“কর্মজীবী গৃহিণী” যখন পেশা

0

কাকলী তালুকদার:

পেশা লিখতে গিয়ে অনেক নারীকেই বিপত্তিতে পড়তে হয়। একসময় হয়তো তিনি পেশা লিখতে গিয়ে চাকরিজীবী লিখতেন, এখন বাচ্চাদের কথা ভেবে চাকরিটা ছেড়ে গৃহিণীর পদবি নিয়েছেন। কিন্তু গৃহিণী লিখতে গিয়ে তিনি ভাবেন, এটা তো কোনো পেশাদারিত্বের কথা বলে না। এমনকি গৃহিণী বললে ভেসে উঠে তথাকথিত কাজহীন একজন নারীর চিত্র।

বাস্তবে গৃহের বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ হলেও গৃহিণীর গুরুত্বটি খুবই নগণ্য হিসেবেই গণ্য হয়।
একজন বেতনভুক্ত গৃহকর্মীর চেয়েও গৃহিণীর সামাজিক অবস্থান নাজুক।
এর মূল কারণ অর্থনৈতিক। পরিবারের পুরুষ সদস্যটি চাকরিজীবী, উনার আয় দিয়ে সেই গৃহিণী একটি পরিবারকে সারা বছর পরিচালনা করেন। অনেক সময় গৃহিণী ঘরের সকলের ভালো-মন্দ, তাদের প্রয়োজনটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন। পুরুষ ব্যক্তিটির আয়ের সঠিক খবরও সেই গৃহিণী জানার অধিকার রাখেন না।

যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও, সন্তান জন্মের পরেই গৃহিণীর পদবী আরেকটু ভারী হয়ে উঠে। একজন মা এবং গৃহিণীর সামাজিক মূল্য একটি উন্নয়নশীল দেশে খুবই গুরুত্বহীন বিবেচিত হয়।

এর প্রধান কারণ নারী যে শ্রম দিয়ে একটি পরিবারকে নিরাপদে আগলে রাখেন, তার পরিমাপক যন্ত্র কোথাও নেই। আবার সেই গৃহিনীই যদি চাকরিজীবী হয়ে অর্থ ঘরে নিয়ে আসেন আর তার ঘরের কাজগুলোর জন্য কোন গৃহকর্মী নিয়োগ দেন, হিসেবটা পাল্টে যায়। পুরুষ সদস্যের আয় ভালো হলে কর্মজীবী নারীর বেতন এবং এই আয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। সেই ক্ষেত্রে স্বল্প আয়ের পুরুষের পরিবারে কর্মজীবী নারীর অর্থনৈতিক আয়কে কিছুটা ইতিবাচকভাবে দেখা হয়।

অন্যথায় গৃহকর্মির বেতন দিয়ে পরিবারের নারী সদস্যটির উপার্জনের আয়ের তুলনা করা হয়। এই টাকা আয়ের চেয়ে ঘরের গৃহকর্মির বেতন না দিয়ে নারীকে গৃহ শ্রমে বাধ্য করার চেষ্টা।

অন্যদিকে আমাদের সংস্কৃতিতে একজন কর্মজীবী নারীকে ডাবল রোল প্লে করতে হয়। গৃহিণী যখনই কর্মজীবী নারী হয়ে গেলো ঘরে-বাইরে সমান তালে সামলাতে হয়। পুরুষ সদস্যের জীবনের চাকার কোনো পরিবর্তন নেই। কিন্তু একই পরিবারের নারীকে মূল্যটা দিতে হচ্ছে দ্বিগুণ। স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে ঘরের সকলের চাহিদা নিশ্চিত করে তাঁকে আবার অর্থনৈতিক মুক্তির স্বাদ নিতে বেরুতে হচ্ছে।

এই ক্ষেত্রে পুরুষ সদস্যের জীবনবোধ, কার্যক্রম, আরাম আয়েশে কোন প্রতিফলন দেখা যায় না। তবে যে সকল পুরুষ সত্যিকার অর্থে মানবিক, দৃষ্টির ইতিবাচক ভাবনা থেকে তাঁরা নারীর উপর চাপিয়ে দেয়া কাজগুলো কিছুটা ভাগ করে নেন। সেই ক্ষেত্রে পুরুষ সদস্যটি কেবল মানবিক হলেই এটা সম্ভব হয়।
আবার অনেক পরিবারে পুরুষ সদস্যটি বেকার, কিন্তু নারী সদস্যটি বাহিরে কাজ করেন, এই অবস্থা থাকলেও পুরুষ সদস্যটি গৃহিণীর মতো গৃহী হয়ে উঠতে পারেন না। তিনি একজন পেশাদার পুরুষের মতোই জীবন চালিয়ে যান।

নারী গৃহিণী বা কর্মজীবী যাই হউক, তাঁকে মা হতে হয়। পৃথিবীর সকল পেশার ঊর্ধে এই ‘মা’ নামক পদবীর অবস্থান। কিন্তু আমাদের সমাজে একজন মায়ের সংগ্রামে কেউ সহজে ভাগ বসাতে আসেন না। এখানেও নারীকে মায়ের দায়িত্ব বলে বিশ কেজির জায়গায় চল্লিশ কেজি চাপিয়ে দেয়া হয়। একজন শিশু জন্মের পর মায়ের দুধ খাওয়ানো ছাড়া তার সকল কাজ একজন মা এবং বাবা সমানভাবে করতে পারেন।

একজন কর্মজীবী মা এবং বাবা তাদের সময়সূচী নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে পারেন। কিন্তু এই সমাজ নারীদেরকে শ্রম যতটুকু চাপিয়ে দিতে ভালবাসে, সম্মান এবং অধিকারের বেলায় ঠিক ততটুকু স্বার্থপর। এই যে এতো প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব চারপাশে তারাও হিসেবের ক্ষেত্রে এক রসুনের দশ পুচ্ছদেশের মতো।

পুরুষদের এই স্বার্থপর মানসিকতার কারণেই নারীকে বেশি চাপ নিতে হয়। সেই চাপ সবার সহ্য করার ক্ষমতাও থাকে না। কিন্তু মানুষ হিসেবে নিজের সত্ত্বাকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে কর্মজীবী নারীকে ৫০% বেশী পরিশ্রম করতে হচ্ছে। যে শ্রমটা ইচ্ছে করলেই ভাগাভাগি করে নেয়া যায় একটি সুন্দর পরিবারের কথা ভেবে।
যে পুরুষ মনে করেন ঘর মানেই নারী, তিনিও দিন শেষে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ঘরেই ফিরে আসেন। পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে নিজের সুযোগ-সুবিধা ভোগের জন্য অন্যের উপর চাপ বাড়ানোর কোন সৌন্দর্য্য নেই। বরং সময়ের সাথে পরিবর্তনের সার্বিক ইতিবাচক দিকগুলো বিবেচনায় নিয়ে নিজের দায়িত্বগুলোকে আরও সুদৃঢ় করে তোলাই একজন আধুনিক পথপ্রদর্শক মানুষের বৈশিষ্ট্য।

‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও একই কাজ করে’। উন্নয়নশীল দেশ থেকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে এসেও আমাদের সংস্কৃতি একই থেকে যায়। আমাদের বেশিরভাগ পুরুষই অর্থনৈতিক কর্মজীবন নিয়েই জীবন কাটিয়ে দেন। একজন নারী উন্নত দেশে এসে ঘর-বাহির সামলাচ্ছেন একা হাতে।
বার্গারের দেশে এসেও ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচু শাক, মৃগেল মাছের দোপেঁয়াজি, কলিজার ভুনা দিয়েই পেট ভরে ভাত খেতে আমাদের ভালো লাগে।

অল্প টাকায় যেহেতু গৃহকর্মি এখানে মিলে না, ঘর এবং বাইরে দুটোই সামলাচ্ছে নারী। আর ‘রসনা বিলাস’ এর গল্পগুলো আমাদের স্বামীরা কত সুন্দর করেই না বলেন…অমুকের বউ কত সুন্দর পিঠা বানায়, খেতে দারুণ লাগে! স্বামীর মুখে এই কথা শুনে নারীর মন ব্যাকুল হয়ে উঠে পিঠা বানাতে।

দিনশেষে ঘরে ফিরে কর্মজীবী নারী গৃহিণী হয়ে উঠে। সকাল হলেই গৃহিণী আবার কর্মজীবী নারী হয়ে দৌড়ায়। বাচ্চাদের হোমওয়ার্কগুলোও বসে থাকে একজন মায়ের জন্য।

১ নভেম্বর ১৭
নিউইয়র্ক

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 563
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    567
    Shares

লেখাটি ১,১৭৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.