‘ঘৃণাজীবীর ছড়ানো ঘৃণা থেকে দূরে থাকুন’

0

অজন্তা দেবরায়:

পিনাকী ভট্টাচার্য্য একজন ঘৃণাজীবী। তিনি খুব সুকৌশলে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যাগুরু ধর্মভীরু মানুষের অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে উস্কানো, বিদ্বেষ ছড়ানো এবং সহিংসতা সৃষ্টির কাজ করে চলেছেন বলেই আমার বিশ্বাস।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন, দেশের প্রগতিশীল মুক্তমনা তরুণদের বিরুদ্ধে মৌলবাদীদের প্রতিনিয়ত উস্কাচ্ছেন, উগ্র মৌলবাদী সংগঠনগুলোর এজেন্ডার পক্ষে লেখালেখি করছেন। সর্বোপরি দেশে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করার জন্যই বোধ করি তার প্রাণান্ত চেষ্টা।

যাই হোক, তাকে আমি কেন ‘ঘৃণীজীবী বলেছি সে ব্যাপারে ব্যাখ্যা চেয়েছেন তিনি ও তার অনুসারীরা। তাই সব বিষয়ে কথা না বলে, আমি শুধু ঠাকুরপাড়ার ঘটনাটি নিয়ে তার যে অবস্থান সেটি নিয়েই কথা বলবো।

১)

প্রথমেই বলতে চাই, রংপুরের ঠাকুরপাড়ায় হামলা করতে গিয়ে পুলিশের পাল্টা গুলিতে যে মানুষটি মারা গেছেন তার প্রতি আমার সহানুভূতি আছে। কারো এমন মৃত্যু একটা সভ্য সমাজে কোনোমতেই কাম্য না।

কিন্তু, যখন শত শত মানুষ প্রচন্ড আগ্রাসী হয়ে নিরীহ মানুষজনের উপর হামলা করতে যায় তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার দায়িত্ব থাকে পুলিশ এর।পুলিশ ঠান্ডা মাথায় কারো খুন করেনি।তারা হামলাকারীদের থামাতে গুলি করেছে। সেই গুলিতে মানুষ মারা গেছে।

ভেবে দেখুন, হামলার করতে না গেলে কি কেউ মারা পড়তেন?

আসল দোষটা কার বলুন তো? যারা উস্কানি দিয়ে শত শত মানুষকে ঐ এলাকায় হামলা করতে নিয়ে গেছে তাদের? নাকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পুলিশ যা করেছে, তার?

যেকোনো সুস্থ চিন্তার মানুষ এটা বোঝে যে পুলিশ অ্যাকশন না নিলে ঠাকুর পাড়ার ঘটনা নাসির নগর এর মতো আরো ভয়াবহ হতো। অথচ পিনাকী ভট্টাচার্য -হামলা’র বিরুদ্ধে একটা শব্দও উচ্চারণ না করে উল্টো হামলাকারীদের একজনের মৃত্যুর ঘটনাকে ইস্যু বানিয়ে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলতে চাইছেন। কারণ পিনাকীরা জানেন, কোন কথা বললে মানুষের ধর্মানুভূতি কাজে লাগিয়ে ফায়দা হাসিল করা যাবে, তাদের স্বার্থলিপ্সু চোখ একারণেই হয়তো শুধু সহিংসতা খুঁজে বেড়ায়।

২)

ধরেন আপনার পাশের বাড়িতে দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়া লেগেছে। একজন সুস্থ বিবেকবান মানুষ হিসেবে কী করা উচিত তখন আপনার? দুই ভাইয়ের মধ্যে বিবাদ মেটানোর চেষ্টা করা? নাকি এক ভাইকে অন্য ভাইয়ের বিরুদ্ধে উস্কে দিয়ে মারামারি এমন পর্যায়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করবেন, যাতে একজন আরেকজনকে খুন করে ফেলে?

পিনাকী ভট্টাচার্য্য হামলার দিনেই ফেইসবুকে লিখেছেন, টিটু রায় এর স্ট্যাটাস নাকি তিনি দেখেছেন। সেটা নাকি খুব ভয়াবহ রকম ধর্মীয় অবমাননামূলক ছিল। তার বক্তব্যে সরাসরি তিনি হামলাকে জায়েজ করতে চাইলেন।

এতো বছর ধরে ফেসবুকিং করেন। তার মতো ফেসবুকার তো দেখেই বুঝবার কথা যে, যে পোস্টটা নিয়ে এতো কথা সেটা একটা শেয়ার করা পোস্ট ছিল। এবং সেই সাথে, প্রোফাইলটাও দেখামাত্রই বোঝা যায়, এটা একটা ‘ভুয়া’ প্রোফাইল।

একজন অভিজ্ঞ ফেসবুকার হিসেবে তিনি পারতেন যেকোনো বিবেকবান মানুষের মতো কাজ করতে। পারতেন ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার হুজুগ তুলে বাস্তবে সংঘটিত হামলা-মামলার বিপক্ষে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করতে। কিন্তু তা না করে, হামলাকারীদের থামতে বলার কথা না বলে উল্টো তিনি তাদেরকে ইন্ধন জুগিয়ে গেছেন।

৩)

ঠাকুরপাড়ার হামলার প্রতিবাদে একটা প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই সমাবেশের উদ্যোক্তাদের একজনের পোস্ট শেয়ার করে পিনাকী ভট্টাচার্য্য লিখেছেন:

‘দেখেন, রংপুরে গুলি খেয়ে যেন দুইজন মানুষ মরে নাই, খালি হিন্দু পাড়ায় আগুন দেয়াই হইছে যেন। আর ষাট জন মানুষও আহত হয় নাই। কয়েকটা ভস্মীভূত ঘর দুইটা তাজা প্রাণের চাইতে সেক্যুলারদের কাছে বেশী দামী।’

-বোঝেন অবস্থা। হামলাকারীদের জন্য তার দরদ এতোটাই উথলে উঠছে যে তিনি এখন হামলাকারীদের আহত হবার বিরুদ্ধেও মানুষকে উস্কানি দিচ্ছেন।

এই যে উনি ‘হিন্দুপাড়া’ ‘সেক্যুলার’ এই শব্দগুলোর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে একটা বিরূপ পরিস্থিতি ও জনমত তৈরির মিশনে নেমেছেন, এটা কি ঘৃণা ছড়ানো নয়?

৪)

সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আমার কাছে মনে হয়েছে তা হলো, জনাব পিনাকী বলতে চাইছেন সেক্যুলাররা নাক মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়াচ্ছে। তিনি তার বক্তব্যে লিখেছে –

“আসলে যে কারণে তারা ক্ষেপেছেন কিন্তু বলতে পারছেন না মুখ ফুটে, তা হচ্ছে, আমি কেন রংপুরের ঘটনায় ইসলাম বিদ্বেষি জায়গায় দাঁড়ায়ে মুসলমান ব্লেমিং করলাম না।”

-ভাবতে পারেন? কথায় কথায় ‘মুসলমান’দের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়ার কী নির্লজ্জ চেষ্টা তার! ‘হিন্দু বনাম মুসলমানেদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে, সেক্যুলারদের সাথে ধার্মিকদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে কী লাভ হাসিল করতে চান পিনাকী ভট্টাচার্য্য?

তার লেখায় এতো বিভাজন কেন? কোন উদ্দেশ্যে তিনি এতো ঘৃণার উদ্গীরণ করছেন সোশ্যাল মিডিয়াতে?

সামান্য কোনো ফেসবুকের পোস্টকে অছিলা করে হামলা, মামলা, সমাবেশ কি কোনো শিক্ষিত জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের পক্ষে সমর্থন দেয়া সম্ভব, যদি না তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকে?

দয়া করে ভাবুন আপনারা। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে ধর্ম দিয়ে যাতে আমাদেরকে কেউ আর বিভাজিত করতে না পারে সেই খেয়াল রাখুন। এই ঘৃণাজীবীর তৈরি করা ঘৃণার ফ্যাক্টরি থেকে দূরে থাকুন।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২,৫৪৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.