জাতিসংঘ মহাসচিব সমীপে

0

হ্যাপী চাকমা:

সমীপেষু জাতিসংঘ মহাসচিব,
আমার শ্রদ্ধা জানবেন। রোহিঙ্গাভাইদের এই দুর্দিনে আপনার হস্তক্ষেপে আমি কৃতজ্ঞ! তারপরও আমার কিছু আর্জি, আপনার সমীপে।

আজ উনারা যে অবস্থা অতিক্রম করেছেন, এরকম অবস্থা আমিও অতিক্রম করেছি কয়েক বছর আগে, যা আপনি অবগত। এই মুহূর্তে পুরো বিশ্বের নজর রোহিঙ্গা ভাইয়ের দিকে, তাদের খাওয়া পরার জন্য বিমান, হেলিকপ্টার উড়ছে, ট্রাকের পর ট্রাক দৌড়াচ্ছে। মুসলমান ভাইগণ তো জান-প্রাণ দিচ্ছেনই, সাথে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষও কিছু না কিছু আওয়াজ দিচ্ছেন।

কিন্তু, অতি নির্মম সত্য যে, এই আওয়াজ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসবে, কেউ ক্লান্ত হবেন, কেউ ভুলে যাবেন। শুধুমাত্র কিছু সুবিধাবাদীর আওয়াজ বাকি থাকবে। কিন্তু রোহিঙ্গা ভাইদের এই দুর্দশা দূর হতে বহুসময় অতিবাহিত করতে হবে, এটা নিশ্চিত। ততোদিন অব্দি একজন শিশুর মৌলিক অধিকার শিক্ষা, তার কথা কি কেউ ভেবেছেন?

আমিও একজন সাবেক শরণার্থী, ১৯৮৩ সালে আমার বয়স ছিলো ১২। সবে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। “লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে”, দিদিমার মুখ নিঃসৃত এই বাণী শুনে শুনে আমার লক্ষ্য ছিলো বিমানের পাইলট হওয়া। রঙিন স্বপ্ন নিয়ে নতুন বই ছুঁতে না ছুঁতেই শুরু হলো ছুটোছুটি। মার্চের কোনো এক শীতের রাতে, বাবার পিছনে পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে নদী, পাহাড়, জঙ্গল ডিঙিয়ে কোনো এক অন্ধকার রাতে পৌঁছালাম অচেনা এক জায়গায়।

পরে জানলাম সেই জায়গার নাম ভারত, আমার নাম শরণার্থী। আমার আবাস তাম্বুল খাটানো শিবিরে। আমি আর বৃত্তির টাকা চোখে দেখিনি। ধীরে ধীরে নতুন জায়গা চিনলাম, চিনলাম স্কুলগুলো। বড়ই ইচ্ছে হতো বই-খাতা বগলদাবা করে স্কুলে যেতে। বেশ কিছুদিন পর ওখানকার শিক্ষকদের সহযোগিতায় যাওয়াও শুরু করলাম। নতুন ভাষা হিন্দি, ইংরেজি-বাংলাও শিখলাম সাথে। স্কুল থেকে ফিরে ক্ষেতের কাজ, মা-বাবা দিনমজুরি করে ফিরতেন, আমি রান্না করে রাখতাম। অথচ, বাংলাদেশে আমাদের বাড়িটা ছিলো চৌচালা টিনের, গোয়ালঘরে গরু কয়টা ছিলো মনে পড়ে না, ধান রাখার ঘরটা ছিলো আলাদা, ওটা পাহারা দিতো ‘রাম্যেদা’। ওখানে যাওয়ার পর বাবা আর রাম্যেদা দুজনেই দিনমজুর। রাম্যেদা আর বাবাকে ‘কাকা’ ডাকতো না, ওরা তখন একই কাতারে, ডাকতো ‘বন’, মানে বন্ধু।

যাক, তারপরও পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করেছিলাম, বছরের পর বছর ঘুরে, আমরা তাম্বুল থেকে বেরিয়ে লম্বা লম্বা ঘরে বসবাস শুরু করলাম। দেশ থেকে এটা ওটা খবর যেতো, উন্মুখ হয়ে শুনতাম আর ভাবতাম, নিজ দেশে ফিরলেই আমার বৃত্তির টাকা পাবো, আবার স্কুলে যাবো। অতঃপর অষ্টম শ্রেণিতে থার্ড হয়ে নবমে উত্তীর্ণ হই। তখন সবাই বলাবলি করতে লাগলো, পড়ে কী হবে, এই সার্টিফিকেটের কোনো মূল্য নেই, না এদেশে, না ওদেশে।

কারণ এখানে আমরা শরণার্থী, আর ওখানে স্টুডেন্ট ভিসা ছাড়া সার্টিফিকেটের কোনো মূল্য নেই। এমন অস্থিতিশীল পরিবেশে আমার বইয়ের প্রতি টান ধরে রাখা দুর্বিষহ হয়ে উঠলো। দেশে ফেরার খবর ঘন ঘন গেলেও আমাদের ফেরা হয়ে উঠতো না। তবুও নবমে ভর্তি হই, কিন্তু জীবন-জীবিকার ওই দুর্দশায় অনিশ্চিত সার্টিফিকেট জন্য পড়ালেখা পরিবার পরিজনের কাছে আদিখ্যেতা বলে মনে হলো। এমতাবস্থায় আমি আর পড়ালেখা জিইয়ে রাখতে পারিনি। মরে গেছে সেই বালিকার স্বপ্ন, “লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে”, আমি তো বিমানের পাইলট হতে চেয়েছিলাম।

চৌদ্দ বছর পর দেশে ফিরি, আমার হাতে তুলে দেওয়া হয়, পঞ্চাশ হাজার টাকা, আর কিছু শর্ত– যা এখনও বাস্তবায়নের খবর নেই। আমার ভিটায় এখন বসবাস করে অন্য কেউ। আমি কাপড় বুনে বিক্রি করি, থাকি ভাড়া বাসায়। আমার বৃত্তির টাকা আর চোখে দেখিনি। শুনেছি, কে যেনো তুলে হজম করে ফেলেছেন।

আজ ছোট ছোট রোহিঙ্গা শিশুদের দেখে সেদিনের বৃত্তিপ্রাপ্ত শিশু কান্নায় গোঙিয়ে উঠলো। তাদের জন্য কিছু করুন, তাদের জীবনের স্বপ্নগুলো যেনো ফিকে হয়ে না যায়। একটি জাতি টিকে থাকে তার শিক্ষায়। ভাত-কাপড়ে জান বাঁচে, মান বাঁচাতে হলে, জাতি বাঁচাতে হলে এই শিশুগুলোর শিক্ষার বিকল্প নেই এটা আপনিও জানেন। সেই লক্ষ্যে শরণার্থীদের শিক্ষা এবং শিক্ষাসনদের মূল্যায়ন যেনো নিশ্চিত হয়, সেদিকে একটু সুনজর রাখবেন এই আশা বুকে রেখে আপনার স্মরণাপন্ন হলাম।
পরিশেষে আমার সশ্রদ্ধ নমস্কার রইলো।

ইতি
সাবেক শরণার্থী

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.4K
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.4K
    Shares

লেখাটি ১,৯৬৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.