বাচ্চাদের মোবাইল ফোন আসক্তি ও মা-বাবার অস্বস্তি

0

মোহছেনা ঝর্ণা:

মেয়ে সারাক্ষণ মোবাইল দেখে। বাবারটা দেখে। বাবারটার চার্জ শেষ হলে মায়েরটা দেখে। মায়েরটার চার্জ শেষ হলে অপেক্ষা করে কখন আবার ফুল চার্জ দেয়া হবে। বাবা- মায়ের অফিস টাইমে নানার মোবাইল দেখে। নানারটার চার্জ শেষ হলে নানুরটা দেখে। ইউটিউব এ কিডস ভিডিও দেখে। টম এন্ড জেরি দেখে। মীনা দেখে। এখন স্পাইডারম্যান দেখে। দেখার কোনো শেষ নাই।
ইউটিউব নিজে চালাতে পারে। মাঝে মাঝে কালারস নেম, এ বি সি ডি, রাইমসহ বিভিন্ন খেলনার ভিডিও দেখে। যখন মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকে এত নিবিষ্ট চিত্তে, এত মনোযোগ সহকারে দেখে যে আশেপাশে কোনো শব্দ হলেও তাকায় না। ডাকলেও রেসপন্স করে না। চোখ ঢুলুঢুলু করে, ঘুমে চোখ ছোট হয়ে আসে তারপরও মোবাইল হাতছাড়া করে না।
এগুলা আমার মেয়ের কথা। কিন্তু আমি জানি এগুলা শুধু আমার মেয়ের কথা নয়। এগুলা এখনকার ছোট ছোট সব বাচ্চাদের কথা।

বাচ্চাদের মোবাইল আসক্তি নিয়ে আমরা চিন্তিত। বিরক্ত। কিন্তু এই চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমরা করছিটা কি! বাচ্চাদের একটা খেলার মাঠ দিতে পারি না। তারা সমবয়সী বাচ্চাদের সঙ্গে মিশতে পারে না। সবাই সবার বাচ্চার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে বাচ্চাদের আগলে রাখছি বলয়ের মধ্যে।

একটা সাইকেল চালাবে, অথচ চালানোর জায়গা নেই। ঘরগুলোও বাণিজ্যিকীকরণের ঠেলায় ছোট হতে হতে কবুতরের খুপড়ি হয়ে গেছে। বাগান করবে, গাছ লাগাবে, কিন্তু কোথায়? বারান্দায় কাপড় শুকানো, পরিত্যক্ত জিনিসপত্রের অলিখিত গোডাউন, রোদ নাই, পাশের বাড়ির ছায়ায় অন্ধকার হয়ে থাকা বারান্দাটা নিজেই পরিত্যক্ত হয়ে থাকে।

রাস্তায় হাঁটতে নিবেন? ফুটপাত নাই। যেগুলো আছে সেগুলো হকারদের দখলে। রাস্তার কিনার ঘেঁষে হাঁটবেন, তারপর কানের পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে ছুটে যাবে দুরন্ত গাড়ি। হর্নের শব্দে মাথা ব্যথা হয়ে যাবে, বুক ধড়ফড় করবে। রাস্তায় হাঁটার বাসনা মিটে যাবে।

বেড়াতে যাবেন? শিশুপার্ক? ফয়েস লেক, ডিসি হিল, অভয় মিত্র ঘাট? সেখানেও বুড়াদের ভিড়ে বাচ্চাদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। আর যেগুলো একটু পরিষ্কার – পরিচ্ছন্ন সেগুলোর টিকেট মূল্য আগুন। মাসে একবারের বেশি দু’ বার যাওয়ার প্ল্যান করা সাধারণ মধ্যবিত্তদের জন্য দিবাস্বপ্ন।

স্কুলে যাবে বাচ্চারা। সেখানে সমবয়সী অনেক সঙ্গী পাবে। হু, ইদানিং অভিভাবকদের দেখি খুব অল্প বয়সে বাচ্চাদের স্কুল পাঠানোর কথা বলতে শুধুমাত্র বাচ্চাদের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য। কিন্তু স্কুলেও কি স্বস্তি আছে? অপ্রয়োজনীয় বইয়ে ঠাসা ভারি ব্যাগ কাঁধে কতটুকু আনন্দ পাচ্ছে তারা?

আমার শৈশব স্মৃতিতে আমি দেখি ক্লাস ওয়ান এবং টুতে আমাদের ছিল দুটা বই। বাংলা আর অংক বই। শিশু শ্রেণি বলে একটা ক্লাস ছিল। সেখানে আমি পড়িনি। ক্লাস থ্রিতে উঠার পর নিজেকে অনেক বড় মনে হচ্ছিল। কারণ এক লাফে বইয়ের সংখ্যা পৌঁছেছে ছয়ে। ছয়টা নতুন বই হাতে পেয়ে সে কী আনন্দ আমাদের! আর এখন নার্সারিতে পড়ুয়া বাচ্চাদের বইয়ের সংখ্যাই নাকি সাত- আটটা। তার উপর খাতাও থাকে অনেকগুলা। সি ডব্লিউ ( ক্লাস ওয়ার্ক) খাতা, এইচ ডব্লিউ (হোম ওয়ার্ক) খাতা। আহারে ছোট পাখিরা!

আমরা বন্ধু- বান্ধবীরা যখনই আড্ডায় বসি বাচ্চাদের প্রসংগ এলে সবারই দুইটা কমন সমস্যা থাকে ফ্যাক্টর এর অংকের মতো। একটা হলো বাচ্চা খেতে চায় না, বাচ্চারে খাওয়ানো নিয়ে রীতিমতো নাভিশ্বাস উঠে। আরেকটা হলো বাচ্চার মোবাইল আসক্তি।

তখন ভাবি একটা- দুটা বাচ্চা পালতে গিয়ে আমরা এত হিমশিম খাচ্ছি, আমাদের মায়েরা কিভাবে চার- পাঁচটা বাচ্চা সামলেছে একা হাতে। শ্বশুর- শাশুড়ির সেবা- যত্নও করেছে, ঘরকন্নাও সামলেছে, আবার বাচ্চাদেরও মানুষ করেছে। মায়ের জবাব হলো, প্রথম বাচ্চা, বাচ্চার দাদা- দাদিই সামলেছে, আর ছোটগুলো ভাই-বোনদের সাথে খেলতে খেলতেই একসময় বড় হয়ে গেছে। যৌথ পরিবার ছিল। কিছুক্ষণ দাদা দেখেছে, কিছুক্ষণ দাদি দেখেছে, চাচা- চাচি, ফুফু, খালা, মামীরা তো আছেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো বাচ্চারা কখনো একা থাকেনি, নিঃসংগতায় ভোগেনি। এখন তো ছোট পরিবার আর একক পরিবার করতে গিয়ে বাচ্চাদের একা আর অসহায় করে ফেলছে সবাই।

মনটা খারাপ হয়ে আসে। আসলেই তো ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর শৈশব তো আমরাই হাতে ধরে মাটি করছি।আমরা যদি তাদের উপযুক্ত খেলার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারতাম, আপনজনদের সান্নিধ্য নিশ্চিত করতে পারতাম, তারা যদি দৌড়ঝাঁপ করতে পারত আমি নিশ্চিত তাদের খাওয়ার সমস্যা কমে আসত। মোবাইলেও তারা আসক্ত হতো না। যন্ত্রের কি সাধ্য মানুষের সাথে পাল্লা দেয়ার????

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

লেখাটি ১,৭৮৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.