এখনই অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা

0

হৃদিমা হক:

সোডিয়াম আর নিয়ন আলো তোমার জন্য নয়। পৃথিবীর উল্টো পাশে সূর্য চলে গেলে আঁধার নেমে আসে এদেশে, এদেশের ব্যস্ত নারীদের জীবনে। এই সমাজে অধিকাংশ নারীদের জন্য অলিখিত আইন “সূর্যাস্ত আইন” ।
না না, লর্ড কর্নওয়ালিশ প্রণীত জমিদারদের জন্য নয়, এই সমাজ নারীদের জন্য ঠিক করে দিয়েছে এই নিয়ম। শুধু নারীদের নয়, এই দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিতে অনেকাংশেই বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই নিয়ম।

মনে করেন, আপনার পাশের বাসায় দু’টা মেয়ে থাকে। ধরে নিন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া দু’বোন। কিন্তু দু’জন দু’রকম। একজন সকালে ক্লাস করতে যায়, ক্লাস শেষ হওয়া মাত্র সোজা বাড়ি ফিরে আসে দুপুরের ছায়া গড়িয়ে বিকেল হওয়ার আগেই। বিকালের প্রাকটিকাল আর মেকাপ ক্লাসগুলো প্রায়ই বাদ দিয়ে দেয় সে। পাছে বিকালটাও গড়িয়ে যায়!

আর দ্বিতীয় জন ঠিক উল্টো। ক্লাস, প্রাকটিকাল কিংবা মেকাপ ক্লাসের পরেও তার এক পৃথিবী কাজ। আইইএলটিএসের ক্লাস যেদিন থাকে না সেদিন তাকে ছুটতে হয় গ্রাফিক্স ডিজাইনিং এর কোর্সে। ক্লাস তাড়াতাড়ি শেষ হলে একটা টিউশনি বিকেলেই সেরে ফেলার চেষ্টা করে সে। ভলান্টারি ইভেন্টগুলোর কাজ থাকে কোনো কোনো দিন। কোনোদিন সব কাজের আখের গুছিয়ে একটু তাড়াতাড়ি অবসর মিলে গেলে দেখা করে আসে পুরোনো কালচারাল কিংবা সাইক্লিং ক্লাবের সবার সাথে। একটা দিনও রাত আটটা ন’টার আগে বাড়ি ফিরতে পারে না সে।

এখন যদি প্রশ্ন আসে, বেশি লক্ষী কে কিংবা কে বেশি অনুকরণীয়? নি:সন্দেহে আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষের মতামতে নিৰ্বাচিত হবে প্রথম মেয়েটি। আমরা এখনো মেয়েদের ঘরের ছোট পরিসরের বাইরে কল্পনাই করতে পারি না। আর অন্যজন? যে রাতে ফেরে? সে তো রাতে ফেরে! সে ভালো মেয়ে হয় কি করে! তাও আবার সন্ধ্যার পরে যে বাইরে থাকে, সে ভালো, অনুকরণীয় তো হতেই পারে না! নারীদের মহলে বন্দি মহিলা ভাবতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করে এই সমাজ।

আমরা খুব সহজে ভালো-মন্দের হিসাব কষে ফেলি কে সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরলো আর কে রাতে ফিরলো সেটার উপর ভিত্তি করে! আমাদের এই সঠিক-বেঠিক ঠিক করার মানদণ্ডটা কি আসলে সঠিক? সন্ধ্যার আগে ফেরা না ফেরা আর ভালো-খারাপের সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলার আগে একটু কি ভেবে দেখা যায় না, সেটা কতোটা যৌক্তিক?

“যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,
সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া,
যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,
যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গ নামিয়া,
মহা আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে,
দিক্‌-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা—
তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা”

রবীন্দ্রনাথ কোন দু:সময়ের কথা লিখেছেন তা আমি নিশ্চিত নই, তবে দু:সময়টা কেমন একটু মিলে যায় আমাদের নারীদের জীবনের সাথে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কিংবা ঘরের বাইরে বের হতে হয় এমন নারীদের পরিবার থেকে বলা হয়ে থাকে যত অঘটন (অধিকাংশ ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন বা নির্যাতন কথাটিও বলতে দ্বিধা বোধ করেন তারা) তার বেশি ভাগটাই রাতে হয়। এই যুক্তিও ফেলে দেবার মতো নয়। ছিনতাই, পকেটমার, থেকে শুরু করে যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, খুন পর্যন্ত রাতেই বেশি হচ্ছে।

আমাদের রাজধানী নারীদের জন্য এই পৃথিবীর চতুর্থ অনিরাপদ শহর বলে কথা! কিন্তু যে দেশে মানুষ পারে না আরেকজন মানুষকে নিরাপত্তা দিতে, সেদেশে সূর্য আর কতক্ষণ পাহারা দেবে এই অভাগিনীদের!
চোখে খোলা রাখলে ধুলা পড়বে এই ভয়ে আমরা নিশ্চয়ই চোখ বন্ধ করে ঘোরাঘুরি করি না। উচিত হলো ধুলা যেন না পড়তে পারে সেই ব্যবস্থা নেয়া। একইভাবে শিক্ষা, স্কিল ডেভেলপমেন্ট আর ক্যারিয়ার এর জন্য সন্ধ্যার পর নারীদের অনেকটা সময় বাইরে থাকতে হয়. আর যারা চোখে ধুলা পড়ার ভয়ে- মানে পরিবার ও সমাজের করে দেয়া নিয়ম আর কটাক্ষ উপেক্ষা করে বের হতে পারে না, তাদেরকে দৌড়ে পিছিয়ে পড়তে হয়।
চোখে ধুলা পড়াটা যেমন কোনোভাবেই চোখের জন্য কম ক্ষতিকর না, তেমনি রাতে বাইরে বের হওয়ার এই “ভয়”টাও নেহাতই অমূলক না।

শুধু আইন করে এই নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না।
শুধু আইনের বাস্তবতার মাধ্যমে এই নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না।
শুধু সকলকে সচেতন করলে এই নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না।
শুধু ছোটবেলা থেকে শিশুর সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া বদলে ফেললে এই নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না।
শুধু আমি বদলে গেলে এই নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না।
শুধু আপনি বদলে গেলে এই নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না।
শুধু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন হলে এই নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না।
নির্যাতন বন্ধ করতে হলে সবগুলো পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে নিতে হবে।তবেই তো দিনে-রাতে নিশ্চিন্তে নারীদের পদচারণা বাড়বে!

সারাদিন আর সারারাতের পৃথিবীটাকে নিজের বলে বিশ্বাসটা অন্তত করতে পারুক নারীরা। রঙিন পৃথিবীটার রঙিন আলো শুধু দিনে নয়, দিন শেষেও নারীদের ভালো থাকার বার্তা বয়ে আনুক। দিনশেষে সূর্য অস্ত যাবে, স্বপ্ন কেন?

লেখক: জেন্ডার ট্রেইনার
প্রাক্তন শিক্ষার্থী,
উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ১৪৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.