প্রতিভা এবং শিল্পচর্চা যখন যৌন সন্ত্রাসের ছাড়পত্র

0

সুমু হক:

সাম্প্রতিক সময়ে প্রথমে হলিউড এবং তারপর সমস্ত পৃথিবীজুড়ে খ্যাতিমান (এবং তার মানে অবশ্যই ক্ষমতাবান) সেলিব্রেটিদের যৌন সন্ত্রাস বিষয়ে সচেতনতা এবং আলোচনার একটি ট্রেন্ড লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই নিউ ইউর্ক টাইমস একটি চমৎকার লেখা নিয়ে এসেছে, যার বিষয় হলো শুধুমাত্র প্রতিভাবান এবং শিল্পস্রষ্টা হিসেবে খ্যাতিমান বলেই কেমন অসংখ্য যৌনসন্ত্রাসের ঘটনায় অভিযুক্ত বিখ্যাত ব্যক্তিরা পার পেয়ে যান। যেন তাদের প্রতিভা তাদের জঘন্যতম অপরাধের অভিযোগগুলোকে খারিজ করে দেবার জন্যে যথেষ্ট।

পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং আইনের একুশে আইনের বদৌলতে এমনিতেই সমস্ত পৃথিবীজুড়ে যৌনসন্ত্রাসের শিকার নারীদের পক্ষে সেই অভিযোগ নিয়ে সামনে আসার ক্ষেত্রে অসংখ্য প্রতিবন্ধকতা থাকে, যার ফলে অত্যন্ত সাহসী না হলে একজন নারীর পক্ষে বিচার চাইতে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। পৃথিবীর যেকোনো দেশে ঘটে চলা যৌন সন্ত্রাসের ঘটনার সংখ্যার সাথে পুলিশ কিংবা মিডিয়ায় প্রকাশিত এমন ঘটনার সংখ্যার অসামঞ্জস্যতা নি:সন্দেহে এই প্রতিবন্ধকতার প্রতিফলন।

আর তার ওপর যদি অপরাধী একজন খ্যাতিমান ব্যক্তি হয়ে থাকে, আইন এবং মিডিয়া তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধীর পক্ষ নেয় এবং অবধারিতভাবেই ভিকটিমের চরিত্রহননে নেমে পড়ে। যৌন সন্ত্রাসের শিকার হওয়া নারীটি আবারো বিভিন্ন স্তরে ধর্ষিত হতে থাকেন। কখনো সেই ধর্ষণ ঘটে মিডিয়ার রগরগে হেডলাইন কিংবা তার ব্যক্তিগত জীবনের পোস্টমর্টেম করে আবার কখনো তা হয় পুলিশ স্টেশনে এবং আদালতে পুলিশ এবং আইনজীবীদের নোংরা, অশ্লীল জেরার মধ্য দিয়ে।
এইরকম হাজারো প্রতিকূলতা স্বভাবতই যৌন-সন্ত্রাসের ঘটনাগুলোকে সামনে নিয়ে আসতে ভিকটিমদের নিরুৎসাহিত করে।
পাশ্চাত্যের উন্নত দেশগুলোতে পর্যন্ত এইরকম হয়ে থাকে। আর বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় এই অসহায়ত্ব আরো ভয়ংকর রূপ নেয়।

বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা একজন নারীমাত্রই জানেন, একজন নারীর প্রতিদিনের জীবনে, শৈশবে-কৈশোরে নিজের বেডরুমের আপাত নিরাপদ আশ্রয়ে আত্মীয় এবং এমনকি পিতার নোংরা লালসা থেকে শুরু করে পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশনে কিংবা বাজারের ভিড়ে ঘরে ধরা নোংরা হাতের স্পর্শ পর্যন্ত কত ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয় আমাদের।
কখনো পরিবার, কখনো সমাজ এইরকম ভিকটিমদের কোন সাপোর্ট তো দেয়ই না, উল্টো তাকেই দায়ী করে আক্রমণকারী পুরুষটিকে উস্কে দেবার জন্যে।

অপরাধীটি প্রতিভাবান শিল্পমনষ্ক বিখ্যাত কোনো পুরুষ হলে এর সাথে যুক্ত হয় মিডিয়ার এবং আমজনতার বিচার প্রক্রিয়া এবং হেনস্থা। মিডিয়া এবং আমজনতা প্রায় সবসময়ই চোখ বন্ধ করে “শিল্পমনষ্ক” এবং “প্রতিভাবান” অত্যাচারী পুরুষদের পাশে এসে দাঁড়ায়। যেন তাদের প্রতিভার কারণে তারা সবধরনের ন্যায়-অন্যায় কিংবা নৈতিকতার ঊর্দ্ধে।

আজ একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং নির্বাসিত কবির লেখা অত্যন্ত আপত্তিকর একটি কবিতা চোখে পড়লো।
কবিতাটি তার লেখা কিনা এই নিয়ে তর্ক উঠতেই পারে, কিন্তু যতক্ষণ তিনি প্রতিবাদ না করছেন, ধরে নেয়া যেতেই পারে কবিতাটি তার রচিত।
লেখাটি (এমন নোংরা একটি লেখাকে কবিতা বলতে লজ্জিতবোধ হয়) খুব সম্ভব তসলিমা নাসরিনকে কিংবা তার মতোই অন্য যেকোনো একজন নারীবাদীকে উদ্দেশ্য করে লেখা।
না, আমি তসলিমার ভক্ত নই, তার প্রথম দিকের কলামগুলো অসম্ভব সাহসী এবং প্রয়োজনীয় হলেও সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে তিনি অনেক লোক দেখানো এবং বিতর্কিত, ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা বলে থাকেন, যা তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে সিরিয়াসলি দেখার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তার বিরুদ্ধে ঘটে চলা অন্যায়গুলোকে সমর্থন করা যায়। তার কথা পছন্দ না হলে কিংবা তার প্রেস্ক্রাইব করা নারীবাদে আপত্তি থাকলে কলম দিয়ে তার প্রতিবাদ হোক, বিতর্ক হোক। কিন্তু এইরকম নোংরা ভাষায় ব্যক্তিগত আক্রমণের অধিকার কারো নেই।

আজ এই কবিটি এরকম একটি লেখা লিখতে পারলেন এবং সেই লেখা জনসমক্ষে প্রকাশিত হবার মতো ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে পারলো, তার কারণ এই যে কবিমশাই নিশ্চিতভাবে জানেন যে তার জনপ্রিয় কবির স্ট্যাটাস তার রক্ষাকবচ। তার অসংখ্য ভক্ত তাকে যেকোনো অভিযোগের বিরুদ্ধে অন্ধভাবে সমর্থন দিয়ে যাবে। প্রয়োজনে তিনি পাশে পাবেন মিডিয়াকে।
আর তার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ অহংকারের দায় আপনার, আমার, আমাদের সবার। প্রতিভাবান পুরুষেরা এমন একটু আধটু করতেই পারেন, তাতে তাদের কোন অপরাধ তো হয়ই না বরং তাদের এইসং স্ক্যান্ডাল মিডিয়ার হিট কিংবা টিআরপি বাড়াতে যথেষ্ট কাজে দেয়। আর তাই আমরা মুখ বুঁজে থাকি। প্রতিভাবান পুরুষদের এই সন্ত্রাসী স্বভাবগুলোকে খাবারে থাকা নুনের মতোই অবশ্যম্ভাবী কিংবা প্রয়োজনীয় ধরে নিয়ে সেই অন্যায়কে স্বাভাবিকত্ব দেই আমরাই।

একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় জীবনমুখী গায়ক, কৈশোরে যার প্রতি আমার ভালোবাসা ছিল অবিচল, এমনকি অনেক প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে সেই কৈশোরেই যার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম সেই কলকাতায়। খুব বেশি মানুষকে আমি স্বেচ্ছায় প্রণাম করিনি, কিন্তু এই মানুষটিকে করেছিলাম। কোনো এক সকালে তার এবং তার স্ত্রী-কন্যার সাথে পরিচিত হয়ে, চায়ের কাপে আড্ডার ঝড় তুলে অলৌকিক এক অনুভূতি নিয়ে ফিরেছিলাম।

কয়েক বছর পর শুনলাম সেই মানুষটি যার পর নাই অত্যাচার করতেন তার স্ত্রীর ওপর। প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম। আজ এতোগুলো বছর পরও তার তৈরি করা অত্যন্ত প্রিয় গানগুলো শুনতে গেলে যন্ত্রণা হয়, বুঝে উঠতে পারি না কী করে তার গানগুলোকে আলাদা করি তার ব্যক্তিগত জীবনের ভণ্ডামির থেকে।

আরেকটা গল্প বলি। এই শহরে অত্যন্ত বয়োজেষ্ঠ এবং জনপ্রিয় ব্যক্তি আছেন। শিল্পী সমাজ তো বটেই, টরন্টোর বাঙালি কম্যুনিটির অনেক অনুষ্ঠানে তাকে ছাড়া অপূর্ণ থাকে। আমি তখন মাত্র এসেছি এখানে। অমানবিক স্ট্রাগল করছি টিকে থাকার জন্যে। তখনও এ শহরে আমার এতো বন্ধু হয়নি, আত্মীয় যিনি আছেন, তিনিও সহায়তার বদলে আর্থিক এবং মানসিকভাবে এবিউজ করে গেছেন। কোনোভাবে আমার স্ট্রাগলের কথা জেনে তিনি আমায় ডেকে পাঠালেন দেখা করতে। কোনো একটা সাবওয়ে স্টেশনে। ২২ বছরের বোকা মেয়েটা খুব সরল মনেই তার সাথে দেখা করতে গেলো। তিনি দু’চারটা কুশল জিজ্ঞেস করেই তার সেলফোন নাম্বারটা দিয়ে বললেন, মাঝে মাঝে যেন প্রয়োজনে প্রয়োজনে তাকে ফোন করি। কথাটা শেষ না হতেই ভিড়ের ভেতরেই তিনি জোর করে জড়িয়ে ধরতে গেলেন আমাকে।
ঝটকা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিতেই শুনলাম, ফিসফিস করে বলছেন, “তোমার আন্টিকে (তার স্ত্রী) কিছু বলো না যেন!” আমি অসম্ভব নোংরা গা গুলিয়ে যাওয়া অনুভূতি নিয়ে চলে এলাম। তখন সাহস পাইনি কাউকে বলার। মানুষটি “প্রতিভাবান” এবং “খ্যাতিমান” বলেই হয়তো। তারপর বহুবার বহু অনুষ্ঠানে তার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সান্ত্বনা একটাই, আজ অবধি সেই মানুষটি আমার চোখের দিকে তাকাবার সাহস পাননি।

আমি মাত্র দুটো গল্প বললাম। এমন হাজার হাজার গল্প আছে। যেই পুরুষটি নিয়মিতভাবে তার স্ত্রীর গায়ে হাত তোলে, ধর্ষণ করে, শুধুমাত্র একটি জনপ্রিয় পত্রিকায় অত্যন্ত ক্ষমতার জায়গায় আছে এবং বুদ্ধিজীবী মহলে খ্যাতি আছে বলেই পরিচিত মিডিয়ার লোকেরা, এক্টিভিস্টরা সব জেনেও তাকে মাথায় তুলে রাখে। যে “তথাকথিত” কবি নারীর অবমাননা না করে, নারীজাতিকে দুচারটে গালাগাল না দিয়ে দুই লাইনও লিখতে পারেন না, তাকে আমরা পুরস্কৃত করি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সামান্য পরিচয়ের সূত্রে যেকোনো মেয়েকে নোংরা মেসেজ পাঠিয়েও শুধুমাত্র কবি কিংবা শিল্পী পরিচয়টি আছে বলেই পার পেয়ে যায় এইসব জানোয়ারেরা।

নীরবতা ভাঙছে, আস্তে আস্তে এমনকি আমাদের বাংলাদেশের মেয়েরাও এইসব অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন। কিন্তু যতদিন আমাদের শিল্প-সাহিত্যের সাথে জড়িত মাত্রেই এইসব মানুষকে ঈশ্বরজ্ঞানে পূজা করার অভ্যেসটা কাটবে না, ততদিন এমন হাজার হাজার যৌন সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

তাই বলছি, মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখতে শিখি চলুন। আর এই বোধটাকে শক্ত করে তুলুন যে অপরাধ অপরাধই। সেটা যেই করুক না কেন, তার শিকার যেই হোক না কেন। প্রতিভাবান পুরুষও যৌন সন্ত্রাস ঘটালে তার পরিচয় দিনশেষে একজন সন্ত্রাসীর। তা সেটা চার্লি চ্যাপলিন, রোমান পোলান্সকি থেকে শুরু করে আমাদের বাঙালি সমাজের পরম পূজনীয় এবং সম্মানিত কবিবর পর্যন্ত যেই হোন না কেন!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 160
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    162
    Shares

লেখাটি ৬১৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.