বাচ্চার কথা বলায় অর্থপূর্ণ যোগাযোগ ও পরিবারের ভূমিকা

0

ফারহানা আফরোজ রেইনী:

বেশ কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধুর সাথে গল্প করার সময় ও বলছিল ওর বাচ্চার বয়স প্রায় দুই বছর, কিন্তু ২/১ টা শব্দ ছাড়া ও কোনো কথা বলে না। বিষয়টা নিয়ে আমার বন্ধু বেশ উদ্বিগ্ন ছিল, এবং এই বিষয় কোন ধরনের বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলা যায় সেটা নিয়েই মুলত আলোচনা করছিল।
আমি তাকে আশ্বস্ত করেছিলাম যে সে যখন ২/১ টা শব্দ বলছে, তার মানে ও কথা বলতে পারে এবং বলবে। হয়তো কোনো কারণে দেরি হচ্ছে। সেদিনের আলোচনা শেষ হলেও বিষয়টা আমার মাথা থেকে সরে যায়নি। বরং আমি বিষয়টার প্রতি একটু আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম।

আগে জানতাম একটা নির্দ্দিষ্ট বয়সে আসলে বাচ্চারা স্বাভাবিক নিয়মেই কথা বলে। হ্যাঁ, সেটাই হয় কিন্তু এর পিছনে যে মা-বাবা বা পরিবারের একটা অবদান আমি বলবো গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকে তা হয়তো আমরা অনেকেই জানি না বা জানলেও অনেক সময় প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করতে পারি না। আমার বন্ধুর ক্ষেত্রেও এই রকম একটা বিষয় ঘটেছিল।
পাবলিক হেল্‌থ বিশেষ করে মা ও শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার সুবাদে আমার সুযোগ হয়েছিল মাঝে মাঝে শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশুদের নিয়ে যারা কাজ যারা তাদের সাথে কথা বলার। এমনি একদিন কথা হচ্ছিল শিশুদের নিয়ে কাজ করেন এমন একজন শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে। বাচ্চার কথা বলার পিছনে মা-বাবা বা পরিবারের অবদানের বিষয়টি ওইদিনই প্রথম উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম। আবার বাচ্চার কথা বলার ভঙ্গি, সুবিধা, অসুবিধা সবকিছুই যে তার অন্যান্য আচরণের সাথে সম্পর্কযুক্ত, সেটাও আমি জেনেছিলাম সেই দিনের সেই আলোচনা থেকে।

বাচ্চার কথা বলার ক্ষেত্রে তার সাথে কমেউনিকেশন বা যোগাযোগ করাটা অত্যন্ত জরুরি। বাচ্চার সাথে কথা বলতে হবে প্রচুর খুব ছোটো বয়স থেকে এমনকি সে বুঝতে শেখার আগেও। তাহলে তার কথা বলার প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে যা তাকে সাহায্য করবে সঠিক সময়ে বা সঠিকভাবে কথা বলতে। তবে সেই যোগাযোগটা হতে হবে অর্থপূর্ণ। অনেক বাচ্চা দেরিতে কথা বলে বা কথা বলতে আগ্রহী হয় না “ওয়ান ওয়ে কমেউনিকেশন” বা এক তরফা যোগাযোগের কারনে। এই এক তরফা যোগাযোগের মধ্যে রয়েছে বাচ্চাকে খুব বেশি টিভি দেখানো, মোবাইল / ট্যাব এ ছড়া / গল্প / কার্টুন দেখানো বা শোনানো, গৃহপালিত পশু যেমন কুকুর-বিড়ালের সাথে খেলতে দেয়া ইত্যাদি। এই ধরনের কাজে বাচ্চা কথা আদান প্রদান করতে শিখে না।

তাই এই ধরনের যোগাযোগ এ বাচ্চার কথা শোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি হলেও বাচ্চা কথা বলার প্রতি আকর্ষণ বোধ করে না। ফলে বাচ্চার কথা বলা বিলম্বিত হতে পারে। আমার বন্ধুর ক্ষেত্রে এই বিষয়টা ছিল যে, তারা স্বামী / স্ত্রী দুজনেই ব্যস্ত থাকার কারণে বাচ্চা খুব ছোটবেলা থেকে মোবাইল/ট্যাব এর উপর নির্ভরশীল ছিল। এর ফলে ওর বাচ্চা শুধু কথা শুনেছে, বলার দরকার না হওয়ায় কথা বলার প্রতি আগ্রহবোধ করেনি। আবার শিশু যদি তার কথা শেখার প্রাক্কালে বহু ভাষা বা মিশ্র ভাষার সাথে পরিচিত হয় তাহলেও তার কথা বলা বিলম্বিত হতে পারে বা শিশু অন্য কোন সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।

আমার বাচ্চা সঠিক সময়ে বরং একটু আগেই কথা বলা শুরু করেছিল। জেনে বা না জেনে এর পিছনে আমাদের বা পরিবারের সদস্যদের একটা বড় ভূমিকা ছিল। কারণে- অকারণে আমরা বাচ্চার সাথে প্রচুর কথা বলতাম, নিজেরাই গান শোনাতাম, ছড়া শোনাতাম, প্রশ্ন করতাম, উত্তর দিতাম, বই দেখাতাম, ছবি দেখাতাম এমন আরও অনেক কিছু করা হতো। কিন্তু ওর ক্ষেত্রে অন্য একটি সমস্যা খেয়াল করলাম। আমার বাচ্চার বয়স তখন দুই বা আড়াই বছর হবে। একদিন রাতে তাকে বললাম বাবা খেতে হবে এসো।

আমি খেয়াল করলাম সে সাথে সাথে আমার কথার উত্তরে খেতে হবে বলতে গিয়ে খেতে পর্যন্ত বলার পর “হ” অক্ষরটি সে বেশ কয়েকবার উচ্চারণ করলো। কিন্তু সে বাক্য শেষ করতে পারছে না। অনেকক্ষণ পর সে যা বললো, তা হচ্ছে “খেতে হইবো”। এই রকম আর কয়েকটি শব্দ তার এমন হতে লাগলো এবং ক্রমে তার মাত্রা বাড়তে থাকলো। আমি তার কার্যকলাপ এর প্রতি লক্ষ্য রাখতে লাগলাম। দেখলাম সে তার কেয়ার গিভার এর মোবাইল এ একটা বাংলা কার্টুন দেখে। সেখানে “হবে” উচ্চারণটা এক রকমভাবে করা হয়। তার কেয়ার গিভার যখন তার সাথে কথা বলে, তার উচ্চারণ একরকম যে কিনা পুরান ঢাকা অঞ্চলের।

আমার বাসায় দেশে উত্তরাঞ্চলের এক সাহায্যকারী ছিল সে উচ্চারণ করতো, আরেক রকম ভাবে আর আমরা বাসায় সাধারণ চলতি ভাষায় কথা বলি। দেখা গেল এক “হবে” শব্দটি সে চার রকম ভাবে শুনছে। তাই নিজে বলার সময় কোনটি বলবে এটা পছন্দ করতে গিয়ে তার সময় লেগে যায়। সে ‘হবে’ বলবে, নাকি ‘হইব’ বলবে, এটা ঠিক করতে গিয়ে “হ” এর মধ্যে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আমি তার ওই বাংলা কার্টুন দেখা বন্ধ করলাম এবং দেখলাম এক সপ্তাহের মধ্যে ওর কথা বলার ভঙ্গিতে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। পরে আমি একজন স্পিচ থেরাপিস্ট এর সাথে কথা বলেও এক এ রকম পরামর্শ পেয়েছিলাম। অবশ্য এর সাথে সাথে সে অন্য আর কিছু পরামর্শ ও দিয়েছিলেন।

প্রাত্যাহিক জীবনের ব্যস্ততায় আমাদের পক্ষে বাচ্চাকে অনেক বেশি সময় দেয়া সম্ভব হয়ে উঠে না হয়তো। তাই আমরা যদি বাচ্চাকে দেয়া সময়টুকুর গুণগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে তা বাচ্চার জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। আমাদের ব্যস্ততার পরে বাসায় ফিরে যতটুকু সময় পাওয়া যায়, তা থেকে বাচ্চার জন্য অবশ্যই কিছুটা সময় রাখতে হবে। মা-বাবার উপস্থিতিতে বাচ্চা যেন খুব বেশি টিভি দেখা, মোবাইল/ট্যাব ব্যবহার না করে সেদিকটায় খেয়াল রাখতে হবে। আর বাচ্চার সাথে ভালো কিছু সময় কাটাতে পারলে মা-বাবারও নিশ্চয় খারাপ লাগবে না।

ফারহানা আফরোজ রেইনী
গবেষণা কর্মী

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 528
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    529
    Shares

লেখাটি ১,৯৪৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.