নারীবাদীদের লেখায় কি সমাধান থাকে না?

0

রোকসানা ইয়াসমিন:

অনেকে বলেন, নারীবাদীরা শুধু সমস্যার কথাই বলে যান। সমাধানের কথা বলেন না। আমার কিন্তু তা মনে হয় না। মনে হয়, নারীবাদীরা যে যার দৃষ্টিকোণ থেকে লিঙ্গ বৈষম্যের কারণে নানাভাবে ভুক্তভোগী নারীদের বিভিন্ন সমস্যার কথা, ভোগান্তির কথা বলেন এবং নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সাথে করে সমাধানের কথাটাও বলে দেন।

নারীবাদীদের, সকলের কাজের ধরন, পরিবেশ পরিস্থিতি, দৃষ্টিকোণ, একজন থেকে অন্যজনের ভিন্ন হতেই পারে; কিন্তু যে কারণে নারীবাদীরা লড়ছেন, তার মূল উদ্দেশ্য কিন্তু এক। স্বাধীনতা। সমাজ থেকে নারী ও পুরুষের বৈষম্য দূর করা।নারীর যেসকল অধিকার লুট হয়ে গেছে, সেসব পুনরুদ্ধার। হিসেব এবং আদায়। প্রাপ্য বুঝে নেয়া। যে যেভাবে বোঝেন। আন্দোলনের উৎপত্তিগত দিকও কিন্তু এক, ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে হলেও।

সমাজে একই প্রজাতির একটি শ্রেণীর ওপর আরেকটি শ্রেণীর অযৌক্তিক আগ্রাসন, নারীর ওপর পুরুষতন্ত্রের প্রতাপ। তার থেকে মুক্তি প্রত্যাশার কথা নারীবাদীরা বলছেন বহুকাল ধরে। এখনও বলছেন। কঠিন করে, নরম করে, বুঝিয়ে, যুক্তিসহ, কেঁদে, নিরবে, শারীরিক, মানসিক যন্ত্রণায় ভুগে ভুগে, সহ্য করে করে, আপোস করে করে, ঘরে বাইরে, রাজপথে, কখনও হাতে প্ল্যাকার্ড, কখনও চিৎকার করে; যে যেভাবে পারে, বলছেন। প্রতিবাদ করছেন। লিঙ্গবৈষম্যগুলো চিহ্নিত করছেন। বৈষম্যবিহীন সমাজ চাইছেন। তাহলে নারীবাদীরা সমাধানের কথা বলছেন না কী করে?

নারীরা যতটুকু পাচ্ছে, অথবা নারীকে করুণা করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যতটুকু দিচ্ছে, ততটুকুকেই প্রাপ্য বলে ধরে নিয়ে, নিয়মগুলো মেনে নিয়ে, পুরুষতান্ত্রিক ছাঁচের মধ্যে নিজেকে ফেলে, তার সাথেই মানিয়ে চলছে, মানিয়ে চলতে চেষ্টা করছে অধিকাংশ নারী। ধর্মের নামে নারীদের কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে। ধর্মকে যে বিনা প্রশ্নে শিরোধার্য করতে শেখানো হয়েছে এতোকাল ধরে, এটি পুরুষতন্ত্রের একধরনের নোংরা রাজনীতি।

আজকাল তো উদ্দেশ্যমূলকভাবে নারীদের রাস্তাঘাটে নির্যাতন করা হচ্ছে, যেন তারা ভয় পেয়ে ঘরে সেঁটিয়ে থাকে। যে নারীরা সমাজ সংসারে মানিয়ে চলছেন, তাদের বেশিরভাগ নারীবাদের কথা, নারী স্বাধীনতার কথা, লিঙ্গ বৈষম্যের কথা জানেনই না। আর যারা খুব কম করে হলেও জানেন, তাদের অনেকেই সমাজে নারী পুরুষের বৈষম্য যে কোথায়, সেটাই বুঝতে পারেন না। প্রতিদিনের জীবন যাপনে, কথায়, কাজে, চলতে ফিরতে ওরা যে অবহেলিত, অবদমিত হচ্ছে, সেসবের বোধই তাদের নেই। ওদের ভেতরে কি কোনওরকম কোনও প্রশ্ন আসলেই জাগে না? বৈষম্যগুলো খুব মোটাদাগের করে হলেও ভাসা ভাসা, ঝাপসা করে হলেও চোখে পড়ে না? একেবারেই না?

কিছুটা হলেও হয়তো পড়ে, কখনও কখনও কারও কারও ক্ষেত্রে। যে মেয়েদের প্রতিনিয়ত ঘরে বাইরে বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়, রাস্তাঘাটে, বাসে, ট্রেনে, কর্মক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্ত নিরাপত্তাহীন বিরুদ্ধ পরিবেশ কেটে কেটে চলতে হয়, ইভ টিজিং, প্রতারণা, নানারকম যৌন নির্যাতন, ধর্ষণের শিকার হতে হয়, সেসব মেয়েদের জীবনে ফারাক তো কিছুটা হলেও পড়ে। যখন স্বামী গৃহকর্মির সাথে বিছানা শেয়ার করে, যৌনকর্মিদের কাছে যায়, ধর্ষণ করে, মদ খেয়ে দিন নেই রাত নেই বউ পেটায়, কয়েকটি বিয়ে করে, গার্লফ্রেন্ড নিয়ে সময় কাটায় হোটেলে, বারে, অফিসিয়াল ট্যুরে, সে সকল স্বামীদের স্ত্রীদের মনে প্রশ্ন তো অবশ্যই জাগে।

পুরুষতন্ত্রের নিয়মের চাপে মানসিক, শারীরিকভাবে অত্যাচারিত হতে থাকে দিনের পর দিন যেসব নারী, ধর্ম এবং হাদীসের বৈধতা জানা সত্ত্বেও আমরা জানি যে, এই মানিয়ে চলতে থাকা অনেক নারীও অনেকসময় আর মানিয়ে চলতে পারেন না। ভেতরে খুট খুট করে মনের শান্তি খুঁটে খেতে থাকে বৈষম্যের কাঠঠোকরা। প্রশ্ন জাগে। বিনা প্রশ্নের নিয়মে বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও কিন্তু প্রশ্ন জাগে মনে। মানিয়ে চলা নারীরা বেরুবার পথ খোঁজে। কিন্তু এদের সঠিক পথ, সাহস এবং নিরাপত্তাসহ সাহায্য দেবার জন্যে পরিবার ও বন্ধুর হাতের সংখ্যা খুব কম এগিয়ে আসে তখন।

তখন কোনও নারীবাদীদের লেখা বা একটি বই যদি তারা পড়ে, তাদের ভালো লাগে। তাদের মনে গভীর করে লেখাগুলো দাগ কাটে। নিজের জীবনে সমস্যার উৎপত্তি কোথায়, তা স্পষ্ট হয়। জোর জবরদস্তি করে চাপিয়ে দেয়া যুক্তিহীন নিয়মাবলীর প্রতি যে প্রশ্ন জেগেছিল, তার উত্তর খুঁজে পায়। বৈষম্যগুলোকে চিহ্নিত করতে শেখায়। লেখাগুলো তাদের কনফিউজড মনে বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়ায়। বুকে টেনে নেয়। মানবতাবোধকে জাগ্রত করে। সাহসী করে তোলে। আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে। অসহনীয় অবস্থান থেকে, পরিস্থিতি থেকে, যে যার মতো বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করে। নির্বাণ যাকে বলে, ঠিক সেইরকম। আত্মশুদ্ধি। তাহলে কী করে নারীবাদীরা শুধু সমস্যার কথাই বলেন? সমাধান খুঁজে দেন না?

এ তো গেলো মনের মুক্তি। মানিয়ে চলা নিজের শরীরের সাথে নিজের মনের যে ধন্দ, তার থেকে মুক্তিপ্রাপ্তি। আদর্শগত দিক থেকে একটি সঠিক অবস্থানের সাথে যোগ। ব্যক্তিগত সমাধান। আর সরকারের পক্ষ থেকে আইনগত সমাধান, সে তো ব্যাপক! নারীবাদীরা সেখানে সরকারের সমাজ সংস্কারক ও উপদেষ্টামণ্ডলীর অংশ হবার যোগ্যতা রাখেন মাত্র! আর বাকিটা কাদের হাতে, তা আমাদের সকলের জানা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 762
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    764
    Shares

লেখাটি ১,৩৬৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.