আর কতো অনিশ্চয়তায় জীবনযাপন!

রুনা নাছরীন:

মৃত্যু চিরন্তন সত্য এবং তাই স্বাভাবিক মৃত্যু সবার কাম্য। যেখানে আমরা আপনজনদের স্বাভাবিক মৃত্যু মেনে নিতে পারি না, সেখানে জলজ্যান্ত একটা মানুষ হঠাৎ উধাও হয়ে যাবে, গুম হয়ে যাবে, তা মেনে নেয়া পরিবারের পক্ষে কতটা কষ্টকর, তা ভুক্তভোগী ছাড়া বোঝার কথা না। বিষয়টা চিন্তা করতে গেলেই মাথা ঝিম ঝিম করছে।

ইদানিং এ ধরনের খবরগুলো ইচ্ছে করেই এড়িয়ে চলি। পারি না সহ্য করতে, অসুস্থ হয়ে পড়ি। উঠতে বসতে একই কথা ঘুরপাক খায় চিন্তা চেতনায়। আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত যে হাজার রকমের অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে চলেছে এবং সেগুলোর কমবেশী প্রভাবে মানসিকভাবে সুস্থ থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যে প্রাণহানি ঘটে, তাতে সান্ত্বনার একটা বিষয় কাজ করে অবচেতন মনে; কিন্তু যেগুলো মানুষ ঘটায় তার সঠিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া এবং তা মেনে নেয়া ভীষণ কষ্টকর।

সাংবাদিক সাগর ও রুনি হত্যার পর ওদের ছেলেটার কথা ভেবে কতদিন যে স্বাভাবিক হতে পারিনি। এখনো বাচ্চাটার অসহায় ও ভয়ার্ত দৃষ্টির কথা মনে হলে অস্থির লাগে। ছেলেটা বাবা-মায়ের উষ্ণ আলিঙ্গন আর কোনদিন পাবে না, ভাবতেই কেমন যেনো অসহায় লাগে। ইদানীং একটার পর একটা ঘটনা ঘটেই চলেছে এবং দেখে শুনে মনে হয়, এসব ব্যাপারে কারো যেন কোন দায় নেই। ঘটছে যেন ঘটার নিয়মে। কিছুদিন হৈ চৈ লেখালেখি, তারপর কোথায় যেন হারিয়ে যায়, ধামাচাপা পড়ে বা নয়তো চলতে থাকে ঢিমেতালে বিচারকার্য বা বিচারের নামে প্রহসন।

পরপর দুইটা নিখোঁজ হবার ঘটনা, যেমন, ১০ই অক্টোবর থেকে অনলাইন নিউজ পোর্টাল পূর্বপশ্চিম বিডি ডট কম এর সাংবাদিক উৎপল দাস এবং ৭ই নভেম্বর থেকে নর্থ সাউথ ভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক মোবাশ্বের হাসান সিজারের নিখোঁজ হওয়া, সত্যিই উদ্বেগজনক। এতদিন হয়ে গেলো কিন্তু দুইটা ঘটনার একটারও কোন হদিস এখন পর্যন্ত কেউ দিতে পারছে না। তাদের অবর্তমানে পরিবারে যে শূন্যতা এবং যে ক্ষতি তা কখনও পূরণ হবার না। আসলে ঘটনা যাদের সাথে ঘটে তারাই বুঝে সময়ের যাতনা।

প্রিয় সন্তানকে খুঁজে পেতে সংবাদ সম্মেলনে মা-বাবা ভাই-বোনের যে আহাজারির ছবি দেখেছি তাতেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। পরিবারের সবার কথা ভেবে ভীষণ খারাপ লাগছে। কিভাবে মেনে নিবে তারা? আপনজনদের কাছে এখন প্রতিটি ক্ষন হাজার বছরের সমান। অনির্দিষ্ট কালের জন্য প্রতীক্ষা এবং একটি পরিবারের সবার স্বাভাবিক জীবনের ছন্দপতন।

৩১ শে অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে যে প্রতিবাদ সমাবেশ হলো, তাতে সবাই উৎপল দাসের সন্ধান চেয়ে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাল দেওয়াকে কেন যেন সহজভাবে নিতে পারি না এখন। আগে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাগুলোর কথা মনে পড়ে যায়, যেগুলোর জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিলো এবং যার কোনো পরিসমাপ্তি হয়নি এখন পর্যন্ত। তাই এই ৪৮ ঘণ্টা শুনলেই মনে হয় কোথায় যেন একটা ঘাপলা আছে, নাটক শুরু হয়ে গেলো, যার কোনো শেষ নাই। কাহিনী এগিয়ে যাবে এ গলি সে গলি এবং তা চলতেই থাকবে….চলতেই থাকবে। ৪৮ ঘণ্টা যে কতবার শেষ হবে তার ঠিক ঠিকানা নাই। আমরা যার যার মতো আমাদের স্বাভাবিক জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়বো, আর আপনজনরা প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে থাকবে।

অধ্যাপক সিজারের প্রাক্তন স্ত্রীর আবেগময় খোলা চিঠিটি পড়ে ভীষণ খারাপ লেগেছে। তাদের ছোট মেয়েটার কথা ভেবে ভীষণ কান্না পাচ্ছে। এত অল্প বয়সে তাকে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অনেক বাস্তব ও বৈরি পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হলো এবং হতে হবে। বাবা মেয়ের সম্পর্কের খুনশুটি এবং মানঅভিমান জীবনের চিরন্তন ও চিরসুন্দর একটা অধ্যায়।

উনার লেখায় বাবা মেয়ের সেই সম্পর্কের বিষয়টা স্পষ্ট। মেয়ে বলেই হয়তো অতি সহজেই বাবার জন্য বাচ্চা মেয়েটার কষ্টের জায়গাটা উপলব্ধি করতে পারছি। নিজেকে ঐ জায়গায় বসিয়ে ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা করা, আর অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা করার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। মেয়েটা বাবার জন্য অনির্দিষ্টকালের জন্য অপেক্ষা করবে, তা ভাবতে চাই না। আমাদের সবার প্রার্থনা থাকবে মেয়েটার বাবা মেয়েটার কাছে ফিরে আসুক। বাবার সাথে আনন্দে মেতে উঠুক। সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠুক। খুব কি বেশি চাওয়া?

আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করি যেখানে হাজার রকমের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় সময় কাটাতে হয় আমাদের। কখন যে কে কী ধরনের বিপদে জড়িয়ে যাবে বলা মুশকিল। ঘরে বাইরে সবখানেই অস্থিরতা, কোথাও স্বস্তি নাই। আমরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করি একটু ভালো থাকার জন্য, কিন্তু কোনখানেই আমাদের জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নাই। সবক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে ভুগতে দিন দিন মানুষের চিন্তা চেতনা জটিল থেকে জটিলতর হয়ে যাচ্ছে। আশেপাশের বিভিন্ন ঘটনার অভিজ্ঞতায় স্বাভাবিক বিষয়গুলোকে আর স্বাভাবিকভাবে দেখতে পাচ্ছি না। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না, সবাই সবসময় একটা ভয় ও সন্দেহ নিয়ে চলছি। এইভাবে কি সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপনের আশা করা যায়?

শেয়ার করুন:
  • 107
  •  
  •  
  •  
  •  
    107
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.