অগ্নিগর্ভ থেকে উঠে আসা নাম তসলিমা নাসরিন

0

সৌম্যজিৎ দত্ত:

চারিদিকে একসময় হই হই, মার মার রব শুনেছিলাম। জানতাম না, বুঝতাম না কিসের এই দাঙ্গা। সবেমাত্র কলকাতা এসেছি পড়তে। কলকাতা আমার কাছে স্বপ্নের শহর। ছোট থেকেই স্বপ্ন দেখতাম কলকাতা নিয়ে। অত্যন্ত মাঝারি মানের ছাত্র, তারপরও কলকাতাতে পড়ার স্বপ্ন! এর প্রধান কারণ ছিল আমার দিদি। আমি আমার দিদিকে খুব ভালবাসতাম, আর দিদি কলকাতাতে থাকে, কলকাতার মেয়ে, আমিও চাইতাম ওর কাছে কাছে থাকতে।

ইংরাজি সাহিত্যে অনার্স নিলাম বিদ্যাসাগর কলেজে, ও পার্ক সার্কাস গাইডেন্সে ক্লাস করতে শুরু করলাম পরের বছর জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেবো ভেবে। সেদিন ক্লাস করতে যাচ্ছিলাম, বাস শিয়ালদাহ পার করে মৌলালি ঢুকছে। হঠাৎ বাস থেমে গেলো। গাড়ি যাবে না। সামনে নাকি মারামারি হচ্ছে, অসম্ভব মারামারি! পুলিশ, সাধারণ মানুষে ধস্তাধস্তি। বিএসএফ জওয়ানও এসেছে, গুলি চলছে, আগুন জ্বলছে পার্কসার্কাসে। আমি কিছু বুঝতে পারলাম না, মাসিকে ফোন করি। মাসি যেই শুনেছে আমি ওই রাস্তায়, আমাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলে, মাকেও ফোন করে জানিয়ে দেয়।

আমি মৌলালি যুব কম্পিউটার সেন্টারে ঢুকে যাই, জিজ্ঞাসা করি সামনে কী হয়েছে! ওরা বললো, “সামনে পার্কসার্কাসে আগুন জ্বলছে, মুসলিম গোষ্ঠী ও পুলিশের মধ্যে মারামারি হচ্ছে, লাঠি চার্জ চলছে, বিএসএফ রাবারের গুলি ছুঁড়ছে, সাধারণ মানুষ ইট, কাঁচের বোতল ছুঁড়ে মারছে পুলিশের দিকে। ওদিকে একদম যাওয়া যাবে না, রাস্তায় বাস দাঁড়িয়ে গেছে সব।”

ছোট ছিলাম, চঞ্চল মাথা। তাই মারামারির কারণ বিশদে জানতে চাইনি। মুখরোচক করার জন্য মারামারির গল্পটাই যথেষ্ট ছিল। হঠাৎ বাইরে মিছিল দেখতে পেলাম, “তসলিমা নাসরিন হটাও।” প্ল্যাকার্ডে লেখা “তসলিমা নাসরিন হটাও।” একদল সাদা টুপি পরা কিছু মানুষ মৌলালির রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে প্ল্যাকার্ড হাতে। বড় বড় সাদা কাপড়ে লাল রঙ দিয়ে লেখা “তসলিমা নাসরিন হটাও” গর্জন করতে করতে যাচ্ছে, আশেপাশে মানুষ রাস্তার ধারে চুপ করে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে আর নিজেদের মধ্যে গুনগুন করে আলোচনা করছে। আমিও মজা দেখছি।

আমি চিনতাম না তসলিমা নাসরিনকে। জানতাম না কেন এই মিছিল, কেন মারামারি! সেইসময় কলকাতাতে চাঞ্চল্যকর একটা ঘটনা ঘটেছিল। পার্কসার্কাসে বিখ্যাত চর্ম ব্যবসায়ী অশোক তোদি এক মুসলিম লোক রিজওয়ানকে খুন করেছিলেন। খুনের কারণ তার মেয়ে প্রিয়াঙ্কা তোদির সাথে রিজওয়ানের প্রেম। মূলত সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পার্কসার্কাসে এই মারামারি শুরু হয়েছিল। যেটা বিশালাকার ধারণ করে।

পরে বুঝলাম, সেই সুযোগে রাজনীতি নিজের রঙ পাল্টায়। কিছু ভাড়াটে গুণ্ডা দিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিল বার করায় তৎকালীন সিপিআইএম সরকার। 

একটা সাজানো নাটক পরবর্তী বিধানসভার আগে মুসলিমদের নজর সিপিআইএমের দিকে ঘোরাতে। এই নাটকের দরকার ছিল সিপিআইএমের, একটা ইস্যু তৈরি করে তসলিমা নাসরিনকে অপসৃত করে মুসলিম ভোট ফিরে পাওয়ার জন্য। নন্দিগ্রাম কাণ্ড মুছে নন্দিগ্রামের মুসলিমদের ভোট ফিরে পাওয়ার জন্য। মুসলিম ভোট পাওয়ার উদ্দেশ্য কতটা সফল হয়েছিল সেটা বাংলার মানুষ জানে। কিন্তু এই নাটক যথেষ্ট ছিল তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা থেকে বের করে দিতে।

একটা খুনের ঘটনার প্রতিবাদের বিক্ষোভ ঘুরে গেল একজন লেখিকার বিরুদ্ধে মুসলিমদের বিক্ষোভে।
খবর হলো – “The 2007 Kolkata riots took place in Kolkata on 21 November 2007, when anti-Taslima protesters under the banner of All India Minority Forum blockaded major portions of central Kolkata and resorted to arson and violence. The Left Front led State Government deployed the army on the afternoon of that day.”

আমি দিদিকে জিজ্ঞাসা করলাম তসলিমা নাসরিন সম্পর্কে। কে এই ব্যক্তি! কী এমন করেছে!

দিদি আমাকে লেখিকার বাংলাদেশ থেকে নির্বাসনের গল্প শোনালো। বললো, লেখিকার লেখা “লজ্জা” বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি করেছিল, লেখিকা দুমাস অন্তর্ধানে ছিলেন। রাতের অন্ধকারে পালিয়ে বেড়াতে হতো এক জায়গা থেকে আরেক জায়গাতে। সেখানে নাকি আরও ভয়ঙ্কর বিক্ষোভ মিছিল বেরিয়েছিল সেই সময়। কিন্তু লেখিকা তাতে দমে যাননি একদমই। দেশ থেকে নির্বাসিত হয়েও তিনি লেখার মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ জারি রেখেছিলেন। ভয়ঙ্কর সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও লেখিকা এখনও তাঁর লেখা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে “দ্বিখণ্ডিত” নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাথে লেখিকার বিরোধ হয়। হাইকোর্ট পর্যন্ত লড়াই চলে। পরে ২০০৬ তে “দ্বিখণ্ডিত” মুক্ত ঘোষিত হলে রাজ্য সরকার সেটা ভালো চোখে নেয়নি। লেখিকাকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হয়। রাজ্য ছাড়তে বলা হয়। কিন্তু লেখিকা একেবারেই নারাজ।

এসবকিছু শুনতে শুনতে আমি যেন একপ্রকার কাল্পনিক জগতে দেখতে পাচ্ছিলাম লেখিকা তসলিমা নাসরিনের জীবন। মনে মনে তসলিমা নাসরিন তখন আমার হিরোর আসনে জায়গা করে নিচ্ছে। এরপরই দিদি আমাকে “লজ্জা” বইটা পড়তে দেয়। দেখি লেখিকার লেখা। শুধুই লেখা নয়, বাস্তব জীবনের এক যুদ্ধ, সমাজের যুদ্ধ। তার পরবর্তী ঘটনাগুলো জানতে থাকি, বুঝতে থাকি। লেখিকা যেন অগ্নি গহ্বর থেকে উঠে আসা সেই অগ্নি, যে সমাজকে সত্যের সাথে পরিচয় করাতে চাইছে, সমাজের সামনে সত্যের রূপ তুলে ধরতে চাইছে। মানুষকে এক নতুন চিন্তাভাবনার জগত খুলে দিচ্ছে।

আর এই প্রতিবাদে যে কিছু মানুষের মুখোশে আঘাত লেগেছে, তাদের প্রভাবে, এবং রাজনৈতিক নাটকের প্রভাবে লেখিকা বারে বারে মানুষের ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছে। তাকে সাধারণ মানুষের সামনে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতোকিছুর সাথে লড়াই করেও তিনি একদম দমে যায়নি। একাই উঠে দাঁড়িয়েছেন, লড়াই করেছেন, আবারও লিখেছেন। মনের ভিতরে যে সত্যের আলো, সমাজে নিষিদ্ধ চিন্তাভাবনাগুলোর নেতিবাচক ও ইতিবাচক রূপ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তুলে ধরেছে।

হ্যাঁ, আমি চিন্তাভাবনার এমনই ধার অনুভব করেছিলাম তাঁর লেখাতে। ছোট ছিলাম, কিন্তু ছোট বয়সেই সমাজের যে সত্যির সাথে পরিচিত হয়েছিলাম তা সমাজ স্রোতের প্রতিকূলে বয়ে যাওয়া সব সত্য। যা সমাজ স্রোতের অনুকূলে বয়ে চলা মানুষের সত্যিকারের লজ্জা। তসলিমা নাসরিন সেদিন বাংলা থেকেও নির্বাসিত হয়েছিল। কিন্তু জায়গা করে নিয়েছিল সেই ছোট ছেলেটার হৃদয়ে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 430
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    434
    Shares

লেখাটি ১,১২৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.