‘ফ্লার্ট’ করার আগে ভাবুন

0

সুমিত রায়:

বহুদিন আগে এক বড় ভাইয়ের একটা স্ট্যাটাস দেখেছিলাম “লুচ্চামি” নিয়ে। সেটায় তিনি বলেছিলেন, সব লুচ্চামি খারাপ না। লুচ্চামি আসলে দুই প্রকার, একটা হলো ভালো লুচ্চামি (নাকি অন্য কোনো শব্দ ব্যবহার করেছিলেন মনে নেই), আরেকটা হলো উত্যক্ত করা…।

ফ্লার্ট এর বাংলা আসলেই লুচ্চামি কিনা এটা নিয়ে একটা আলোচনা হতে পারে। ইংরেজিতে ক্রিপি ফ্লার্টকে খারাপ হিসেবে দেখা হয়, আর নন ক্রিপি ফ্লার্টকে স্বাগত জানানো হয়, সুতরাং ইংরেজিতে ফ্লার্ট হচ্ছে ভালো-খারাপ মিশিয়ে একটা নিরপেক্ষ শব্দ। কিন্তু বাংলায় একে লুচ্চামি বলা যায় কি? লুচ্চামি শব্দটির স্ট্রাকচার আসলে নিরপেক্ষ নয়, এটা এখন নেগেটিভ দিকে চলে গেছে, যা আসলে ইংরেজি ক্রিপি ফ্লার্ট এর মতো, তাই লুচ্চামি করা আর উত্যক্ত করা এই দুটো শব্দ প্রায় কাছাকাছি নেগেটিভ বলা যায়।

অনেকে আবার “টাংকি মারা” শব্দটি ব্যবহার করেন, এই শব্দটা শুনতে অনেকটা স্ল্যাং এর মতো, এটা নিউট্রাল নাকি নেগেটিভ সেটা নিয়ে আমার অবশ্য কনফিউশন আছে। কিন্তু মূলকথা এটাই যে, আমি এখন পর্যন্ত ফ্লার্ট করা শব্দটির ভালো বাংলা খুঁজে পাইনি, যার দ্বারা এরকম নিউট্রাল কিছু বোঝাবে।

অনেকেই একমত হবেন কিনা জানি না, আমার মনে হয়েছে প্রেম, ভালবাসা, যৌনতা, ডেটিং, ফ্লার্ট এই সংক্রান্ত শব্দের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় একটি দৈন্য কাজ করে। প্রেম, ভালবাসা এসব খুব ভালভাবে বাংলায় প্রকাশিত হয়, কিন্তু ফ্লার্ট করা, ডেট করা এরকম শব্দের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় ভালো কোন শব্দ পাই না। যেগুলো আসে সেগুলোও অনেকটা স্ল্যাং এর মতো বা নেগেটিভ ওয়ার্ড হয়।

সস্যুরে, লাঁকার কনসেপ্ট, স্ট্রাকচারালিজম অনুসারে প্রতিটি শব্দের সাথে একটি স্ট্রাকচার যুক্ত থাকে, যা সমাজে সেই শব্দটি সম্পর্কে ধারণাকে রিপ্রেজেন্ট করে। সেপির হোর্ফ হাইপোথিসিস অনুসারে ভাষার সাথে সেই ভাষার মানুষের সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতার সম্পর্ক থাকে যেগুলো ভাষার সীমাবদ্ধতাকে ঠিক করে দেয়। এই হাইপোথিসিস অনুসারে যদি চিন্তা করতে যাই, ডেট করা, ফ্লার্ট করার যথোপযুক্ত বাংলা শব্দ কেন নেই, তাহলে উত্তর আসে বাংলার সংস্কৃতিতে এই শব্দগুলোর কোন পজিটিভ বা নিউট্রাল কনসেপ্ট ছিল না।

খুব বেশিদিন হয়নি যে আমাদের সমাজে বিয়ের আগে প্রেম-ভালবাসা, সম্পর্ক, একে অপরের সাথে দেখা করতে যাওয়া ট্যাবু ছিল। নারীদের বাল্যবিয়ে হতো। এসব কারণে হয়তো এসব শব্দের বাংলা ছিল তুচ্ছার্থে বা নেতিবাচক অর্থেই। সংস্কৃতিতেই যেহেতু বিষয়গুলো ছিল না, তাই ভাষাতেও যে বিষয়গুলো আসবে না তাতো বোঝাই যায়। তো এসব কারণেই ফ্লার্টকে ফ্লার্ট, ক্রিপি ফ্লার্টকে ক্রিপি ফ্লার্ট, আর নন ক্রিপি ফ্লার্টকে নন ক্রিপি ফ্লার্ট হিসেবে লিখেই এই লেখাটা শুরু করছি, কারণ এখানে ফ্লার্ট শব্দটি নেগেটিভ হিসেবে নয়, বরং নিউট্রাল হিসেবেই মিন করা হচ্ছে।

কিছুদিন আগে কিছু কবির আচরণ, ফ্লার্টিং এসব নিয়ে বেশ আলোচনা হয়। কেউ কেউ দেখেছি এদের নরমালাইজড ভেল্যু দিয়ে এদের অনেক ফ্লার্টিভ বিহ্যাভিয়রকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেছেন। আমার কথা ছিল যা নরমাল তাকে কখনই মোরাল চিন্তা করা যায় না, যদি চিন্তা করা হয় তাহলে তা নেচারালিস্টিক ফ্যালাসি বা ইজ-অট প্রবলেমে পড়ে যায়। যা is বা হয় তাকে যে সবসময় ought বা আবশ্যক হতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। তাই নরমালাইজড ভেল্যুর দোহাই দিয়ে কখনই সব ধরনের ফ্লার্টিভ বিহ্যাভিয়রকে জাস্টিফাই করা যায় না, কারণ ফ্লার্ট যদি ক্রিপি হয় তাহলে তা কখনই মোরাল হতে পারে না। তো এধরনের কথা দেখে আমার মনে হয়েছিল কী করলে ফ্লার্ট ক্রিপি হয়ে যায় এবিষয়ক গাইডলাইন টাইপের কিছু লেখালেখি দরকার।

ওয়েস্টার্ন সোসাইটির অনেক ফেমিনিস্টই এসব নিয়ে লেখালেখি করেছেন। অনেকদিন আগে নাইজেরিয়ান আমেরিকান ফেমিনিস্ট Jarune Uwujaren এর এই বিষয়ে একটা লেখা দেখেছিলাম। “The Feminist Guide To Non-Creepy Flirting” শিরোনামে তিনি লেখাটা লিখেছিলেন। ভাবলাম সেটাই নিজের মতো করে অনুবাদ করে, সাথে আমারও কিছু কথা লাগিয়ে পোস্ট করি।

এখানে একটা বিষয় উল্লেখ্য, তাহলো, এটা ফ্লার্ট করার গাইডলাইন হলেও, আর উপরের শিরোনামে “কীভাবে ফ্লার্ট করবেন” লেখা থাকলেও, আসলে এই লেখাটা মূলত “কীভাবে ফ্লার্ট করা যাবে না” এর উপরেই। তাহলে অনুবাদটা পড়া শুরু করা যাক…

**নন-ক্রিপি ফ্লার্টিং সম্পর্কে নারীবাদী সহায়িকা**

কেউই “ক্রিপি” হতে চান না, বিশেষ করে আপনি যে আকর্ষণীয় ব্যক্তির সাথে কথা বলতে চাচ্ছেন, তার কাছে একেবারেই না। ফ্লার্ট করা সমস্যা না, কিন্তু আপনার ফ্লার্ট করা কখনও কখনও যার সাথে ফ্লার্ট করছেন, তার কাছে “ক্রিপি” হয়ে যেতে পারে। আর এক্ষেত্রে আপনার ফ্লার্ট যে ক্রিপি হয়ে যাচ্ছে, তা বোঝার জন্য তার কাছ থেকে “ক্রিপি” বা এ জাতীয় কিছু শোনার অপেক্ষা করতে হবে না। তার কোল্ড শোল্ডার, কুইক স্টেপ বা এধরনের রিজেকশন টাইপ আচরণ বা অঙ্গভঙ্গি দেখেই বুঝে নিতে হয় যে, আপনাকে ইতিমধ্যেই “ক্রিপ” বলে ধরে নেয়া হয়েছে।

তাহলে ক্রিপ বলতে আসলে কী বোঝায়? একজন ক্রিপকে সবসময় কোন এগ্রেসিভ নারসিসিস্টিক জার্ক হতে হবে না, যিনি নারীদের যথেষ্ট পরিমাণে অসম্মান করেন। একজন ক্রিপি ব্যক্তি যেকোনো লিঙ্গের, যেকোনো সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের হতে পারে, যার জেনে বা না জেনে করা কোনো আচরণ অন্য কোনো ব্যক্তির জন্য অনিরাপদ এবং অস্বস্তিকর অনুভূতির সৃষ্টি করে।

ক্রিপি ব্যক্তিমাত্রই কি খারাপ? না, এমনটা বলা যাবে না, কারণ হয়তো তার কোনো কগনিটিভ সমস্যা আছে, বা যার সাথে তিনি ফ্লার্ট করতে চাচ্ছেন, কোনো কারণে তার বডি লেঙ্গুয়েজ বোঝার অবস্থায় নেই, হয়তো তাকে বুঝিয়ে বললে তিনি বিষয়টা বুঝতে পারবেন, কিন্তু যার সাথে ক্রিপি আচরণ করা হচ্ছে, তাকে কেন এতো কিছু চিন্তা বা কেয়ার করতে হবে? তাই তার কাছে, এবং সবার কাছেই এরকম আচরণ করা ব্যক্তিমাত্রই ক্রিপ।

যাই হোক, ক্রিপ আচরণ করা নিশ্চয়ই খুব খারাপ, কিন্তু ফ্লার্ট করা একটি ইতিবাচক সামাজিক প্রক্রিয়া, বিশেষ করে আমরা যদি সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে চয়েস থাকবে এরকম সমাজ আশা করি, তাহলে ভালবাসা তৈরি হবার জন্য ফ্লার্ট করা অবশ্যই একটি ইতিবাচক ফ্যাক্টর। কিন্তু সেটা যাতে ক্রিপি না হয় সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। যাই হোক, সমাজ কর্তৃক সামাজিকীকরণ বা সোশ্যালাইজেশন এবং বিবর্তনগত মানসিক বৈশিষ্ট্যের কারণে পুরুষকেই নারীদের প্রতি বেশি ক্রিপি আচরণ করতে দেখা যায়।

যাইহোক, যারা না জেনে ক্রিপি আচরণ করেন বা করে ফেলেন বলে মনে করেন, এবং ক্রিপি হতে চান না, কিন্তু ফ্লার্ট করতে চান, তাদের অন্তত কিছু বাউন্ডারির কথা মনে রাখা উচিৎ। এই বাউন্ডারিগুলো সামাজিক আচরণে একধরনের অদৃশ্য দরজা হিসেবে কাজ করে। আমরাই সামাজিক আচরণ করার সময় এসব বাঁধার কথা মনে রাখি, কিন্তু ফ্লার্ট করার সময় দেখা যায় অনেকেই এধরনের দরজার কথা খেয়াল রাখতে পারেন না। সেটা আমাদের সোশিওবায়োলজিক্যাল কারণে হতে পারে, সমাজে দুই লিঙ্গের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্কের একটা বড় অভাবের কারণে হতে পারে, আবার ফ্লার্ট শব্দটার সাথে যে নেগেটিভ স্ট্রাকচারটা জড়িয়ে আছে, তার কারণে অনেকেই হয়তো ক্রিপি ফ্লার্টের সাথে নন-ক্রিপি ফ্লার্টের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেন না, সেটাও হতে পারে।

যাই হোক, যারা বিভিন্ন কারণে ফ্লার্ট করার ক্ষেত্রে এইসব অদৃশ্য দরজা ঠাহর করতে পারেন না, এবং ক্রিপি ফ্লার্ট আর নন-ক্রিপি ফ্লার্টের মধ্যে তফাৎ বুঝতে পারেন না, তাদের জন্য একটা গাইড লাইন দেয়া হচ্ছে:

১। তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ পড়ুন:

ধরুন ট্রেনে একজন নারী হেডফোন কানে দিয়ে একটা বই পড়ছেন। এটাই একটা পরিষ্কার সিগনাল দিচ্ছে যে, তিনি একা থাকতে চান। কিন্তু আপনি তার সাথে ফ্রেন্ডলি হবার জন্য, তার দিকে এপ্রোচ করলেন এবং একটা কনভারসেশন শুরু করতে চাইলেন। তিনি যেহেতু একটা কিছুতে ব্যস্ত, তাই তাকে আপনি কেবল বলতে পারেন, “আমি আপনার সাথে কিছু কথা বলতে চাই, কিন্তু বিরক্ত করতে চাই না। আমরা কি একটু চ্যাট করতে পারি?” এটা বললে আপনি ক্রিপি টেরিটরিতে প্রবেশ করবেন না, কারণ আপনি কেবল তাকে জিজ্ঞেস করেছেন, এবং বাড়তি কিছু ধরে নেননি। কিন্তু যদি দেখেন তিনি বারবার কথোপকথন থেকে বের হয়ে আসতে চাচ্ছেন, এবং আই কনটাক্ট থেকে বিরত থাকছেন, তাহলে বুঝতে হবে তিনি একা থাকতে চাইছেন। এক্ষেত্রে আপনার কন্টিনিউ করার চেষ্টা করাটা ক্রিপি হয়ে যাবে।

নারীরা বেশিরভাগ সময়ই তাদের সর্বোত্তমটা দিয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করে যে, তারা কথা বলতে আগ্রহী নন, এবং বিরক্তবোধ করছেন। তিনি গোমড়া মুখ করে আপনার সাথে কথা বলতে পারেন, কাজ করতে পারেন। পরিচিত কেউ তাকে হাসতে বলতে পারেন, কিন্তু অপরিচিত কেউ এরকম বললে এটা মিন করে যে, তিনি তার এপিয়ারেন্সকে তিনি কি ফিল করেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাবছেন। এসবও ক্রিপি টেরিটরিতে চলে যায়। আবার একজন নারী কেবল নম্রভাবে আচরণ করার জন্য কিংবা নারভাসনেস বা ভয় থেকেও হাসতে পারে। তাই আবার হাসিকেও আগ্রহের চিহ্ন হিসেবে নেয়া ঠিক নয়। আর তাই হাসি বা অন্য কিছু নয়, বডি ল্যাংগুয়েজেই নিজের সীমারেখাটা ঠিক করা উচিৎ।

এখন আপনি বলতে পারেন, এতো কিছু না করে সেই নারী তো সরাসরি মুখের উপর কথা বলতে আগ্রহী নয় বলে দিলেই পারে। হ্যাঁ, অনেকেই তা করে, কিন্তু সমস্যা হলো এভাবে মুখের উপর না বলে অনেকেই বলা শুরু করে যে, ‘মেয়েটা বেশি ভাব নেয়’, ‘বেশি দেমাগ’, আবার অনেকেই এভাবে মুখের উপর না বলাকেও পছন্দ করেন না, আবার অনেকে দেখা যায়, হতভম্ব হয়ে বা কিছু বুঝতে না পেরে বা প্রথমে ইন্টারেস্ট বোধ করায় আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়, কিন্তু পরে খারাপ লাগলে আর না বলতে পারেন না। এছাড়া অন্যান্য অনেক কারণও থাকতে পারে। তাই যিনি আলাপ শুরু করছেন তারই বডি ল্যাংগুয়েজ বুঝে নিজের সীমারেখা বুঝে নিতে হয়।

২। তিনি কী বলছেন তা ভালো করে শুনুন:

আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাওয়া যাক। ট্রেনের সেই নারী তার বই পড়ছেন এবং আপনি তার সাথে কথা বলার জন্য এগোলেন। তিনি একটু হাসলেন, তার হেডফোন খুললেন এবং আপনাদের মাঝে একটি ছোটো, কিন্তু ভালো আলাপ হলো। আপনি তার ফোন নাম্বার জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি বিনীতভাবে তা প্রত্যাখ্যান করলেন।

আপনি যদি নন ক্রিপি ব্যক্তি হোন, এই প্রত্যাখ্যানকে স্বীকার করবেন, এবং চলে যাবেন। কিন্তু যদি আপনি একজন ক্রিপি ব্যক্তি হন, তাহলে এই সিগনালকে আপনি ভুলভাবে নেবেন। আপনি ধরে নেবেন, মেয়েটি যেহেতু আপনার প্রতি খুব ভালো বডি ল্যাংগুয়েজ দেখিয়েছেন এবং আপনার সাথে খুব ভালো আলাপ-আলোচনা করেছেন, তাই তিনি আপনার প্রতি আগ্রহী। এই অবস্থায় যদি আপনি তার প্রত্যাখ্যান শোনার পরেও তার ইতিবাচক উত্তরের আশায় বারবার তার ফোন নাম্বার চাইতে থাকেন বা মনে করেন, তার ইতিবাচক বডি ল্যাংগুয়েজ এবং কথা বলাকে ব্যবহার করা যায়, তাহলে আপনি ক্রিপি টেরিটরিতে ঢুকে যাবেন।

ফোন নাম্বার চাওয়াটা একটা উদাহরণ ছিল, মেয়েটি আপনার চাওয়া অনেক কিছুই নাও দিতে পারেন। যদি আপনি ক্রিপি না হতে চান, তাহলে এটা করবেন না। “না মানে, না”, NO MEANS NO এই কথাটা অনেক জায়গাতেই প্রযোজ্য, এর মধ্যে এটাও একটি। যদি কেউ তার কোনো কথার দ্বারা একটা পরিষ্কার বাউন্ডারি তৈরি করে দেয়, তাহলে এটাকে রেসপেক্ট করা বা সম্মান দেয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।

একটি পরিষ্কার প্রত্যাখ্যানের অর্থ হচ্ছে একটি সীমারেখা, যা বলে এর বেশি আর আগানো যাবে না, এটা এমনকি তার বেলাতেও সত্য যিনি আপনাকে আসলেই পছন্দ করেছেন, কিন্তু আপনার সাথে কোনো কারণে সম্পর্ক তৈরি করতে ইচ্ছুক নয় বলে ফোন নাম্বার বা অন্য কোনো তথ্য দিতে চাচ্ছেন না। এমনকি এটা মনে করারও কোনো কারণ নেই যে তিনি আপনাকে ঝুলিয়ে রাখছেন। আপনাদের মাঝে কেবল একটা ভালো কনভারসেশন হয়েছে বলে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, তিনি আপনার সাথে ডেট করতে চান, আর আপনার কাছে তার ফোন নাম্বার বা অন্য কোনো তথ্য পাওনা হয়ে গেছে, বা আপনি এগুলো দাবি বা আশা করতে পারেন।

৩। তার দিকে তাকিয়ে থাকবেন না, বা তাকে ফলো করবেন না, এটা ভীতিকর:

ধরুন ট্রেনের সেই নারী বই পড়ছেন এবং আপনি ভাবছেন যে তার দিকে এগোবেন। আপনি এটা করার জন্য সাহস সঞ্চয় করছেন, কিন্তু এটা করার সময় দেখলেন আপনি মনের অজান্তেই তার দিকে তাকিয়ে আছেন। বিষয়টি তিনি লক্ষ্য করলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে দৃশ্যমানভাবেই আপনার এই দৃষ্টি কিরকম অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।

এটাকে আপনার খুব সরল একটা ভুল মনে হতে পারে, কিন্তু মনে হয় না, যদি আসলেই তিনি আপনার এই দৃষ্টিতে অস্বস্তিবোধ করেন (যার সম্ভাবনাই সব থেকে বেশি) তাহলে তিনি আর আপনার সাথে কথা বলতে আগ্রহী হবেন। আপনি বরং এক্ষেত্রে দৃষ্টি সরিয়ে অন্যদিকে মনোযোগ দিন। কিন্তু এই যাত্রায় আর না হলেও পরের বার থেকে নিশ্চই কোন স্ট্রেঞ্জারের দিকে এপ্রোচ করার পূর্বে নিজের দৃষ্টির ব্যাপারে সচেতন থাকবেন।

অনেকক্ষণ ধরে অন্যের দৃষ্টিতে থাকা সকলের জন্যই দুশ্চিন্তার এবং অনিরাপত্তার, কারণ আমরা কেউই মাইন্ড রিড করতে পারি না। আর এও জানি না, যে আমার দিকে তাকিয়ে থাকা ওই লোকটি আমাকে ফলো করা বা অন্য কিছু করার কথা ভাবছেন কিনা। বলতে পারেন, যার মাথায় এতো প্ল্যান থাকবে সে নিশ্চয়ই এভাবে বোকার মতো তাকিয়ে থাকবে না, তাই দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু মেয়েটিকে এতো গভীরে গিয়েই বা চিন্তা করতে হবে কেন?

একই কারণে কাউকে ফলো করাটাও ক্রিপি। ওই ট্রেনে বই পড়া নারীর উদাহরণ দিয়েই বলা যাক। আপনি এবারে বরং তার থেকে যথেষ্ট দূরে রয়েছেন। আর এরপর আপনি সন্দেহজনকভাবে তার কাছাকাছি এসে বসলেন। যদি মেয়েটি আশপাশ সম্পর্কে একটু নজর রাখে, তাহলে আপনার এই আচরণটি যথেষ্ট সন্দেহ এবং ভয়ের উদ্রেক করতে পারে, আর এক্ষেত্রে তার প্রতি এপ্রোচ করার পর প্রত্যাখ্যাত হবার সম্ভাবনাই বেশি হয়ে যাবে।

একই জিনিস কোনো রাস্তায়, পার্টিতে, ক্লাবে বা যেকোনো জায়গায় থাকা নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যদি আপনি অনেক দূরে থাকা কোনো নারীর প্রতি এপ্রোচ করেন, তাহলে আগে তার এটেনশন আদায় করুন, এবং নিজের ইনটেনশনকে ক্লিয়ার করুন। আপনি সন্দেহজনকভাবে তাকে ফলো করছেন- তার উপর এরকম অনুভূতি চাপানোর কোনো প্রয়োজন নেই।

৪। এটা ধরে নেবার কোনো কারণ নেই যে আপনি তার প্রতি সম্মান দিচ্ছেন বলে তাকে আপনাকে পছন্দ করতে হবে:

আপনি যদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পূর্বের তিনটি নিয়মই পালন করেন, সেই নারীর প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল হন, তার বাউন্ডারিগুলোকে শ্রদ্ধা করেন, তাকিয়ে থাকা, ক্যাটকলিং এসব এড়িয়ে যান – তাহলে আপনি রাইট ট্র্যাকেই আছেন। কিন্তু এরকম আশা করার কোনো কারণ নেই যে, আপনি কোন নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েছেন বলেই তাকেও আপনার ডাকে সাড়া দেবে, আপনার প্রতি ইমপ্রেসড হবে।

শ্রদ্ধা আশা করা একটি মৌলিক মানবাধিকারের মতো। আমরা সবাই আশা করি যে আমাদেরকে অন্যেরা যথেষ্ট শ্রদ্ধার চোখেই দেখবে, এটা আমাদের সকলের পাওনারই মতো। (এখানে প্রশংসা বা অন্য কিছু চাওয়া হচ্ছে না, পূর্বে যেগুলো বলা হয়েছে সেগুলো মানলে, নারীর বাউন্ডারিগুলো নিয়ে সচেতন থাকলেই মোটামুটি শ্রদ্ধাশীল হওয়া যায়, এটাই সবাই আশা করে) আর তাই আপনি যদি সেই প্রাপ্য বস্তুটিই নারীকে দেন, তাহলে এর জন্য যে নারীকে বিমোহিত হয়ে আপনাকে সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তি হবার পরও আপনি প্রত্যাখ্যাত হতে পারেন।

এর অর্থ কি এই যে যারা নারীকে সম্মান দেয় তাদেরকে নারীরা ঘৃণা করে? না, এর অর্থ শুধু এই যে যারা নারীকে একজন মানুষ হিসেবে মূল্যায়িত করেন তাদের সবার প্রতি একজন নারীর প্রেমগত আকর্ষণ তৈরি হয় না। তাই শ্রদ্ধাশীল হওয়াকে, সম্মান দেয়াকে নারীকে সিডিউস করার বা ম্যানিপুলেট করার বা বিমোহিত করার একটি নতুন উপায় হিসেবে ভাবার কিছু নেই, এটা একটি সাধারণ ভদ্রতা।

৫। এটা ধরে নেবেন না যে জনসম্মুখে তাকে আকর্ষণীয় লাগছে বলে তিনি আপনার মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাচ্ছেন।
এমন কোনো কথা নেই যে, যেসব নারী ভারি মেকাপ, হিল জুতা, এবং অন্যান্য “সেক্সুয়ালাইজড” পোশাক পরেন তারা আশেপাশের সব পুরুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চান। আর যদি তিনি তা চানও, এর মানে এই নয় যে তার সাথে কম শ্রদ্ধার সঙ্গে বা কম সম্মান দিয়ে আচরণ করতে হবে।

এটা খুব সাধারণ ভুল ধারণা যে নারীরা কেবলমাত্র পুরুষদেরকে আকর্ষণ করতেই সাজগোজ করেন। কিন্তু ব্যাপারটা কখনই এতো সরল হয় না। গবেষণায় দেখা গেছে নারীর সাজগোজের ক্ষেত্রে পুরুষকে আকর্ষণ করার চাইতেও নিজেদের সামাজিক মর্যাদা বা সোশ্যাল স্ট্যাটাস প্রকাশ করা, অন্যান্য নারীকে দেখানো, আত্মবিশ্বাস অর্জন করা- এগুলোর প্রভাবই বেশি থাকে। এছাড়া একজন নারী এজন্যও সাজতে পারেন কারণ এই সাজগোজের কারণে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, আবার এমনও হতে পারে তিনি কেবল একজন বিশেষ মানুষকে আকৃষ্ট করতেই এই সাজগোজ করেছেন যিনি আপনি নন, আবার এও হতে পারে যে তিনি সাজগোজ করেন কারণ এতে তাকে সুন্দর দেখায়। মোট কথা হলো, আপনি কখনই জানতে পারবেন না যে একজন নারী যে পোশাক পরেছেন, তা কেন পরেছেন বা যেভাবে সেজেছেন সেটার কারণ কী। যাই হোক, কোন ব্যক্তির মোটিফ কী সেটা নিয়ে কখনই কোনো এজাম্পশন তৈরি করতে যাবেন না, কারণ আপনি আসলেই তা জানেন না।

৬। যদি আপনি তার দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হোন, তাহলে তা ব্যক্তিগতভাবে নেবেন না:

আপনি যদি কোন নারীর দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হোন বা তিনি যদি আপনার সাথে, তাহলে এর কারণ হতে পারে তিনি ব্যক্তিগতভাবে আপনার প্রতি আকৃষ্ট হননি। আবার এও হতে পারে, আপনাকে প্রত্যাখ্যান করার পেছনে এমন কোনো কারণ কাজ করেছে যার সাথে আপনার কোনো সম্পর্কই নেই।

অনেক পুরুষই আছে যারা একজন নারীর দেয়া সময়, মনোযোগ এবং তার শরীরের কারণে তার উপর আকর্ষণ বোধ করেন, কিন্তু সেই নারীর অনুভূতি সম্পর্কে তাদের কোনো মাথাব্যাথাই থাকে না। কোনো নারীকে যদি প্রতিদিন এরকম লোকজনের সাথেই ডিল করতে হয়, বা এরকম লোকজনের মধ্যেই থাকতে হয়, তাহলে এর প্রভাবে কিছু নারী যেকোনো ধরনের হয়রানি এড়িয়ে চলতে সবসময়ই নিরুৎসাহিত মুখভঙ্গি ও মনোভাব ধারণ করতে পারেন এবং আপনি যদি তার সাথে কথা বলতেও যান, তখন কিছু না ভেবেই মুখ ফিরিয়েও নিতে পারেন।

সেই ট্রেনের মেয়েটির কথাই ধরুন। প্রতিদিন সেই মেয়েটিকে ট্রেনে করে কোন কাজের উদ্দেশ্যে যেতে হয়। যাত্রাপথে তাকে অচেনা ব্যক্তিদের কাছ থেকে তার পোশাক, চালচলন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য শুনতে হয়। আর এগুলোকে এড়িয়ে চলার জন্য তিনি প্রতিদিনই ট্রেনে উঠে কানে হেডফোন দিয়ে রাখেন, বা বসে কোনো বই পড়েন। তো এরকমই একটি সময়ে মেয়েটি যখন কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছিল, বা কোন বই পড়ছিল তখন যদি আপনি তার সাথে কথা বলতে যান, তখন তার পক্ষে আপনার দিকে না তাকিয়েই দূরে সরে যাওয়াটা বা আপনাকে একেবারেই পাত্তা না দেয়াটা অস্বাভাবিক হবে না।

একথা প্রথমে মাথায় আসতেই পারে যে, মেয়েটি আপনার উপর অন্যায় করছে বা অবজ্ঞা করছে। কিন্তু এটার সম্ভাবনাই এখানে বেশি যে, এই হেডফোন বা বই এবং এরকম আচরণের কারণেই তার পক্ষে শান্তিতে ট্রেন ভ্রমণ সম্ভব হয়। এমন নয় যে, তিনি আপনাকে কোনো ভয়ঙ্কর ব্যক্তি বা সম্ভাব্য ধর্ষক বলে ভাবছেন- এর অর্থ এটাও হতে পারে যে আপনি তার সাথে এমন স্থানে বা এমন পরিস্থিতিতে কথা বলতে চাইছেন, যেখানে তিনি নিরাপদ বোধ করেন না।

সুতরাং আপনার উদ্দেশ্য যদি মন্দ নাও হয়, যদি আপনি যদি শ্রদ্ধাশীলও হোন তবুও এরকম প্রত্যাখ্যান বা কোল্ড শোল্ডারকে ব্যক্তিগতভাবে নেবেন না। আপনি এরকম হোন বা না হোন, দুনিয়াতে অনেক ক্রিপ ব্যক্তি আছেন, যাদের থেকে মেয়েটিকে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 714
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    717
    Shares

লেখাটি ৪,৩৮৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.