আগুনে দগ্ধ সেক্যুলার বাংলাদেশ; একটি স্বপ্নের নির্মম হত্যাকাণ্ড

0

শেখ তাসলিমা মুন:

দ্বিজাতি তত্ত্ব জন্ম দিয়েছিল হিন্দুস্তান-পাকিস্তান। ভারত নিজে সেক্যুলার দেশ হিসেবে দাবি করে আসছিল তবুও। মোদীজী সে বদনাম ঘুচিয়েছেন। সাধুবাদ মোদীজী! আপনিই নাম রাখলেন তত্ত্বটির!

চাষাভুষার এই অঞ্চলটি ‘পূর্ববাংলা’কে আপনারা আকিকা দিয়ে দিলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান’ হিসেবে। রাতারাতি। এই চাষাভুষারা কিন্তু ধর্মীয় আইডেন্টিটির কোনো সঙ্কটে ছিল না। আপনারা বুঝতে পারেন নাই যে, এ অঞ্চলটি ধর্মের আইডেন্টিটিতে আপনাদের মতো ‘পাপী’ ছিল না। ক্ষমতালুব্ধ লোভী ছিল না।
এ অঞ্চলটি গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতে বাগুন সেদ্ধ দিয়া খাইয়া হুকোয় টান দিয়া ভাটিয়ালি গান ধরতো। সারারাত কবির গান শুনে ফজরের নামাজ পড়ে মাঠের দিকে রওয়ানা দিত। চৈত্রের কাঠফাটা রোদে লাঙল ঠেলতে ঠেলতে গান ধরতো, ‘পরের জায়গা পরের জমি ঘর বানাইয়া আমি রই… আমিতো সেই ঘরের মালিক নই…’!

অথচ আপনারা সেই জাতির সাড়ে সর্বনাশ করলেন। তাঁদের কপালে ‘মুসলমান’ এর নূরানি দাগ আঁকিয়া দিলেন। এ সরল সুন্দর জাতিকে আজীবনের জন্য এক অন্যায্য যুদ্ধের ভেতর ঠেলে দিলেন। এদেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটিতে রক্তাক্ত হলো। তবু তারা স্বাধীন হতে পারেনি। তবু তাঁদের পরাজয় হয়েছে। তারা আসলে জিততে পারেনি। এ দেশটির ত্রিশ লাখ শহীদ মাটির নিচে থেকে দেখতে পাচ্ছে, তারা জীবন দিয়েছিল আসলে একটি অলীক স্বপ্নকে সামনে রেখে। সে স্বপ্ন তাঁদের সাথেই শহীদ হয়েছিল। সামনে আসতে পারেনি কখনই। দ্বিজাতি তত্ত্বের কারিগররা এতোই সফল এবং ক্ষমতাশীল।

একটি চাষাভুষা জাতি তাঁদের ললাটে কতো বেদনার চিহ্ন নিয়ে পথ চলছে, চলেছে, কিন্তু সবচাইতে বেদনার প্রান্তে তারা এখন। এদেশে ওয়াহাবি মাদ্রাসার শিক্ষা এক অদ্ভুত সফলতায় বিজয় নিশান উড়িয়েছে।

একটি দেশে যখন অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখল করে রাখতে হয়, তখন কিছু ঘটনা ঘটাতে হয়। তার ভেতর যেটি সবচাইতে দরকারি, মানুষকে ধর্মের অন্ধকারে রাখা। তাতে শাসক শ্রেণী থাকে সবচাইতে নিরাপদ। এ আফিমের থেকে শক্তিশালী আফিম আর একটিও নেই। ধর্মের অন্ধকারে মানুষকে ডুবিয়ে দিতে পারলে সরকারকে কিছুই আর করতে হয় না। ডিম ফুটে একদিন যে ড্রাকুলা বের হয়, তাতেই তাদের কাযসিদ্ধি ঘটে পুরোপুরি। আর কিছু লাগে না। এদেশে এ ঘটনাই ঘটে চলেছে বিভিন্ন ফর্মে। কখনও সামরিক শাসক, কখনও ‘ভোটের’ সরকার। ‘ক্ষমতা’ যেখানে সেন্ট্রাল পয়েন্ট! আর নিহত হয় একটি দেশের স্বপ্ন, একটি জাতির স্বপ্ন, একটি কণ্ঠের স্বপ্ন, একটি মুক্তির স্বপ্ন, একটি মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন।

একটি তরুণ সম্প্রদায় যুদ্ধে জীবন দিয়েছিল একটি স্বপ্নকে বুকে নিয়ে। একটি মুক্ত দেশের জন্য। একটি আলোকিত দেশের জন্য। একটি সেক্যুলার দেশের জন্য। নিজের শেকড় রক্ষার জন্য। একটি পলিমাটির জন্য। একটি বাউল গানের জন্য। একটি ফুলের জন্য। এর সবই আমরা হারিয়েছি। এ নিয়ে আজ আর কোনো বিতর্ক নেই। এটি সবচাইতে সত্য শাসক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর কন্যার শাসনে। একবিন্দু ‘রিস্ক’ তিনি নিতে রাজী নন। সেখানে ভেসে গেছে তার ‘বাবা’ এবং আমার তরুণ ‘বাবা’। একটি তরুণ সমাজের স্বপ্ন। আহা! সেইসব তরুণ! সেইসব স্বপ্ন!

২২% হিন্দু ছিল। ৫% ক্রিশ্চিয়ান। বৌদ্ধ। আর পাহাড়। যদিও পাহাড়ে আমরা মসজিদ বানায় ফেলছি। বাঙালি মুসলমান রোপন করে ফেলছি। পাহাড় আমরা চাই। পাহাড়িদের জুতোর নিচে ফালায় বাঙালি মুছলমান বানায় ফেলবো ইনশাল্লাহ। এতোগুলো হিন্দু বুদ্ধিস্টস খেরেস্তান কমাইতে হইলে তাদের খেদাইতে হবে। এই খেদানির পেছনে আপনারা দেখেন বাড়িতে আগুন দেওয়া। তাদের নারীদের ধর্ষণ করা। তাদের জমি দোকান দখল করে নেওয়া। তাদের মেয়েদের জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া। আর আমি দেখি একটি নিহত সংবিধান।

একটি সংবিধানকে হত্যা করলে উপরের কাজগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একটি দেশ যখন রাষ্ট্রীয়ভাবে তথা সাংবিধানিকভাবে বলে, এটি একটি ‘মুসলিম দেশ’, অটোমেটিক্যালি মুসলমানরা হয়ে যায় সে দেশের ‘মূল সিটিজেন’। অন্যরা কি হয়? তারা কি নাগরিক? না। সাংবিধানিক ডেফিনেশনে নয়। সাংবিধানিক স্ট্যাটাসে মুসলিমরাই আসল নাগরিক। এটি একটি রাষ্ট্রীয় ট্রুথ। এ সত্যতা নিয়েই এ দেশের প্রশাসন গড়ে ওঠে। বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষানীতি, সাহিত্য বদলে যায়। বদলে যায় শেকড়। আমদানি করা হয় ধর্মীয় শাসক, শিক্ষক, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সমাজের মাথা হয়ে ওঠে একটি ধর্মের ধর্মগুরু।

টোটালিটেরিয়ানিজম যখন একটি স্টেটের ক্ষমতার উৎস হয়, ভোটের উৎস হয়ে ওঠে, তখন সে দেশে, এমনকি ‘সংখ্যালঘু’ করে রাখা শ্রেণিকেও ক্লিন করার কাজে সরাসরি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হয় স্বয়ং রাষ্ট্র প্রধানকে। এখানে বঙ্গবন্ধু কন্যা রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়ে নোবেল প্রাইজের দাবিদার হোন, আর সুচিকে নোবেল ফেরত দিতে হয়। রংপুরে যে হিন্দু পরিবারগুলোকে পুড়িয়ে দেওয়া হলো তার জন্য এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানের কোন প্রাইজ কেড়ে নেওয়া হবে, বলবেন?

এই পুড়িয়ে দেওয়া কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। ফেসবুক পোস্টও নয়। এটি সেদিন শুরু হয়েছে, যেদিন অফিসিয়ালি একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র এবং সংবিধানকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে আগুনে একটি স্বপ্ন পুড়ে গিয়েছিল। সবপ্নের সেক্যুলার বাংলাদেশ ভস্মিভূত হয়ে গেছে। এখন আর কিইবা বাকি আছে! ক্ষুদ্র হতদরিদ্র পুড়ছে। আর এ আগুন একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের দেওয়া আগুন। কীভাবে লড়বে তাঁরা? একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়বে কীভাবে ওরা? কোন ক্ষমতায়?

তোরা মরে যা! মরে যারে বাছারা! মরে যা!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 393
  •  
  •  
  • 6
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    399
    Shares

লেখাটি ৫৫৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.