পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতিটি নারীই আসলে ‘বেশ্যা’

0

জিনিয়া চৌধুরী:

সাধ করে সংসার করতে আসা মেয়েটি কখন যে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে নিজের অজান্তে, আর প্রতিটি নির্ভরশীলতাই তখন হয়ে উঠে এক একটি গল্প।

তিনটি চেয়ারে পাশাপাশি বসা তিনটি মানুষ। যার দুজন নারী, একজন পুরুষ। নিজের সমস্যা নিয়ে বিব্রত মেয়েটি যখন নড়েচড়ে বসছে, ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের চেয়ারের নারীটি তার কাছে ফিসফিস করে জানতে চায়, আপা, আপনি কী সমস্যা নিয়ে এসেছেন?

ভদ্রমহিলা আস্তে করে বলে, “আমার পারিবারিক সমস্যা, স্বামী পরকীয়ায় আক্রান্ত, তার ফেসবুকে যৌন আলাপনের কিছু আলামত সংগ্রহ করার পর আমার আর সংসার করার কোনো ইচ্ছে নেই তার সাথে,আপনার?
অপর ভদ্রমহিলা তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আমার এটা দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথমবারেও কিছু সমস্যার কারণে সম্পর্কটা ভেঙ্গে যাওয়ার পর ইন্টারনেটভিত্তিক বিবাহ সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে গিয়ে তার বর্তমান হাজব্যান্ডের সাথে পরিচয়। ছয় মাস প্রেম, তারপর বিয়ে। ঐ লোকেরও আগে বিয়ে হয়েছিলো, সেখানে তার একটা সন্তান। সেটা জেনেও ভদ্রমহিলা তার পারিবারিক সম্মতি ছাড়াই এই লোককে বিয়ে করেন।

এখন বিয়ের দেড় বছরের মাথায় এসে লোকটির মনে হচ্ছে, সে আর সংসার করতে চায় না। তাকে আর তার ভালো লাগছে না। ভালো না লাগার স্পেসিফিক কোনো কারণ নেই। পেশায় তার স্বামী একজন উচ্চপদস্থ ব্যাংক কর্মকর্তা, নারীটি একজন ডাক্তার। রাত ১০-১১টা নাগাদ তাকে হাসপাতালের গাড়ি ছাড়তে আসে, সে ওপরে উঠার পর ভদ্রলোক স্বামী তাকে বলে, ‘বেশ্যাবৃত্তি করে আসলি?’

তাকে পরামর্শ দেয়ার কী আছে গৃহিণী পরনির্ভরশীল নারীটা তা জানে না। সে শুধু অবাক হয়ে ভাবে, একজন আত্মনির্ভরশীল নারীকেও এই গালি শুনতে হয়? এই গালিটা তাকেও তো কতোবার শুনতে হয়েছে, যদিও তাকে স্বামী ছাড়া আজ অব্দি কোনও পুরুষ ছোঁয়নি। সে তার মতো করে অপরজনকে পরামর্শ দেয়। বলে, তাকে ছেড়ে দিতে।

ডাক্তার নারীটি তার কাজ ছেড়ে দিতে চায়, কারণ সে স্বামী চায়, চায় একটা সংসার। সে নির্ভরশীল হয়ে বাঁচতে চায় স্বামীর উপর, তাতেও স্বামীর সমস্যা। স্বামী লোকটা আবার চায় না ‘উপার্জনহীন বৌ’ পালতে। ভদ্রমহিলা যে আইনজীবীর কাছে পরামর্শ নিতে যান, তিনিও তাকে ঐ লোককে ছেড়ে স্বাধীনভাবে বাঁচার পরামর্শ দেন। কিন্তু ঐ ডাক্তার নারীটির একটাই কথা, তিনি সংসার করতে চান ঐ লোকের সাথে। লোকটি যা বলবেন, তিনি তাই শুনবেন, তিনি কেবল একটি সন্তান চান। একখানা সংসার চান, সম্ভবত তৃতীয় কোনও পুরুষ পরীক্ষা করতে আর রাজী নন তিনি। কারণ তিনি হয়তো জেনে গেছেন, এ সমাজে পুরুষহীন বাঁচাও মৃত্যুর নামান্তর।

গৃহবধূ ভদ্রমহিলাটি এবার নিজে আইন পরামর্শের জন্য বসেন, তার আইনজীবী ভদ্রমহিলাটি তাকে তার পাশের চেয়ারে বসা ভদ্রলোকটিকে দেখিয়ে বলেন, এই যে লোকটিকে দেখছেন, তিনি তার অসামান্য রুপসী স্ত্রী এবং এক বাচ্চাকে রেখে বেশ্যাগমন করতেন। স্ত্রী বাধা দিতে গেলে স্ত্রীকেও তার বেশ্যা সংক্রান্ত গালির সম্মুখীন হতে হয়। মেনে নিতে শিখতে শিখতে একসময় স্ত্রী জানতে পারেন, লোকটি অন্য এক নারীকে বিয়েও করেছেন তার অগোচরে, এবং সেখানেও সে এক সন্তান উৎপাদন করেছেন। এবার প্রথম স্ত্রী আইনের দ্বারস্থ হলে স্বামী বেচারার হুঁশ ফেরে। তিনি ক্ষমা চান এবং সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দিয়ে প্রথমার কাছে ফিরতে চান। তার অপরাধের তুলনায় গৃহিণী ভদ্রমহিলার স্বামীর অপরাধটি নাকি নিতান্তই গৌণ।

আজ সকালে আমার রান্নায় সাহায্যকারী মেয়েটি তার এক বছরের শিশুটিকে কোলে নিয়ে এসে হাজির। তার স্বামী তাকে বেদম মারপিট করেছে। তার অপরাধ সে ভাত কাপড়ের নিশ্চয়তার জন্য আমার বাসায় সকালে রান্না করতে আসার জন্য ঘন্টা দুয়েকের জন্য তার সন্তানকে বাবার কাছে রেখে আসে। সে ভদ্রলোক যে কিনা পেশায় রিকশা চালক–যে কিনা একদিন রিকশা চালালে তিনদিন বিছানায় শুয়ে কাটায়, সে তার বাচ্চাটিকে দু-ঘন্টা সামলাতে রাজী নয়।
তার শর্ত কাজ করতে হলে বৌকে বাচ্চা নিয়ে যেতে হবে, নয়তো এমন ‘বেশ্যাগিরির কাজ’ বৌ করতে পারবে না।

অবাক হয়ে মার খেয়ে আসা মেয়েটার মুখের দিকে তাকালাম। তার স্বামী জানে মেয়েটা কী কাজ করে, কোথায় কাজ করে। তাকে পরামর্শ দিলাম -বললাম, ছেড়ে দাও এমন স্বামীকে। তার জবাব-আপা দুইটা বাচ্চা। ছেড়ে দিলে ঐ লোক আবার বিয়ে করবে, আমার বাচ্চা দুইটা এতিম হয়ে কেমন করে বাঁচবে? তার তো বউ হবে, আমার বাচ্চা দুটোর কী হবে? আর এতো ছোট বাচ্চাসহ আমাকে কেউ কাজে রাখবে না। দুটো বাচ্চাসহ আমাকে কেউ গ্রহণও করবে না।

বললাম, সে যখন তোমাকে মারবে, তুমিও তাকে প্রত্যাঘাত করো, ফিরিয়ে দাও সেই মার। সে বললো, তা হয় না আপা, স্বামীর গায়ে হাত তোলাটা পাপ। গুনাহ হবে। সোয়াবের এমন হাস্যকর চেষ্টাকে আমার আর বলার কিছু ছিল না। সে তার স্বামীর গুণগান করলো, সে লোক আগে বেশ্যাগমন করতো, নামায-রোযা করে বৌ তাকে সে পথ থেকে ফিরিয়ে আনে। এখন তার নুতন নেশা হয়েছে, মোবাইলে খারাপ ভিডিও দেখে। ‘তবুও ভালো, খারাপ বেডীদের কাছে তো যায় না’। সেখানে গেলে যে অর্থনৈতিক অপচয় হয়, আপাতত সেটা যে হচ্ছে না, মেয়েটার সেটাই সান্ত্বনা।

সান্ত্বনা পাওয়া সমাজের প্রায় প্রত্যেকটা স্তরের নারীদের এই যে গল্প, এর কথা শুনে স্বামী সোহাগী আরেক ভদ্রমহিলা আমাকে বললেন—আপা শোনেন, আমাদের অনেক পুরুষ কলিগের কাছে শুনি, অনেক বউ-ই নাকি স্বামীকে তৃপ্ত করতে পারেন না।

তৃপ্তির এই যে অপ্রাপ্ততা নিয়ে আলোচনা করা পুরুষগুলো, ক’জন স্বাভাবিক সময়ে তার স্ত্রীকে ডেকে বলেছেন যে–তার যৌনাঙ্গ বা যৌনকর্ম দ্বারা তার বউ কতোটা তৃপ্ত? এ দেশের বেশিরভাগ মেয়েই যখন স্বামী ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পুরুষের স্পর্শ পায়নি, সে আসলে তৃপ্তির কতটুকু বোঝে? তবুও সমস্ত মনে-প্রাণে একনিষ্ঠা নারীটিও বেশ্যাবৃত্তির মতো বৃত্তির গালিতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। মেনে নেয়ার এই যে প্রবণতা, আসলে এর সমাধান কোথায়?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.1K
  •  
  •  
  • 7
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares

লেখাটি ৩,৮৩১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.