কেমন আছেন অভিবাসী নারী শ্রমিকেরা?

0

রোমেলা, আয়শা, সুরমা, হাফিজাসহ হাজার হাজার, লাখ লাখ নারী শ্রমিক বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে একটুখানি ভালো থাকার আশায়। তাদের প্রায় সবার গল্প এক, সংসারের সুখ চায় তারা। স্বামী কাজ করতে পারে না, অসুস্থ, ছেলেমেয়ের মুখে খাবার দিতে পারে না, পড়ালেখা দূর অস্ত। সেই জীবনটাতে পরিবর্তন আনতে, একটুখানি ভালো থাকার আশায় তারা যাত্রা করে অনিশ্চিত গন্তব্যে। যেখানে পৌঁছানোর পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে। নিদারুণ কষ্ট তাদের নি:শেষ করে দিচ্ছে। একমুঠো ভাত তাদের কাছে সোনার হরিণ হয়ে উঠে।

সরকারি মাধ্যমে যেমন যাচ্ছে, তেমনি যাচ্ছে দালাল, ফড়িয়া বা প্রতারকদের হাত ধরেও। প্রশিক্ষণের কথা বলা হলেও অজ: পাড়াগাঁয়ের এই নারীরা না পাচ্ছে সুষ্ঠু প্রশিক্ষণ। লেখাপড়া না জানা এই মানুষগুলো, যারা এইদেশের ভিতরেই ভালোভাবে থাকতে পারে না, তারা এমন জায়গায় গিয়ে পড়ছে, যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি সবকিছুই তার বিরুদ্ধে চলে যায়। তার উপর ‘নারী’ পরিচয় তাকে আরও ভালনারেবল করে তুলছে।

‘কিছুসংখ্যক’ ভালো থাকছে, কারণ তাদের ভাগ্য সত্যিকার অর্থেই হয়তো ভালো, তারা ভালো মাধ্যম হয়ে বিদেশে গেছেন, ভালো জায়গায় কাজ করছেন। কিন্তু যারা অন্যের কথায়, আশ্বাসে, প্ররোচনায় পড়ে যাচ্ছেন, তাদের গল্পগুলোর বেশিরভাগই রয়ে যাচ্ছে অশ্রুত। সেই ভাগ্যাহতদের নি:শেষ হয়ে যাবার গল্প, মরে যাওয়ার গল্প, নির্যাতন-ধর্ষণের শিকার হওয়ার গল্পগুলোর খুব সামান্য কিছুই আমাদের কান পর্যন্ত আসে। আমরা তখন কিছুদিন সোচ্চার থাকি, প্রতিবাদ করি, হা-হুতাশ করি অক্ষমতায়, তারপর আবার যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। ভুলে যাই এই অমানবিকতাকে, বা পাশ কাটিয়ে যাই বলাই ভালো।

প্রচুর সংখ্যক দুর্নীতিবাজ, প্রতারক গোষ্ঠী এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। মাঝে মাঝে এসব অনিয়ম-দুর্নীতি বা নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার আশ্বাসও দেন কর্তৃপক্ষ, নড়ে-চড়ে বসতে বাধ্য হয় সংশ্লিষ্ট মহল, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার কতোটা বাস্তবায়ন হয়, তা বলাই বাহুল্য। অথচ এই নি:স্ব হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পাঠানো টাকা দিয়ে আমরা ঠাঁট বজায় রেখে মাথা উঁচু করে চলাফেরা করি, যখন মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের, কোনো এক গৃহকোণে বন্দী আমারই বোন, আমারই মা, আমারই মেয়ে ভিতর থেকে মরে যেতে থাকে দিনের পর দিন।

কিন্তু আমরা এবার সিরিয়াস অর্থেই শুনতে চাই এসব নারী শ্রমিকের কথা, শুনতে চাই তাদের নির্মম, ধূসর জীবনের গল্পের পিছনের গল্পগুলো, সেইসাথে মিলিয়ে নিতে চাই দীর্ঘদিন ধরে এসব শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি বা সংগঠনগুলোর অভিজ্ঞতা, আর শেষপর্যন্ত উপনীত হতে চাই এমন একটি সিদ্ধান্তে, যা সরকার থেকে শুরু করে কর্মরত সংগঠনগুলো, বা প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা হলেও মানবিক করতে বাধ্য করবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভবিষ্যতে এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে কাজ করতে সহায়তা করবে এই সিদ্ধান্ত বা মতামত। মোট কথা, আমরা এই পাশবিক নির্যাতন থেকে রেহাই দিতে চাই নারী শ্রমিক নামের সমাজের অবহেলিত ‘ঊন-মানুষ’গুলোকে।

আর এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যেই বাংলাদেশে এবারই প্রথমবারের মতো একটি গণশুনানীর আয়োজন করা হচ্ছে, যেখানে ফেরত আসা অভিবাসী নারী শ্রমিকরা বলবেন তাদের অভিজ্ঞতার কথা। পরবর্তীতে দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসন নিয়ে কর্মরত কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ ‘বিচারকবৃন্দ’ তাদের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেবেন।

আগামী ১৮ নভেম্বর শনিবার বেলা আড়াইটায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এই গণশুনানীর আয়োজন করা হচ্ছে। চলবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত।

অনুষ্ঠানটির আয়োজক ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং (উদ্যমে উত্তরণে শতকোটি) বাংলাদেশ, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে বিশ্বব্যাপী একটি আন্দোলনের নাম। ২০১৩ সালে এর যাত্রা শুরুর পর থেকে বিশ্বের ২০০টি দেশ এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় আগামী শনিবারের এই আয়োজন।

যে বা যারাই এসব নারী শ্রমিকদের বঞ্চনা, নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার, যারা চান এই সমস্যার একটা সমাধান বেরিয়ে আসুক, মুক্তি পাক নিপীড়িত এই জনগোষ্ঠী, এই অনুষ্ঠানে আপনাদের উপস্থিতি একান্তভাবে কাম্য।

(লেখাটি ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং বাংলাদেশ এর সৌজন্যে)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 68
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    71
    Shares

লেখাটি ২২৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.