তথাকথিত ‘স্বামীর অধিকার’ থেকে কবে মুক্তি পাবে মেয়েরা?

বৈশালী রহমান:

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর যে বলেছেন “স্বামীর অধিকার আছে স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়ার”, এটাতে অবাক হওয়ার মতো তেমন কিছু পাচ্ছি না আমি। কেননা, আমি এই কথার সাথে মিল আছে এরকম অনেক কথাই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি এবং চেনাজানা মানুষজনদের এসব “সংস্কৃতি ঐতিহ্যের” নামে সমর্থনও করতে দেখে আসছি। দেখুন তো, নিচের বিষয়গুলো পরিচিত মনে হয় কিনা?

১। স্বামীর অধিকার আছে বিয়ের পর স্ত্রীকে তার নিজের মা বাপের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বামীর মা বাপের সেবায় নিয়োজিত করতে বাধ্য করা। এর প্রতিবাদ যে নারী করবে সে ভিলেইন, ভ্যাম্প, ডাকিনী, কালনাগিনী।

২। নারীর প্রথম কর্তব্য সংসার করা, বাচ্চা পালন, শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা। লেখাপড়া, ক্যারিয়ার এইসব সেকেন্ডারি ব্যাপার। অতএব স্বামীর অধিকার আছে সংসার দেখাশোনা এবং বাচ্চা পালন ও নিজের মা বাপের সেবা করার প্রয়োজনে স্ত্রীর পড়াশোনা, কেরিয়ার বন্ধ করে দেওয়া। প্রয়োজন হলে মাইর দিয়ে হাতের কবজি কেটে স্ত্রীর লেখাপড়া “বন্” করতে হবে। যে ঘটনা অলরেডি বাংলাদেশে ঘটেছে।

৩। আসল কথা তো ভুলেই গেছিলাম। “স্বামী” যেহেতু কাবিনের টাকা দিয়ে স্ত্রীর শরীর কিনেছে, অথবা বাপ ভাই ও অন্যান্য পুরুষ অভিভাবকের কাছ থেকে “সম্প্রদান কারকে” স্ত্রী প্রাপ্ত হয়েছে, অতএব স্ত্রীর ইচ্ছা থাক আর নাই থাক, তার শরীরের ওপর প্রয়োজনে ধর্ষণের মাধ্যমে হলেও সম্পূর্ণ মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা স্বামীর “পবিত্র অধিকার”। এই জিনিসকে ম্যারিটাল রেপ বলা যাবে না। যদি দুই একটা “বেয়াদব মাইয়া” মাঝে মাঝে মুখ ফুটে বলে ফেলে তবে তাদের “মাগী, বেশ্যা, কিটিছাগী” ইত্যাদি বলে তাদের মুখ বন্ধ করে দিতে হবে।

৪। যেহেতু স্ত্রী কী কাপড় পরবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও তার নেই, কাজেই স্ত্রীকে পর্দা করতে বাধ্য করাও “স্বামীর অধিকার”। স্ত্রীর হাজার ইচ্ছা থাকুক না কেন ফ্যাশনেবল্ পোশাক পরার, সাজগোজ করার, চুলগুলো আধুনিক ফ্যাশনে ছেঁটে খোলা চুলে রাস্তায় হাঁটার, তাদের এই “অবাধ্যতা”কে দমন করে পর্দা হিজাবে আবৃত করে দেওয়াও “স্বামীর অধিকার”। শুধু তাই নয়, বিয়ের পর স্ত্রী তার কোনো পুরুষ বন্ধুর সাথে যেন মিশতে না পারে, তারা যেন বাসায় আসতে না পারে, এবং বিয়ের পরে স্ত্রী কোন কোন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের সাথে মিশতে পারবে ও কাদের সাথে পারবে না, সেটা ঠিক করে দেওয়াও “স্বামীর অধিকার”।

আমার সচেতন ভ্রাতা এবং ভগিনীবৃন্দ, রাবি প্রক্টরের এই “স্বামীর অধিকার আছে স্ত্রীকে নিয়ে আসার” এ কথাটা আসলে এমন কোনো আনকমন কথা না যে শুনে চমকে যেতে হবে। আমাদের দেশের অন্তত পঁচানব্বই শতাংশ মানুষ, যাদের মস্তিষ্ক যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা পুরুষতান্ত্রিক আবর্জনায় পূর্ণ হয়ে আছে, এ কথাটি তাদের সকলেরই মনের কথা। রাবির প্রক্টর মুখে প্রকাশ করেছেন মাত্র।

এই “স্বামীর অধিকার” এর নামে যুগ যুগ ধরে নারীর প্রতি যে বৈষম্য চলে আসছে, তার বিরুদ্ধে কথা বলে আসছে নারীবাদীরাই। হঠাৎ হঠাৎ একেকজন তলোয়ারের মতো ঝলসে উঠে সমাজের বৈষম্যমূলক প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, আর সাথে সাথে ধর্মীয় মৌলবাদী থেকে শুরু করে আমার প্রিয় “নাস্তিক, মুক্তমনা, প্রগতিশীল, মানবতাবাদী” ভাইবোনেদের মধ্যেও কেউ কেউ উঠে পড়ে লেগেছেন তাদের নানারকম ট্যাগ দিতে। কী সব বিচিত্র ভাষা সেই ট্যাগের! “ছিনাল, মাগী, বেশ্যা, শরীরসর্বস্ব, চ্যাপ্টাবাদী, কিটিছাগী” আরও কতো কী! রাবির প্রক্টরের সাথে পার্থক্য কী আপনাদের? তিনি মুখে যে কথা বলেন, আপনারা সেই কথা মনে আটকে রাখেন, এই তো?

অতএব, স্বামী স্ত্রীকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে এটা নিয়ে প্রতিবাদ করছেন ভালো কথা। উপরে যে “স্বামীর অধিকার” এর কথা উল্লেখ করলাম, প্রয়োজনে সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সৎসাহস আমার “নারীবাদী নই, মানববাদী” ভাইবোনদের আছে তো?

নাকি সব জোশ এই নতুন ইস্যুতে খরচ করে ভবিষ্যতে “নারীবাদী বেয়াদব” রা যখন “স্বামীর অধিকার” খর্ব করার জন্য লেখালেখি করবে তখন তাদের পিছে কাঠি দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগবেন?

শেয়ার করুন:
  • 988
  •  
  •  
  •  
  •  
    988
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.