নারীবাদ , সাম্য , স্বাধীনতা

প্রবীর দাস:

“নারী সমাজ”, “পুরুষ জাতি”, “বিচ্ছিন্ন নারী সমাজ” বা “সমগ্র পুরুষ জাতি” শব্দগুলি কিন্তু আরোপিত… খেয়াল করবেন নারী ও পুরুষের মধ্যে প্রচ্ছন্ন বিবাদ সৃষ্টি করার এই সমস্ত শব্দভাণ্ডার প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলোই আনয়ন করেছে এবং ধর্মীয় মৌলবাদের সার ও জল দেওয়ার নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়ায় এর কলেবর বৃদ্ধি হয়েছে। ধর্মের সাথে পুরুষতন্ত্রের সম্পৃক্ততা সভ্যতার আদিকাল থেকে চলে আসছে। ধর্ম ও পুরুষতন্ত্র একে অপরকে লালন করে। যদি নির্মোহ দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করি; দেখি যে সমস্ত জাতিসমূহে বা যে সব দেশে ধর্মের বাঁধন আলগা হয়ে আসে, সেখানে পুরুষতন্ত্র নারী অবদমনের জায়গাটা দখল করার চেষ্টা করে। ধর্মীয় শিথিলতা যেখানেই জনগণ অর্জন করে, সেখানে পুরুষতন্ত্র তার বিক্রমকে ভিন্ন ভিন্ন রুপে প্রকাশ করে।

বলার উদ্দেশ্য, উৎপাদনের উপকরণ, উৎপাদিকা শক্তি, পুঁজি ও শ্রমের সম্পর্ক দিয়ে শ্রেণিবৈষম্য যেমন বাস্তব, তেমনই লিঙ্গ-বৈষম্যের বাস্তবতা সমগ্র মানব প্রজাতির সভ্যতার ইতিহাস জুড়ে রয়েছে। লিঙ্গ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইতে পুরুষের চেয়ে অনেক বেশী মুখোমুখি হয়েছে নারী দু’মুখো শত্রু ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রের কাছে যা কিনা বাস্তবে একে অপরের পরিপূরক।

কিছু পার্থক্যও আছে; যেমন ধর্মীয় আচার-আচরণ, নিয়ম, অনুশাসন ইত্যাদি প্রকাশ্য দেখা যায়, ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব ও অনুশীলন করা হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলি স্ব স্ব ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে প্রভাবিত করে। কিন্তু পুরুষতন্ত্রকে আমরা চাক্ষুষ দেখি না, এ হলো এক অদৃশ্য শক্তি, যার নিবাস আমাদের মননে ও চেতনার অভ্যন্তরে। সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমরা পুরুষতান্ত্রিক চেতনা বহন করি এই রাষ্ট্র ব্যবস্থায়।

ধনতন্ত্র ও পুরুষতন্ত্রের পারস্পরিক জটিল রসায়ন নারীর প্রতি বৈষম্যের আকর…এই প্রক্রিয়া দৈনন্দিন জীবনে আমাদের মননে চাষ করি, বিভিন্ন প্রেক্ষিতে তার প্রয়োগ করি। এইভাবেই আমরা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র দ্বারা প্রোগ্রামড হয়েছি এবং হয়ে চলেছি, সেভাবেই সাংস্কৃতিক নির্মাণ হয়েছে আমাদের মননের।

এখন এই প্রোগ্রামগুলো মগজ থেকে মোছা বা ডিলিট করার এবং বিনির্মাণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া সবেমাত্র শুরু হয়েছে, তাই পথটাও দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই শেষ হবে কোনো এক সময়ে। এটা নির্ভর করবে আমরা অর্থাৎ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমগ্র মানব প্রজাতি কতটা নিজেদের মগজের প্রতি মনোযোগ দিই ও যত্ন সহকারে আমাদের ভিতরে ও বাইরে সামগ্রিক অনুশীলনের মধ্যে থাকি। এই সমগ্রতার সাংস্কৃতিক অনুশীলনকে সমাজ-ব্যবস্থা পরিবর্তনের আবশ্যিক অনুষঙ্গ বা বিপ্লবের সহায়ক অঙ্গ হিসেবেই মনে করি।

সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রকে অস্বীকার করে সঠিক অনুধাবন না করলে, অধুনা বিশ্বে শ্রেণি-চেতনা, শ্রেণি-সংগ্রাম ও শ্রেণি-মুক্ত সমাজের কথা ভাবনা চিন্তা করা বাতুলতা হবে। নারী-শিক্ষা, নারী-স্বাধীনতার প্রকরণগুলো পুরুষ ঠিক করে দেবে, বা নারী পুরুষ যৌথভাবে সংগ্রাম করবে ইত্যাদি ভাবনাগুলোর ঊর্ধ্বে না উঠলে নারী-পুরুষ উভয়েই চক্রাকারে একই আবর্তে পাক খাবে; কারণ পুরুষতন্ত্রের নির্দেশিকায় নারী-পুরুষ একই সাথে কাধে কাঁধ মিলিয়ে চলবে কথাগুলি নারীর কাছে প্রপঞ্চময় ছাড়া আর কিছু নয়, কারণ সেটা হয় পুরুষের চেতনার আশ্রয়ে। অর্থাৎ মূল নিষ্কর্ষ , নারীর সাম্যবোধটাও আমরা, অর্থাৎ পুরুষরা স্থির করে দিচ্ছি না তো?

আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তির যুগে, যোগাযোগের মাধ্যমে ছোট হয়ে যাওয়া বিশ্বে শিক্ষিত নারী নিজের অধিকার নিজের চেতনায় নিজ কর্মকাণ্ডে ঋদ্ধ হচ্ছে, পুরুষের মুখাপেক্ষী না হয়েই। মৌলিক ভাবনায় জারিত নারী, পুরুষতন্ত্রকে আঘাত করার ক্ষমতা অর্জন করছে; এতে পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণায় সামান্য হলেও একটু টাল খাচ্ছে, এটা খানিকটা দৃশ্যমান… তাই পুরুষতন্ত্র এটাকে নারী-পুরুষের দ্বন্দ্ব নামে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করছে একদিকে, অন্যদিকে কেউ কেউ আবার শ্রেণি-দ্বন্দ্বকে হীন বা নেতি করে দেওয়ার চক্রান্ত হচ্ছে বলে দাগিয়ে দিয়ে হৈ হৈ করছে।

প্রয়াত কবি মল্লিকা সেনগুপ্তর একটা কবিতা “আপনি বলুন, মার্কস” বড়ই প্রাসঙ্গিক।

ছড়া যে বানিয়েছিল, কাঁথা বুনেছিল
দ্রাবিড় যে মেয়ে এসে গম বোনা শুরু করেছিল
আর্যপুরুষের ক্ষেতে, যে লালন করেছিল শিশু
সে যদি শ্রমিক নয়, শ্রম কাকে বলে?

আপনি বলুন মার্কস, কে শ্রমিক,
কে শ্রমিক নয়
নতুনযন্ত্রের যারা মাস মাইনের কারিগর
শুধু তারা শ্রম করে!
শিল্পযুগ যাকে বস্তি উপহার দিল
সেই শ্রমিকগৃহিণী
প্রতিদিন জল তোলে, ঘর মোছে, খাবার বানায়
হাড়ভাঙ্গা খাটুনির শেষে রাত হলে
ছেলেকে পিট্টি দিয়ে বসে বসে কাঁদে
সেও কি শ্রমিক নয়!

আপনি বলুন মার্কস, শ্রম কাকে বলে!
গৃহশ্রমে মজুরী হয় না বলে মেয়েগুলি শুধু
ঘরে বসে বিপ্লবীর ভাত রেঁধে দেবে
আর কমরেড শুধু যার
হাতে কাস্তে হাতুড়ি!
আপনাকে মানায় না এই অবিচার
কখনো বিপ্লব হলে
পৃথিবীর স্বর্গরাজ্য হবে
শ্রেণীহীন রাষ্ট্রহীন আলোপৃথিবীর সেই দেশে
আপনি বলুন মার্কস,
মেয়েরা কি বিপ্লবের সেবাদাসী হবে?

‘নারীবাদ’ শব্দটা হলো সাম্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে একধরনের র‍েডিক্যাল বা উগ্র বহিঃপ্রকাশ। পুরুষতন্ত্রের অস্ত্বিত্বকে স্বীকার করলে নারীবাদকে তেঁতো মনে হলেও গিলতে হবে। পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সাময়িক অস্ত্র নারীবাদ, তাই সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই পুরুষতন্ত্রের অবসানের সাথে সাথেই নারীবাদেরও অবসান হবে।

শেয়ার করুন:
  • 182
  •  
  •  
  •  
  •  
    182
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.