সিক্রেট সুপারস্টার: নারীর শেকল ভাঙ্গার গান

0

মাসকাওয়াথ আহসান:

চলচ্চিত্রকে সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম বলা হয়; কারণ সমাজ পরিবর্তন ও মানুষের মুক্তির বার্তাটি আর কোনো মাধ্যমেই জনমননে এতো গভীরভাবে প্রোথিত করা যায় না। আমির খান চলচ্চিত্র শিল্পকে সত্যিকার অর্থেই সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে আর দক্ষিণ এশিয়ার মানুষকে সভ্যতার পাদপ্রদীপে পৌঁছে দেবার মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগাচ্ছেন; তার প্রযোজিত সিক্রেট সুপারস্টার ছবিটি তার সাম্প্রতিকতম দৃষ্টান্ত।

পরিচালক আদভেইত চন্দনের একজন সহযোগী হিসেবে আমির খান সমাজ নামের একটি অচলায়তনকে আবার চ্যালেঞ্জ করলেন থ্রি ইডিয়টস, পিকে বা দাঙ্গাল ছবির মতো করে।

সিক্রেট সুপারস্টার বরোদার ১৫ বছর বয়েসি এক কিশোরী ইনসিয়ার গান গাওয়ার স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ অবশেষে অদম্য স্বপ্নের ডানা মেলার স্বপ্ন। এ কোন রূপকথা নয়; আমাদেরই চারপাশ থেকে তুলে নিয়ে আসা জীবনের গল্প।

ইনসিয়ার মা নাজমা কট্টরচিন্তার কথিত পৌরুষ দেখানো এক উপমানবের স্ত্রী। নাজমা তার স্বৈরাচারী স্বামীর কারাগারে বন্দী থেকে; কথায় কথায় শারীরিকভাবে নির্যাতিত হবার বেদনালীন বাস্তবতায় বসবাস করেও তার মেয়ে ইনসিয়ার গান গাওয়ার স্বপ্নপূরণে দিনমান লড়াই করে। মেয়ের জন্য একটি গিটার কেনার ব্যবস্থা করে। নিজের গলার মালা বিক্রি করে একটি ল্যাপটপ কেনে। গৃহের স্বৈরাচারী শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ইনসিয়ার স্বপ্নের ডানা মুক্তির স্বরলিপিগুলোকে লালন করে।

ইনসিয়া স্বৈরাচারী পিতার ভয়ে সংগীত প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে না। গান গেয়ে অনলাইনে আপলোড করে দেবার পরিকল্পনা করে। কিন্তু তার আব্বা জেনে যাবার ভয়ে মায়ের পরামর্শে হিজাব পরে একটি গান গেয়ে সিক্রেট সুপারস্টার ছদ্মনামে আপলোড করে দেয়। শ্রোতাদের অভাবনীয় সাড়া পেতে শুরু করে। দ্বিতীয় গান আপলোড করার পর সিক্রেট সুপারস্টারের অনুপম গায়কী মূলধারার মিডিয়ার খবরে পরিণত হয়। ছদ্মনামে হলেও ইনসিয়ার সংগীতের স্বপ্ন ডানা মেলে।
শক্তি কুমার নামের একজন সংগীত পরিচালক তার পরবর্তী ছবিতে গান গাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পাঠায়। এই পাগল ছাঁট মিডিয়ায় সমালোচিত ব্যক্তিগত জীবনে অস্থিতিশীল শক্তি কুমার চরিত্রে অভিনয় করেছেন আমির খান। গল্পের প্রয়োজন ছাড়া পর্দায় আসেননি তিনি। গল্পটা যেহেতু ইনসিয়া আর তার মায়ের অবরুদ্ধ জীবনে ডানা ঝাপটানোর; সেখানে তারাই মুখ্য চরিত্র। আমির খান রয়ে গেছেন একজন সহযোগী চরিত্র হয়ে।

ইনসিয়ার আব্বা যতবারই তাদের বাসার বসার ঘরে প্রবেশ করেছে; ততবারই ইনসিয়ার মা’র মতো দর্শকের মাঝেও ভীতি সঞ্চারিত হয়েছে। চিন্তার অচলায়তনের রাজা যেন এই লোকটি; জোর করে নিজের বস্তাপচা চিন্তাগুলো পুরো পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেয়া শাসক যেন সে। এই চরিত্রটি দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রকর্তা, দপ্তরকর্তা, মহল্লা কর্তা, নিরাপত্তা রক্ষী অর্থাৎ ক্ষমতাগর্বী প্রতিটি অচল মালের প্রতীকী ও প্রতিভূ যেন। তার মধ্যেই দেখা যায় দক্ষিণ এশিয়ার নরভোজী মনগুলোর প্রতিবিম্বিত প্রতিরূপ।

ইনসিয়ার পড়ালেখায় গাফিলতির ছোট অজুহাতে সে মেয়েটির গিটারের তার ছিঁড়ে দেয়। ইনসিয়ার মা গলার মালা বেচে ল্যাপটপ কেনার খবর পেয়ে তা ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেয়। সুরের সঙ্গে অসুরের নিয়ত লড়াই চলতে থাকে; ইনসিয়ার আব্বা তার মা’কে পুলিশ রিমান্ডের মতো করে নির্মমভাবে মারে। ইনসিয়া তার মাকে বলে, এভাবে আর কতকাল; চলো মুক্তির পথ খুঁজি। কিন্তু মা যেন এই পড়ে পড়ে মার খাওয়ার নিয়তি বরণ করেছে।

ইনসিয়া সংগীত পরিচালক শক্তি কুমারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। স্কুল পালিয়ে প্লেনে মুম্বাই গিয়ে গান রেকর্ড করে স্কুলের সময়ের মাঝেই ফিরে আসে। গানটি সাড়া ফেলে দেয়। কিন্তু সেও সিক্রেট সুপারস্টার নামেই।
এরমধ্যে ইনসিয়ার আব্বা সৌদি আরবে তার চাকরী হয়ে যাবার সুখবর নিয়ে আসে। নিজের পছন্দসই এক তরুণের সঙ্গে ইনসিয়ার সম্মন্ধও স্থির করে। চারপাশে শেকলগুলো আরো ঘন হয়ে আসতে দেখে ইনসিয়া আবার মুম্বাই গিয়ে শক্তি কুমারের সাহায্য নিয়ে এক নারী আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করে তার মায়ের জন্য তালাকনামা তৈরী করে নিয়ে আসে। কিন্তু মা তাতে স্বাক্ষর দেবার সাহস পায়না।

ইনসিয়া তার দাদি সম্পর্কীয় একজনের কাছে জানতে পারে, সে যখন তার মায়ের পেটে এসেছিলো; তার বাবা তখন কন্যা সন্তান বলে ভ্রুণহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। ইনসিয়ার ভ্রুণটিকে পেটে নিয়ে মা দশমাসের জন্য পালিয়ে যায়। ইনসিয়ার জন্ম হলে সে ফিরে আসে। ইনসিয়ার মা কখনোই চায়নি ইনসিয়া এই ব্যাপারটা জানুক।

ইনসিয়া অনেক চেষ্টা করেও তার মায়ের মাঝে কোন দ্রোহ জাগাতে ব্যর্থ হয়। অবশেষে তারা নিয়তি মেনে নিয়ে সৌদি আরবে যাবার জন্য বরোদা থেকে মুম্বাই আসে। বিমানবন্দরে চেক ইন করার সময় মালপত্রের ওজন বেশী হওয়ায় ইনসিয়ার বাবার চোখ পড়ে যায় গিটারটির দিকে। স্বৈরাচারী অসুর পিতা গিটারটা ফেলে দিয়ে আসার নির্দেশ দেয়। ঠিক এসময় ইনসিয়ার মা ভ্রুণহত্যা বাঁচানোর মতো করে আরেকবার সাহসী হয় ইনসিয়ার স্বপ্ন বাঁচাতে। এই গিটারটিই সেই স্বপ্নের প্রতীক। ইনসিয়ার মা ব্যাগ থেকে তালাকনামাটি বের করে ইনসিয়ার বাবাকে দেয় স্বাক্ষর করতে। স্পষ্ট করে বলে, চারিদিকে সিসিটিভি; কোন সহিংসতার চেষ্টা করলে তা ধরা পড়ে যাবে। স্বৈরাচারী মন শেষপর্যন্ত ভীরু হয়। সে স্বাক্ষর করে দেয়।

ইনসিয়ার মা তার মেয়ে আর ছোট ছেলেটিকে নিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে বেরিয়ে আসে। এ যেন শতবর্ষের শৃংখল মুক্তির মুহূর্ত। শক্তি কুমারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে ইনসিয়া তার মা আর ভাইকে নিয়ে চলে আসে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে; যেখানে সিক্রেট সুপারস্টার শ্রেষ্ঠ সংগীত শিল্পীর অন্যতম মনোনয়ন পেয়েছে। পুরস্কার অন্য একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী পেলেও শিল্পীর সততা থেকে বলেন, তিনি অন্যান্যবারের মতো এবারের পুরস্কারে তৃপ্ত নন; কারণ সিক্রেট সুপারস্টার তার চোখে এবারের শ্রেষ্ঠ সংগীত শিল্পী। শক্তি কুমার তখন উঠে জানান, সিক্রেট সুপারস্টার এই মিলনায়তনেই আছে।

মঞ্চে ডাকা হলে সিক্রেট সুপারস্টার নিজেকে অবগুন্ঠনমুক্ত করতে হিজাব খুলে ফেলে। এই দৃশ্যটি একটিও কথা না বলে দক্ষিণ এশীয় সমাজের গজদন্তের মিনারের ইট একটা একটা করে খুলে নিয়েছে। এই চলচ্চিত্রের গল্পটি একজন সিক্রেট সুপারস্টারের স্বপ্নমুক্তির গল্প হলেও এ গল্প নিবেদিত হয়েছে মা আর মাতৃত্বের প্রতি। আর শেষ পর্যন্ত এই চলচ্চিত্র নারীবাদ বিষয়টিকে সহজ করে বুঝিয়ে দিয়েছে; যা সেমিনার সিম্পোজিয়াম কলাম একাডেমিয়ার জটিলায়তনে এতোদিন মুক্তির পথ খুঁজছিলো।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 639
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    642
    Shares

লেখাটি ১,১৩৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.