নারীকেন্দ্রিক গালিগুলো পাল্টানোর সময় এসেছে

নাঈমাহ তানজিম:

বাসার পাশে দেওয়ালের ওপারে ড্রেইনের উপর দিয়ে গিয়েছে লম্বা একটা বস্তি। প্রতিদিন সকালে সেই বস্তিতে ২-৩ জন মহিলার মধ্যে ঝগড়া হবেই, সেইসাথে অশ্রাব্য ভাষায় গালিবর্ষণ। কখনো খুব খেয়াল করে শুনলে বোঝা যায়, সেই গালিগালাজ ঘুরেফিরে একই কিছু শব্দের পারমুটেশন-কম্বিনেশন।

এই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রচলিত গালিটি হচ্ছে নারী ও তার চরিত্রকেন্দ্রিক। কোনও এক বিশেষ পেশার নারীদের তাদের শরীরের বিনিময়ে টাকা নেওয়ার জন্য ধিক্কার জানিয়ে সেসমস্ত গালাগাল। এখানে আমি কিছু অসামঞ্জস্য খুঁজে পাই।
প্রথমত, শরীর বিক্রি করা যদি অন্যায় হয়, তাহলে বিল গেটস এর হওয়া উচিৎ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি। সে মগজ বিক্রি করে আজকে এতো ধনী।

দ্বিতীয়ত, ধরলাম বিল গেটস আর যৌনকর্মীরা যেহেতু শরীরের ভিন্ন ভিন্ন অংশ বিক্রি করে, সেজন্য এই পেশা লজ্জাজনক। তাহলে, এই লজ্জা আসলে কার? ওই যৌনকর্মীরা যে কিনা কোথাও একটা “বলার মতোন” পেশা জুটাতে পারেনি? নাকি এই অথর্ব সিস্টেমের, যেখানে একটা মেয়েকে পেটের তাগিদে এই পেশা বেছে নিতে হয়? যখন রেপড হওয়া একটা মেয়ে আবার স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে চায়, তখন তো তার নিজের ঘরের দরজাই সবচেয়ে আগে বন্ধ হয়।

যাই হোক, কথা হচ্ছিলো গালিগালাজ নিয়ে। যার উদ্দেশ্যে গালি দেওয়া হচ্ছে, সে যদি নারী হয় তাহলে তো সরাসরি বে*, মা*, এর যত প্রতিশব্দ আছে, সবগুলা ব্যবহার করা হয়। আর যদি কোনও পুরুষ হয়? তাতেও তোমার রেহাই নেই নারী! তোমার পুত্র-ভাই এর উদ্দেশ্য বর্ষিত গালাগাল তোমার আমলনামাতেই আসবে, এবং সেই “**কির পোলা, **র ভাই” এই একই পথ ধরে। একটা রিকশাচালক সাইড না দিলে তার মা-বোনকে চরিত্র এবং পেশা ধরে গালাগাল করার কী আছে, বুঝলাম না।

জাপান আমার খুব পছন্দের দেশ। সূর্যের আলো এদেশে সবচেয়ে আগে পড়ে বলেই মনে হয় ওদের মন থেকে অনেক অন্ধকার ইতিমধ্যে দূর হয়েছে। জাপানে সবচেয়ে অপমানজনক গালি হচ্ছে, স্টুপিড বা বোকার হদ্দ। আমার এই গালিটা খুব মনে ধরেছে। কেউ যদি মানুষ এর মস্তিষ্ক নিয়ে জন্মায়েও নির্বোধ পশুর মতোন আচরণ করে, তার উদ্দেশ্যে “গর্দভ” বলাই যায়।

আবার কেউ ইচ্ছা করলে ডেভিড ফিঞ্চারের Se7en মুভি থেকে উৎসাহী হয়ে, বাইবেলে বর্ণিত সাতটি পাপ এর পাপীকে গালি বানায়ে ফেলতে পারেন। যেমন রিকশাচালক সাইড না দিলে, “ওই ব্যাটা কুঁড়ের বাদশাহ!” অথবা সিটিং বাসে লোকাল যাত্রী তুললে কন্ট্রাক্টরকে “লোভী কোথাকার” বলে ধমক মারতে পারেন।

এতো প্যাঁচাল পারার কারণ হলো, আমার মনে হয়, এই প্রচলিত গালিগুলাকে বদলানোর সময় এসেছে। কুকুর-শূকর ইত্যাদি নিরীহ প্রাণী, বা মা-বোন তুলে গালি দেওয়াটা খুবই অন্ধকারে থাকা জাতির পরিচয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.