বৈরী সংসারও যখন আটকাতে পারে না মেয়েটিকে – ৮

0

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির কাঁচঘেরা, ঝাঁ চকচকে অফিস। ভেতরে ইন্টারভিউ চলছে। শিখার ডাক পড়েনি এখনো। এই নিয়ে দ্বিতীয় দফায় ডাক পেয়েছে। একটু একটু করে আত্মবিশ্বাস জমা হতে শুরু করেছে। আজ অবধি যে কয়টা ইন্টারভিউ ফেইস করেছে একটাতেও তাকে আটকানো যায়নি। যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন একজন মানুষ শিখা। সংসার আর সংসারের অদ্ভুত মানুষজনের আচরণে নিজের সেই আত্মবিশ্বাসী মনোভাব কোন অন্ধকার অতলে তলিয়ে যেতে বসেছিল। আজকের ইন্টারভিউতে উপস্থিত হওয়াটা সেখান থেকে আবার ভেসে উঠে সাঁতরে তীরের সন্ধান পাওয়ার মতো এক কঠিন লড়াই।
অলিম্পিক মশালের অগ্নিশিখা দেখে মা সর্বকনিষ্ঠ কন্যার নাম রেখেছিলেন শিখা। আশা ছিল মেধায়, প্রজ্ঞায়, অন্যায়ের প্রতিবাদে যেন প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখার মতো জ্বলজ্বল করে তার উপস্থিতি।

সেই পথেই হাঁটছিলো শিখা। পড়ালেখার মাঝপথে হঠাৎ দেখায় তমালকে ভালোবেসে ফেলে। মা খুব চেয়েছিলো লেখাপড়াটা শেষ করুক শিখা। কিন্তু এতোকাল শিখা আর মায়ের স্বপ্নগুলো হাত ধরাধরি করে পথ চললেও তমালের সাথে সম্পর্ক হওয়ার পর থেকে হাতটা যেন শিখাই ছাড়িয়ে নেয় কীভাবে। মায়ের সব কথাই অসহ্য লাগতে শুরু করে, শত্রু মনে হয়।
” নাশতাটা খেয়ে যা ” – শুনলেও কেন যে এতো বিরক্ত লাগে! লেখাপড়া ভুলে, মাকে এড়িয়ে তমালের প্রতি মনোনিবেশ করে সে।

তমাল ওর সব ব্যাপারে কত কেয়ারিং! তমালের মা, বোনেরা সবাই ভালো ব্যবহার করে শিখার সাথে। তমালের মায়ের সাথে তমালের খুবই বন্ধুত্ব। শিখার মন বলে, শিক্ষাদীক্ষা, কালচার কম হোক, মানুষ হিসেবে ভালো হলেই হলো! একমাত্র ছেলে বলে তমালের মা ছেলের প্রতি অতিরিক্ত কর্তৃত্ব ফলাবে কী না – একথা কেউ তুললে শিখার তাকে দুচোখের বিষ বলে মনে হয়! সে যদি তমালের পরিবারকে আপন করে নেয়, তমালের মাকে ভালোবাসতে পারে, তার বিনিময়ে নিশ্চয়ই ভালোবাসাই ফেরত পাবে! সে না হিংসে করলে, শাশুড়ি তাকে একতরফাভাবে হিংসে করবে কীভাবে?

মাস্টার্সের আগেই শিখা চাকরি জুটিয়ে ফেললো শুধুমাত্র তমালকে বিয়ে করবে বলে। হুটহাট পরিকল্পনা আর সিদ্ধান্তে বিয়ে করে ফেলে ওরা। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে নতুন জীবনে পা রাখা।
শ্বশুর শাশুড়ি- ননদ – সবাইকে নিয়ে হেসে খেলে জীবন শুরু করে শিখা। রান্নাবান্না, ঘরকন্নার প্রেমে পুরোপুরি মগ্ন। লেখাপড়া শিকেয় উঠলো।

তমাল ভোর সাড়ে ছয়টায় উঠে তার মায়ের সাথে চা – মুড়ি খেতে খেতে গল্প জোড়ে। শিখা ভাবলো সে গিয়ে যোগ দিলে তারা নিশ্চয়ই খুশি হবে। কিন্তু শিখা গেলেই তারা আলাপ থামিয়ে দেয় বা শিখাকে কী বাজার বা রান্না হবে না হবে এসব বলে রান্নাঘরের দিকে পাঠিয়ে দেয়।

তমালের মামী – চাচীরা দল বেঁধে এলো বউ দেখতে। বাড়ির ছাদে প্যান্ডেল টাঙিয়ে খাবার ব্যবস্থা। শাশুড়ি রিজিয়া খানম বাবুর্চি আনা হবে বলে নাখোশ। সস্তায় এক বাবুর্চি ধরে আনা হলো। শিখা অবাক হয়ে লক্ষ্য করে, অবস্থাপন্ন হলেও রিজিয়া খানম সবসময় কৃপণতা করেন আর নেই নেই বলতে থাকেন। তমালের কাজিনরা আবদার করে, “ভাবী, তুমি আমাদের সাথে বসে খাও।” শিখা বলে, আচ্ছা দাঁড়াও তোমাদের দাদাভাইকে (তমাল) ডাকি, একসাথে বসবো। শাশুড়ি বাড়িভর্তি আত্মীয়-স্বজনের সামনে ঝাঁঝিয়ে ওঠেন, “এতো ঝামেলা কোরোনা তো বাপু! যেখানে পারো বসে খেয়ে নাও। এতো একসঙ্গে খাওয়ার কিছু নেই!”
শিখা একটা ধাক্কা খায় – এভাবে কেউ তার সাথে কথা বলেনি তো!

খাবার সময় ভাই-বোন আর তমালের বন্ধুদের হাসিঠাট্টার মাঝে তমালের চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকেন রিজিয়া খানম। তমাল ভাত মাখিয়ে এক গাল শিখাকে দিতে অমনি মুখে আঁধার নামে ! তমাল মাকেও রোস্টের মাংস ছাড়িয়ে খাইয়ে দেয়।
শিখার জন্য কী রঙের শাড়ি কেনা হবে থেকে শুরু করে সংসারের যাবতীয় খুঁটিনাটি তমাল তার মায়ের সাথে আলোচনা করে। শিখার সেখানে কোনো মতামত দেবার অপশন থাকেনা। তমালের চার বোনকে শিখা যথেষ্ট আদরযত্ন করে। ছোট দুই বোনকে বেড়াতে নিয়ে যায়। ওদের পছন্দের টিফিন বানিয়ে দেয়। সময় কাটায় ওদের সাথে। ওরা যে শিখাকে নিয়ে মেতে থাকে তাতেও মুখ ভার করে ঘুরে বেড়ান রিজিয়া খানম। তমাল আর শিখার একসাথে কোথাও দাওয়াত থাকলে ছোট বোনদের পাঠিয়ে দেন সাথে। অনেক সময় কেউ হয়তো শুধুই শিখা আর তমালকেই নেমন্তন্ন করেছে অথচ বোনদের না নিয়ে গেলে মায়ের মুখের দিকে তাকানো যায়না। সবাই মিলে কোথাও গেলে রিজিয়া খানম ছেলের পাশে হয় নিজে বসবেন, নয় বোনদের বসিয়ে দেবেন, কিছুতেই শিখাকে বসার সুযোগ দেবেন না!

বিয়ের পর প্রথম ঈদ। শিখার শ্বশুর আলম সাহেব ঈদের নামাজ শেষে শিখা সালাম করতে গেলে সবার উপস্থিতিতে এক সেট সোনার হার ও কানের দুল উপহার দিলেন একমাত্র পুত্রবধূকে।
বললেন, “এটা তোমার জন্য মাগো, তোমার মা আর আমার পক্ষ থেকে।” শিখার খুবই অস্বস্তি হয় কারণ সে কিছু পাওয়ার আশা করে না কখনো। শাশুড়িকে ধন্যবাদ দেবে বলে কাছে যেতে ঝট করে মুখটা ঘুরিয়ে নিলেন! আলম সাহেব খানিকটা লজ্জিত কণ্ঠে বলেন, “তমালের মা, আসলে আমার ভুল হয়ে গেছে, তুলির (তমালের বোন) জন্যেও আনা উচিৎ ছিল।”
তমাল সেদিন মায়ের মান ভাঙাতে পায়ে পায়ে নাবালক শিশুর মতো ঘুরছিলো। শিখার মনে হয়েছিলো এমন অপমানজনক মুহূর্ত এই জীবনে আসেনি আর। কী অশিক্ষা!
কী ক্ষুদ্রতা! কী মানসিক দীনতা! আসলে কালচারাল গ্যাপ অনেক বড় একটা বাধা। যে বাড়িতে বই পড়ার চর্চা নেই, সংস্কৃতির চর্চা নেই সে বাড়িতে আলো প্রবেশ করবে কীভাবে? তাই
এবাড়িতে আলো নেই, হাওয়া নেই, প্রাণখোলা হাসি নেই, প্রতিবাদ নেই!
শিখারই তো বোঝার বড় ভুল ছিল!

বছরখানেক পর বড় ননদ তুলির বিয়ের সময় শিখা শ্বশুরের কাছে গিয়ে বিনীত অনুরোধ জানায় যেন সেই গয়নার সেটটি তুলিকে দেয়া হয়। সেদিন ভারমুক্ত হয়েছিল শিখা।
তুলির বিয়েতে শিখা সাধ্যমতো দায়িত্ব পালন করে। অথচ এই তুলির বিয়ের কথাবার্তা যখন চলছিল, রিজিয়া খানম ঠোঁট বাঁকিয়ে তমালকে বলে যেতেন, “বিয়েটা তো তুলির! তোর বউ যেন এতো সাজুনি হয়ে সাজগোজ করে যাওয়ার দরকার নেই।”
শিখা ভাবতো সিনেমাতেই এমন হয়, কিন্তু বিয়ের পর থেকে শাশুড়ি তাকে যে হারে অপদস্থ করেছে, তা সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।
কত শত দুঃস্বপ্নের মতো দিনরাত্রি পার করেছে সে! শিখার রেস্টুরেন্টে খাওয়া, শখের রান্না, নতুন জামা কেনা, দিলদরিয়া স্বভাব – সব কিছুতেই অসন্তুষ্ট তমালের মা।
এ বাড়িতে শিখার রান্না সবাই পছন্দ করে। তারপরেও বন্ধুদের সাথে হ্যাং আউট করে এসে তমাল অসুস্থ হলে তার মা বলতে থাকবে,
” তেল- মশলা খাওয়ায় খাওয়ায় ছেলেটাকে রুগী বানায়ে ফেললো! “

বিয়ের পর দার্জিলিং যাবে বলে সব ঠিকঠাক। রিজিয়া খাতুন তার মেজো মেয়ে তানির জ্বরের চিকিৎসা হচ্ছে না, এ অবস্থায় কী করে ভাই এতোগুলো টাকা খরচ করে বেড়াতে যায় এই নিয়ে তুলকালাম বাঁধালেন। শিখার খুব খারাপ লাগে, লজ্জায় তাদের বেড়ানোর টাকা সে তানির ডাক্তার দেখাতে দিয়ে দেয়, যদিও টাকার জন্য ডাক্তার দেখাতে পারছিলোনা বিষয়টা সম্পূর্ণ মিথ্যে এবং সিজন চেঞ্জের কারণে তানির সামান্য ঠাণ্ডা জ্বর হয়েছিল যা নিয়ে হৈ চৈ করার কোনো দরকার ছিলো না। আসল সমস্যা তমাল আর শিখার বেড়াতে যাওয়া। মধ্যবিত্ত টানাটানির সংসারে আবার কবে তারা ঘুরতে যেতে পারবে তার কোনো ঠিক নেই। ভাবলে এখনো মন খারাপ হয় শিখার।

প্রথম সন্তান জন্মের পর তমাল আর শিখা যখন জীবনের সুন্দরতম সময়টা কাটাচ্ছে, ঠিক তখন, একদিন রিজিয়া খানম শিখাকে একা পেয়ে শুনিয়ে দিলেন, “মেয়ে হয়েছে শুনে তমালের মুখটা এমন আন্ধার হয়ে গেছিল, যেন কেউ মারা গেছে! “বয়োজ্যেষ্ঠ একজন মানুষ, তিনি তমালের মা, তাই বলে এই মিথ্যেবাদিতা শিখার মানতে পারার কথা না। সংসারে নানাবিধ অশান্তি সৃষ্টি করে পরিস্থিতি বেগতিক দেখলেই রিজিয়া খানম কান্নাকাটি জুড়ে দেন, “তোরা শিক্ষিত বলে এই মুখ্যুসুখ্যু, ন্যাকাবোকা মাকে যা খুশি বলতে পারলি “.. যে নিজেকে “ন্যাকাবোকা ” বলে, তার বুদ্ধি যে কম না তা শিখা ভালোই বুঝতে পারে।
বাচ্চার দেখভালের জন্য তিনটা বছর কোনো কাজ করেনি শিখা। তার আগে যে চাকরি করেছে তাতে চরম অসহযোগিতা করেছে তমাল আর তার মা। একটা দিনও শান্তিতে অফিস করতে পারেনি।

তমালের ব্যবসাপাতির অবস্থা দিনদিন অবনতির দিকে। অর্থনৈতিক ভাবে বাবা – মায়ের প্রতি নির্ভরশীলতা বেড়েই চলেছে তার। সেই সাথে শিখাকে সহ্য করতে হয়েছে অমানুষিক গঞ্জনা ।
শ্বশুর একদিন বলেছেন, “হাত- পা ওয়ালা দুটো ছেলেমেয়ে বসে বসে খায় কীভাবে!” কথাগুলো শিখা নিতে পারেনি, তাকে প্রমাণ করতে হবে, বসে খাওয়ার মেয়ে সে না। সিভি জমা দিতে শুরু করে সেই থেকে। ইন্টারভিউ কার্ড আসতে শুরু করলে আলম সাহেবকে কিছুটা লজ্জিত হতে দেখা যায়।
মাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য শিখাকে অবহেলা করতে একটুও বুক কাঁপে না তমালের! এটাই যেন তার চাকরি, ক্যারিয়ার, ধ্যানজ্ঞান। আত্মসম্মানবোধ যার নেই সে অন্যকে কী সম্মান দেবে?

সংসারে ক্রমাগত কোণঠাসা হতে হতে ক্লান্ত শিখা আবার কাজে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিখার মা শারমিন সুলতানা-ই সাহস দিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন নতুনভাবে শুরু করার জন্য। অনেকদিন বাদে মায়ের কাছে যেতে কেমন অস্বস্তি হতো। কী বলবে, কোন মুখেই বা বলবে?
মাঝেমধ্যে মায়ের কাছে গিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থেকে চলে আসে। অস্ফুটে উচ্চারণ করে,
“আর আমি যে কিছু চাহিনে, চরণতলে বসে থাকিব। আর আমি যে কিছু চাহিনে জননী বলে শুধু ডাকিব। “
মাকে কিছু বলতে হয়নি, মেয়ের মুখ দেখেই বুঝে নিয়েছেন সব। মা বলেন, “মানুষ নিজেকে নিজে উদ্ধার করতে না চাইলে অন্য কেউ তা করতে পারেনা। জীবন কঠিন হলে তোমাকে তার চেয়েও কঠিন হতে হবে। সামনে এগোতে চাইলে তোমাকে তো সে পথে পা বাড়াতেই হবে।
বুকে সাহস অর্জন কর, নিজের যোগ্যতাকে সম্মান কর। বহুদূর যেতে হবে মা। “

চাকরির অফার লেটারটা পেয়ে শিখার মনে হয়, যে সময় হারিয়েছে, তা হয়তো আর ফিরে আসবে না। তাই বলে তার এবং তার সন্তানের বাকি জীবনটা সে আর দুর্বিষহ হতে দিতে পারে না। একদিনে আমূল পরিবর্তন আসবে না, কিন্তু এটাই তার মুক্তির পথে অগ্রসর হবার প্রথম ধাপ। মশালের অগ্নিশিখা হয়ে জ্বলে থাকার কথা ছিল তার। সে কেন প্রদীপের সলতেতে নিভু নিভু হয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকাকে মেনে নেবে? বহুদূর পথ যেতে হবে, বহুদূর।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 382
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    386
    Shares

লেখাটি ১,৭০০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.