স্পাউস যখন ৯৯% ভালো

0

বৈশালী রহমান:

এই ৯৯% ভালো কথাটা আসলে এসেছে একটা কৌতুক থেকে। এক মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। মেয়ের পরিবার থেকে যখন পাত্রের খোঁজখবর নেওয়া হলো তখন পাত্রের পরিচিত একজন বললেন, ছেলে ৯৯% ভালো, খালি একটু চরিত্রদোষ আছে। রাস্তাঘাটে মেয়েছেলে দেখলে নিজেরে সামলাতে পারে না। নাহলে আর কোনো সমস্যা নাই। বলাই বাহুল্য, পাত্রীর পরিবার ওই ৯৯% ভালো ছেলেটির সাথে মেয়ের সম্বন্ধ করেন নাই।

কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য, আজকাল অনেক মেয়েই এ ধরনের ৯৯% “ভালো ছেলে”দের সাথে সংসার করতে দ্বিধাবোধ করেন না। স্বামী অত্যাচারী হোক, তবু স্ত্রীকে ডিনারে নিয়ে যায়, চড় মারলে কী হবে, সোনার গয়না কিনে দেয়, অতএব ছেলে ৯৯% ভালো। অভিভাবকদেরও তেমন কোনো সমস্যা থাকে না এতে। হাজার হোক, সোনার চামচ বাঁকাও ভালো। এখন চলুন, এরকম ৯৯% “ভালো ছেলে”দের সাথে কাটানো সংসারজীবনের কিছু চিত্র দেখা যাক।

ঘটনা ১: আমার এক অতি ঘনিষ্ঠ বান্ধবী বিবাহিত জীবনের প্রথম দিন থেকেই ম্যারিটাল রেপের শিকার। বর বাবাজীর আবার স্ত্রীর শরীর সুস্থ না অসুস্থ সেকথা ভাবার অবকাশই নাই। কাবিনের টাকা দিয়ে শরীরটা যখন কিনেই নিয়েছেন, তখন সেটার ওপর অধিকার তাঁরই। স্ত্রীর কোনো অধিকার নাই, এই তাঁর মনোভাব। গর্ভবতী অবস্থায়ও দিনে চার পাঁচ বার এরকম অত্যাচার চালানোর ফলে গর্ভ নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

তো সেই মেয়েকে বললাম, এই জানোয়ারের সাথে ঘর করছিস কেন? সে জবাব দিলো, কী করবো বল্? মা বাবা তো মানতে চায় না। সবাই বলে “স্বামী” রা এরকম করেই থাকে। তাদের চাহিদা আছে, অধিকার আছে, সে কি সেই অধিকার ছেড়ে দেবে? আমিও বা কোথায় যাবো বাসা থেকে বের হয়ে। পড়াশোনা তো করিনি তেমন, চাকরিও করি না। মা বাবাও শেল্টার দিবে না যদি ঘর ছাড়ি। মানে, ব্যাপারটা বুঝেছেন তো? মেয়ের জামাই ৯৯% ভালো, খালি একটু নিজের বউরে ধর্ষণ করার বদভ্যাস আছে। শুধুমাত্র এই কারণে কি এতো “ভালো ছেলে”র ঘর হতে মেয়েকে বের হতে বলা যায়! ছি: ছি: লোকে বলবে কী?

ঘটনা ২: একজন সিনিয়র আপা আছেন। শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা এবং ভালো চাকরি করেন। ইনার ৯৯% ভালো মধযবয়স্ক স্বামীটিও বেশ আবৃত্তি, বিতর্ক টিতর্ক করেন। অত্যন্ত উদারমনা। বউ বাচ্চাদের প্রচুর কোয়ালিটি টাইম দেন। খালি এক পার্সেন্ট খারাপের মধ্যে একটু বাসার সাহায্যকারীদের, অর্থাৎ যেসব কিশোরী মেয়েরা অভাবের তাড়নায় তাঁর বাড়িতে কাজ করতে আসে, তাদের গায়ে একটু হাত টাত দেন আরকি। আর মেয়েগুলোও বোকা। জন্ম থেকেই তো এইসব “ছোটোলোকের মাইয়ার” (আমার না, ওই আপার মুখের ভাষা) পিল খাওয়ার দরকার। সেটা খায় না বলে তারা কেমনে কেমনে জানি গায়েবী তরিকায় প্রেগনেন্ট হয়ে যায়। এই আপাও তার ৯৯% ভালো “সোয়ামি” ছাড়বেন না। আরে বাবা, পুরুষ মানুষের দুই একটা চরিত্রদোষ থাকেই। টাকা তো কামায়, বউ বাচ্চারে তো ঘুরতে নিয়ে যায়। তাহলে শুধু ওই ১% চরিত্রদোষের জন্য ছেলেমেয়েদের পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করে লাভ আছে? এই হলো ওই আপার বক্তব্য।

ঘটনা ৩: এই ঘটনাও চোখে দেখা। এক অসম্ভব ভদ্র, নম্র এবং সুদর্শন তরুণের স্ত্রীর কাছে শুনলাম, ছেলের নাকি একটু “বেপাড়ায়” যাওয়ার অভ্যাস আছে। শুধু তাই নয়, রেগে গেলে তিনি নিজ স্ত্রীকে চড়থাপ্পড় মারেন এবং স্ত্রীকে “খানকি মাগী” বলে সম্বোধন করেন এবং তার মা বোনের সাথে যৌনসঙ্গমের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এই মেয়েকেও বললাম যে বোন, একা থাকতে যদি তোমার সমস্যা হয়, তবে দুনিয়ায় পুরুষের অভাব নাই যে এই শুয়োরশাবকের পায়ের তলায় তোমারে পড়ে থাকতে হবে। তো “শাবানা ভাবী” উত্তর দিলেন, “রাগের সময় মারে ঠিক কিন্তু রাগ কমলেই ফুল চকোলেট নিয়ে সরি বলতে আসে। রাগের সময় কী করে এইটা দেখে কি সংসার ভাঙা ঠিক হবে?” খুব বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, “তা রাগ-টাগ তো তোমার শরীরেও আছে বাপু, তুমিও একদিন রাগের মাথায় দুই ঘা জুতোর বাড়ি দিয়েই দেখো না, পরে না হয় সরি বলে দিও। দেখো তোমার ৯৯% ভালো স্বামীটি জুতার বাড়ি খাওয়ার পরেও সংসার করতে পারে কিনা।” বললাম না আর। এমনিতেই বাল্যশিক্ষাও না পড়া অপগণ্ডগুলা আজকাল “কিটিছাগী” না কী যেন বলে বেড়াচ্ছে।

এতো কথা বলার উদ্দেশ্য একটাই। আমার প্রিয় “চিরন্তন বাঙালি বধূরা” এবং তাদের মা বাপেরা যেন বোঝে যে একজন এবিউজারের কোনো ভালো আচরণ দিয়েই তার সেই এবিউসিভ আচরণ জাস্টিফাই করা যায় না। আপনার স্পাউস আপনারে রেডিসন ব্লুতে নিয়ে এক সন্ধ্যায় পনের হাজার টাকা খরচ করে, এদিকে আপনের মা বাবারে ২০০০ টাকার কাপড় কিনে দিলে গাল ফুলায়? গালিগালাজ করে? তবে অবশ্যই আপনি একজন এবিউজার এর সাথে সংসার করছেন।

আপনার স্পাউস আপনারে এনিভার্সারিতে হীরার নেকলেস কিনে দেয়, দেশের বাইরে বেড়াতে নিয়ে যায়, কিন্তু তার অনুমতি ছাড়া আপনার বাড়ির বাইরে পা দেওয়া নিষেধ? তার ইচ্ছায় পড়াশোনা, ক্যারিয়ার বাদ দিয়ে তার এবং তার বাপ মা চৌদ্দগুষ্টির দাসত্ব করে আপনার দিন কাটে? তবে কনগ্র্যাচুলেশনস্। আপনি একজন এবিউজার এর সাথে বাস করছেন।

আপনার স্পাউস আপনার প্রেমে গদগদ, বার্থডে, এনিভার্সারিতে ফুল, গিফ্ট দিয়ে উড়িয়ে ফেলে, আপনার মা বাপকে দুইবেলা সালাম করে। এইদিকে সে তার সুন্দরী কলিগের প্রমোশন পাওয়া নিয়ে তার নামে কুকথা ছড়িয়ে বেড়ায়? পর্দা ছাড়া মেয়েরা রাস্তায় বের হলে তারে ধর্ষণ করাই উচিত এই জাতীয় ফতোয়া দেয়? অন্য মেয়েদের ইনবক্সে গিয়ে নগ্ন ছবি পাঠানোর বা বিছানায় যাওয়ার প্রস্তাব দেয়? তবে আপনি একজন লম্পট, এবিউজার এবং হবু ধর্ষকের সাথে বাস করছেন।

এখন আপনি বলতে পারেন, আমার জামাই আমারে মারুক, কাটুক, অন্য মেয়েদের হ্যারাস করুক, নারীদের অর্ধ মানুষ ভাবুক, আমি সহ্য করে থাকতে পারলে বৈশালীর এইখানে ফটফটানোর দরকার কী? আমার বক্তব্য হচ্ছে না, আপনি যদি মাইরটারে বা “সোয়ামির প্রভুত্বরে” “ভালোবাসার বহি:প্রকাশ” হিসেবে নেন তবে আমি আপনারে বড়োজোর রামছাগল বলতে পারি, এর চেয়ে বেশি কিছু করার “অধিকার” আমার নাই। কিন্তু এতো কিছু সহ্য করে যখন ওই সংসার করেনই, তখন অন্তত স্পাউস যে লম্পট, অত্যাচারী, এইটা স্বীকার করার সৎ সাহসটা রাখেন।

“ও আমাকে রাগের মাথায় মারলে কী হবে, রাগ কমলে চুম্মা তো দেয়, মাঝরাতে কাজের মেয়েরে রেপ করলে কী হবে, শেষ রাতে তো আমার সাথে ঘুমায়। পড়াশোনা চাকরি করতে না দিলে কী হবে, ভ্যাকেশনে তো সুইজারল্যান্ড নিয়ে যায়” এইসব জোকারি কথাবার্তা বলে লোক হাসাইয়েন না।

তাহলে বিষয়টা অনেকটা “ছেলে ৯৯% ভালো, শুধু একটু আলুর দোষ আছে” কৌতুকের মতো হয়ে যায়। বুঝা গেছে ব্যাপারটা? 

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 737
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    741
    Shares

লেখাটি ৩,১৫৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.