রাষ্ট্রধর্ম থাকলে সাম্প্রদায়িকতাও থাকবে

0

ফারিসা মাহমুদ:

আমি খুব ধার্মিক মানুষ না। ধার্মিক হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। তা করতে যেয়ে ধর্মের প্রতি যে আবছা একটা বিশ্বাস মতো ছিলো সেটা উঠে গেছে। এই প্রসঙ্গে আমি একটু পরিস্কার করি, ইসলাম ধর্মের দোষ খোঁজা এবং অন্য ধর্মের গুণ বের করার দলে আমি না। অথবা তার উল্টোটাও না। যেকোনো ধর্মই একটা পঁচা বিষয়। এই জিনিস মানুষকে কুঁয়োর ভিতরে আটকে রাখে।

এই সময়ে তথ্য এবং প্রযুক্তির কল্যাণে সুস্থ মানুষের পক্ষে বোকা থাকা খুবই কঠিন। কেউ না চাইলেও সময় তাকে বুদ্ধিমান বানিয়ে দিবে। কাজেই অন্ধ ধর্মবিশ্বাসী মানুষ হচ্ছে হিপোক্রেট। যে কোনো কারণেই সে জোর করে ধর্মবিশ্বাস করতে চায় বা বিশ্বাস করে এমন ভাব ধরে থাকে। অথবা দলবদ্ধভাবে থাকতে পছন্দ করে। মানুষ সব মানুষের মধ্যে একজন হতে চায় না, একটা দলের মধ্যে থাকতে চায়। মানুষের মধ্যে দলবদ্ধভাবে থাকার প্রবণতা রয়েছে।

রংপুরের গঙাচড়া উপজেলার হরকলি ঠাকুরপাড়া গ্রামে হিন্দুদের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। আটটা বাড়ি পুড়ে ছাই। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে টিটু নামের একটা ছেলের ফেইসবুকের পোস্টকে কেন্দ্র করে। ৫ নভেম্বর টিটু একটা ব্যাঙ্গচিত্র পোস্ট করেছিলো, তা নিয়ে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ উঠে। আর সেই অভিযোগেরই জের ধরে এই আটটি বাড়ি অগ্নিদগ্ধ।

এইটা হচ্ছে সাম্প্রতিক মানে গতকালের ঘটনা। কিন্তু এমন ঘটনা কি এই প্রথম? শুধু কি মুসলিম হিন্দুতে সংঘাত? বৌদ্ধ আর মুসলিমে সংঘাত হয়নি? খ্রিস্টান পাদ্রী খুন হয়নি? গির্জায় বোমা হামলা হয়নি?
কিছু সময় বিরতি দিয়ে দিয়ে একটার পর একটা এমন সহিংস ঘটনা তো ঘটছেই। আমি বুদ্ধি হওয়ার পরে থেকেই দেখে আসছি। আমার জন্মের অাগেও ছিলো। ৪৭ এর দেশভাগের মূলেও তো এই ধর্মই ছিলো। ধর্মকে ভিত্তি করে যে দেশের জন্ম, যে দেশে রাষ্ট্র ধর্ম থাকে, সেদেশের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি প্রখর হবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে কেন কিছুদিন পরে পরে এমন ঘটনায় আমরা প্রতিক্রিয়া দেখাই?

ধর্ম নিয়ে সহিংসতা আগেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। এবং সকল হিন্দুদের উপরে নিপীড়নের একমাত্র উদ্দেশ্য সম্পত্তি দখল। ধর্ম হচ্ছে ঢাল। আবার যেদেশে মুসলিমরা সংখ্যালঘু সেখানে একই রকম ঘটানাই হচ্ছে। এই সব ঘটনার সূতা ধরে ধরে গভীরে গেলে দেখা যাবে, ধর্ম নয়, স্বার্থই মূল কারণ। ধর্ম মানুষকে টানেই লোভ আর ভয় দেখিয়ে। স্বর্গের লোভ, নরকের ভয়।

যখন ধর্ম আমাদের পরিচয়, যেমন আমি ফারিসা মাহমুদ আমার প্রতিবেশী অরণ্য দাস, তখন আমি কী করে অরণ্যকে আপন বলে মনে করবো? চর্চা করবো ধর্মের, আর মুখে বলবো মানুষে মানুষে ভাই ভাই? তা কি হয়? যতোদিন ধর্মের গুরুত্ব থাকবে, ততোদিন এই ধরনের বাড়িঘর জ্বালাও-পোড়াও বন্ধ হবে না।

ধর্ম কোনোকালেও মানুষকে এক করে নাই। কোনো ধর্মই না। মানুষে মানুষে আলাদা করা, যুদ্ধ করাই ধর্মের কাজ। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ধর্ম তাই করে এসেছে। ইতিহাস সাক্ষি।
তবে এখন আমায় কী বলবেন? নাস্তিক? আমার বিশ্বাস, নাস্তিকতাও একটা ধর্ম। আমি কখনো নিজেকে নাস্তিক পরিচয় দেই না। আমার কেবল মানুষে মানুষে পার্থক্য দেখতে ভালো লাগে না। ভাবুন, ধর্ম যদি না থাকতো, তবে কী হতো আমাদের পরিচয়?
মানুষ।
জন্ম থেকেই যদি মানুষ হতাম, তাহলে কষ্ট করে ঘষে-মেজে মানুষ হওয়া লাগতো না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 656
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    658
    Shares

লেখাটি ৭৮৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.