প্রমাণ দিন, সংখ্যালঘুদেরও অনুভূতি আছে

0

সেবিকা দেবনাথ:

প্রতিদিন সকালেই ঘুম থেকে উঠে দেখি মা বারান্দায় রাখা টবগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে কী কী সব যেন করে। কাছে গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি, মা টবের মাটি খুঁচিয়ে দেয়া, কিংবা গাছের পাতা বা ডাল ছাঁটার কাজ করে। টবের সাদা টগরের গাছটা দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বেশ ডাগর হয়ে উঠেছে। ফুল খুব একটা ফোটে না। তবে গাছের সবুজ পাতাগুলো দেখতে দারুণ লাগে। তার পাশেই গ্রিল বেয়ে লকলকিয়ে উপরে উঠা নীল অপরাজিতার গাছ। লতানো গাছটা ফুলে ফুলে নীল হয়ে থাকতো। গাছটার গায়ে বেশ কয়েকটা ঘিয়ে রঙের পোকার বাসা। ওই পোকাগুলোর কারণে গাছটায় ফুল ফোটে না। সবুজ পাতাগুলোও বিবর্ণ হয়ে গেছে।

আজ সকালে মাকে বললাম, ‘প্রতিদিনই তোমার টবের মাটি খোঁচাখুচি করা লাগে? আর কিছুদিন পর পর গাছের ডালা-পালা ছাঁটা লাগে?’ উত্তরে মা বলে, ‘মাঝে মাঝে গাছের ডালা-পালা ছেঁটে দিতে হয়। গাছ বেশি বড় হলে সমস্যা। ফুল ফোটে না। এক পোকা তো অপরাজিতার গাছটাকে নষ্টই করে দিলো। তাই গোড়া থেকেই কেটে দিলাম’।

আমার লেখার প্রসঙ্গের সঙ্গে এই কথাগুলো কতোটা প্রাসঙ্গিক ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে মনে হলো তাই শুরুতেই কথাগুলো বললাম। আমার মনে হয়, এই দেশে গণতন্ত্রের বৈচিত্র্যের নামে কিছু সংখ্যালঘু রাখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও রাখা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের ছাঁটা হয় এবং ভবিষ্যতেও হবে। ওদের অবস্থা আমাদের বাসার সাদা টগর গাছটার মতো। সৌন্দর্য্যরে কারণে তাকে কেটে ছেঁটে রাখা হচ্ছে।

আবার কোনো একটা অছিলায় (ওই কাজ সে আদৌ করেছে কিনা তা যাচাই বাছাই না করেই) সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের রীতি যুগের পর যুগ চলে আসছে। এবং ভবিষ্যতেও এই রীতি অব্যাহত যে থাকবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। যেমন অপরাজিতা গাছটা। কিছু পোকার কারণে পুরো অপরাজিতা গাছটাকেই কেটে ফেলতে হলো।

এবার আসি মূল কথায়। জানতে পারলাম ফেসবুকে যার দেয়া স্ট্যাটাস নিয়ে রংপুরে এতো ‘আলোকসজ্জার’ ব্যবস্থা (বাড়ি ঘরে আগুন দেয়া) করা হয়েছে, তিনি একজন রিকশা চালক। তিনি ঢাকা কিংবা নারায়ণগঞ্জের কোথাও রিকশা চালান। এবং তিনি নিরক্ষর, মানে পড়ালেখা জানেন না। আর নাসিরনগরে যার জন্য আলোকসজ্জা করা হয়েছিল, তিনি ছিলেন একজন জেলে।

দেশে তথ্য প্রযুক্তির সুবাতাস টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। থ্রি জি’র যুগের ইতি টেনে ফোর জি-তে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি। সেখানে একজন রিকশাচালক কিংবা জেলের ফেসবুক একাউন্ট থাকতে পারবে না, আমি তা বলছি না। কিন্তু তাদের নামে খোলা ফেসবুক একাউন্ট তারা নিজেরা পরিচালনা করতেন কিনা, আমার প্রশ্ন সেখানে। রামু ও নাসিরনগরের ঘটনায় যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছিল, তা থেকে তো এটা স্পষ্ট যে, উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানো এই দেশে নতুন কিছু না। ধর্ম নিয়ে সহিংসতা আগেও হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে। তবে একটা সুবিধা আছে, কিছু সময় বিরতি দিয়ে দিয়ে এক একটা সহিংস ঘটনা ঘটে।

যেসব মুমীন মুসলমান ভাইরা ওইসব ঘটনাকে ইস্যু করে আলোকসজ্জায় অংশ নিয়েছেন, তাদের কাছে কয়েকটা বিষয়ে খুব জানতে ইচ্ছা করে। যে ধর্মকে অবমাননা করা হয়েছে উল্লেখ করে আপনারা আলোকসজ্জাটা করলেন, তাতে কতোটুকু ধর্ম রক্ষা হয়েছে? বেহেস্ত পাবার নিশ্চয়তা কি পেয়েছেন? আপনাদের অনুভূতি এতো ঘনঘন অনুভূত হয় কেন?

একইসঙ্গে যারা সংখ্যালঘুদের নেতা হয়ে বসে আছেন, সংখ্যালঘুদের নেতা হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে নিমন্ত্রিত হোন, টুকটাক সুবিধা নেন, তাদের কাছেও কয়েকটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে। সংখ্যালঘুদের নেতা হিসেবে আপনাদের করণীয় আসলে কী? দুর্গা পূজায় সারা দেশে পূজামণ্ডপের সংখ্যা বাড়লেই তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা? বিজয়া সম্মিলনী, জন্মাষ্টমীতে বঙ্গভবন-গণভবনে গিয়ে ফটোসেশন করা? সেখানে গিয়ে চা-মিষ্টি খেয়ে অন্যদের কাছে গালভরা গল্প করা? সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হলে শান্তির বার্তা নিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করা? নিন্দা জানিয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠানো? ভোট বর্জনের একটা হুঙ্কার দেয়া? আচ্ছা, হুঙ্কারটা কি আপনারা সত্যিই মন থেকে দেন? নাকি বলতে হয়, তাই বলেন?

সামনে তো নির্বাচন। সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেন। ওরকম ফাঁকা বুলি না আওরে ক্ষমতা থাকলে একটি বার অন্তত ভোট বর্জন করে দেখান। ঘুরে দাঁড়ান। তবেই না বুঝবে সংখ্যালঘুরা জড় বস্তু না। ঘর-বাড়ি পুড়লে, প্রতিমা ভাঙ্গলে তাদেরও অনুভূতিতে লাগে। ওরা সংখ্যালঘু হলেও মানুষ। তবে সামান্য ছুতোয় তাদের অনুভূতি কেঁপে ওঠে না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 591
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    593
    Shares

লেখাটি ৯০৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.