয়তা জরুরি।

সমাজে এই অসম সংস্কৃতির কারণে পুরুষ নির্যাতনের হারও বেড়েছে। গভীর বোধসম্পন্ন, কোমল মনের অনেক পুরুষ “হালকা চিন্তার” “নিষ্ঠুর মনের” অনেক নারীর দ্বারা প্রতিদিন নির্যাতিত হচ্ছে। এই নির্যাতন বন্ধের জন্য কার্যকর আইন ও এর প্রয়োগের কথা ভাবতে হবে।

অসম সংস্কৃতির সমাজে “পুরুষের অধিকার” ব্যাপারটাকে হেসে উড়িয়ে দেবার একটা প্রবণতা দৃশ্যমান। বর্তমানে নারী সমাজে শিক্ষা বিকশিত হয়েছে, সাংস্কৃতিক আলোকায়ন ঘটেছে; সুতরাং চিন্তার ক্ষেত্রে অগ্রসর নারীরা পুরুষ নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন বলে প্রত্যাশা করা যায়। আর পুরুষকে সোচ্চার থাকতে হবে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে। নারী পুরুষ একে অন্যের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে সক্রিয় হলেই একটি সুষম সংস্কৃতির সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব।

শেয়ার করুন:
  • 123
  •  
  •  
  •  
  •  
    123
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.