আমি কি সমাজের জন্য বোঝা?

0

তামান্না ইসলাম:

আমার মা, বাবা, বাংলাদেশের সমাজ সবার ওপরেই মাঝে মাঝে আমার প্রচণ্ড রাগ হয়। হ্যাঁ, এতো রাগ হয় যে ইচ্ছে করে হ্যাঁচকা টানে যদি ওই সমাজটাকে আমি উলটে দিতে পারতাম! ওই সমাজের কারণেই আমি আজ একজন প্রায় পঙ্গু, পরনির্ভরশীল মানুষ হয়ে আছি। অনেক সম্ভাবনা আর স্বপ্ন থাকা সত্ত্বেও এই পঙ্গুত্বের অভিশাপ থেকে আমি সারা জীবনেও মুক্তি পাবো না জানি।

কলেজ জীবনের আগে পর্যন্ত খুব কমই আমাকে একা ছাড়া হয়েছে। ছোটবেলা বিকেলে খেলতে নামলেও সঙ্গে একজন কাজের লোক থাকতো দেখাশোনা করার জন্য। এই বিকেলটুকু ছাড়া বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। কলোনির হাতে গোণা দুই একটা বাসা ছাড়া অন্য কোনো বাসায় যাওয়া নিষেধ। স্কুল থেকে আনা নেওয়া করতো বাবা, মা বা কাজের মানুষ। অনেক বড় হওয়ার পরে বান্ধবীদের সাথে একসাথে আসা যাওয়া করার অনুমতি পেয়েছি।

আমাকে শুধুমাত্র খালার বাসা ছাড়া আর কারও বাসায় রাতে থাকতে দেওয়া হতো না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও না। অথচ আমার ভাইদের কিন্তু স্কুল জীবনের উপরের ক্লাস থেকেই সে নিষেধ উঠে গিয়েছিল। স্কুল জীবনে মার্কেট বা শপিঙে নেওয়া হতো না। যেখানেই যাই সঙ্গে বাবা, মা, কাজের লোক বা ছোট ভাই সঙ্গে যেতো। ক্লাস ফাইভে ওঠার পর আমাকে সালোয়ার কামিজ ধরিয়ে দেওয়া হলো। আমার বান্ধবীরা যখন সবাই নিত্য নতুন ডিজাইনের ফ্রক পরছে, তখন থেকেই আমি পরে গেছি পর্দার যাঁতাকলে।

মাঝে মাঝে ভীষণ মন খারাপ হতো। সুন্দর জামা পরতে পারছি না, গরম লাগতো। বান্ধবীরা বা আনটিরা মাঝে মাঝে মুখের উপরে পোশাক নিয়ে প্রশ্নও করে ফেলতো। এমনিতেই ক্লাস ফোর পর্যন্ত হঠাৎ করে লম্বা হয়ে যাওয়ার কারণে বেশ বিব্রত থাকতাম নিজেকে নিয়ে, তার সাথে যোগ হলো পোশাকের বোঝা। নিজেকে কেমন যেন অন্য বন্ধুদের কাছ থেকে আলাদা মনে হতো, এই অনুভূতিটা মোটেও সুখের নয়।

কলোনিতে বড় হওয়া মেয়ের বাবা, মায়েরা মেয়েরা একটু বড় হলেই আতঙ্কে থাকে। কখন মেয়েরা কোথায় কোন বখাটে ছেলের প্রেমে পড়ে, বাড়ি থেকে অল্প বয়সে পালিয়ে বিয়ে করে ফেলাও কোন বিচিত্র ঘটনা না। মেয়েরা একটু বড় হলেই তাদের ঘরবন্দি করা হয়। আমার বেলায় ঘটলো উল্টো, আমি ক্লাস থ্রি-ফোরে নিজে থেকেই বাইরে খেলতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম। এর একটা প্রধান কারণ ছিল আমি যাবতীয় খেলাধুলায় ভীষণ খারাপ। আমার শারীরিক ব্যাল্যান্স খুব খারাপ। বেশিরভাগ মেয়েই আমার চেয়ে বয়সে বড় ছিল, সোজা কথায় আমি তাদের সাথে বন্ধু হয়ে উঠতে পারিনি।

আমার বাবা, মা মহাখুশি হয়ে গেলেন। যাক বাবা, মেয়েকে জোর করে গৃহবন্দি করতে হবে না। তারা একবার খতিয়ে দেখলেন না যে, কী ভীষণ মনোকষ্ট থেকে আমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম। সে সময়ে আমার খুব দরকার ছিল তাদের সাথে এসব ব্যাপারে খোলাখুলি আলোচনা হওয়া। আমার পরবর্তী জীবনে এর প্রভাব রয়ে গেছে প্রচুর।

এই কারণগুলোর জন্য শুধু আমার বাবা, মা দায়ী নয়। সমাজ মেয়ের নিরাপত্তা দিতে পারতো না বলেই হয়তো তারা সাহস করে এসব নিয়ম ভাঙ্গেননি, মেয়েকে সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থায় রেখে বড় করতে চেয়েছেন। হয়তো আমিও তাদের জায়গায় থাকলে তাই করতাম।

একমাত্র মেয়ে হিসেবে আমি প্রচুর আদর পেয়েছি। আদর পাওয়া খারাপ কিছু না। কিন্তু যেটা খারাপ সেটা হলো, আমার কখনওই কোনো সমালোচনা করা হয়নি। আমাকে জোরে কিছু বলা হয়নি। আমাকে এমনভাবে আগলে রাখা হয়েছে যেন আমি কোন প্রতিকুল পরিস্থিতির সম্মুখীন না হই। আমাকে কোনো শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়নি। আমাকে কখনওই ভীষণ তর্ক, বাদানুবাদ এসবের মধ্যে যেতে হয়নি। আমার ব্যক্তিত্ব ছিল ভীষণ নরম, সেই নরম ব্যক্তিত্বকে আমার পরিবার তুলোয় মুড়ে আরও নরম করে দিয়েছে। এতে করে আমি মানসিক এবং শারীরিকভাবে ভীষণ দুর্বল একজন মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠেছি।

আমি যখন ক্লাস সেভেন উঠি, সেবারই প্রথম ময়মনসিংহে মেয়েদের ক্যাডেট কলেজ খোলা হয়। আমার ভীষণ শখ ছিল সেখানে ভর্তি হওয়ার, পরিবার থেকে অনুমতি মেলেনি। যখন ইন্টারমিডিয়েট শুরু করবো, তখন হলিক্রস বা ভিকারুন্নেসাতেই বেশিরভাগ ভাল ছাত্রীরা পড়ে। দুটোই বাসা থেকে দূরে, সেই অজুহাতে পড়তে হলো বদরুন্নেসা কলেজে। অথচ আমার বাবা, মা আমার পড়ালেখার ব্যাপারেও বেশ যত্নবান ছিলেন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপত্তা। কোন রকমে একটা স্ট্যান্ড হলো। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরে খুব ইচ্ছে ছিল বিদেশে পড়তে যাবো। জানি, আমেরিকা যাওয়ার পড়ার খরচ পরিবার দিতে পারবে না। তাই নিজে নিজেই জাপানের মনোবসু স্কলারশিপের দরখাস্ত করলাম। আবারও বাদ সাধলো পরিবার। এতো অল্প বয়সে বিদেশে যাওয়া যাবে না।

বুয়েটে ভর্তি হলাম। কিন্তু সেই সন্ধ্যার মধ্যে বাড়ি ফেরার নিয়ম বলবৎ থাকলো ঠিকই। টিউশনি করেছি স্কুল জীবন থেকেই, কিন্তু সবই নিজের বাসায়। বুয়েটে পড়ার জন্যও কখনো হলে থাকা হয়নি। পরীক্ষার ফলাফল হচ্ছিল বেশ ভালো। তৃতীয়-চতুর্থ বর্ষে যেতে যেতে সবাই বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে। জিআরই, টোফেল দিচ্ছে। আর আমি প্রস্তুতি নিচ্ছি বিয়ের। কারণ ততদিনে বুঝে গেছি ফার্স্ট হও, সেকেন্ড হও, যাই হও, পরবর্তী একমাত্র কর্মসূচি বিয়ে। বুয়েট থেকে দুটা স্বর্ণ পদক পেলাম ঠিকই, তবে তার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হলো।

সৌভাগ্য, নাকি দুর্ভাগ্য জানি না, এক তুলোর বাক্স থেকে আরেক তুলোর বাক্সে হস্তান্তর হলাম। অবশ্য উপায়ও ছিল না। চব্বিশ পঁচিশ বছর তুলোয় মোড়া থাকার পর সেই মানুষকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে বললে তার নিজেরই আর সাহস হয় না সোজা হয়ে দাঁড়াতে। তাই, আমি যদি বলি, এতো বছর বিদেশের নিরাপদ পরিবেশে থেকেও, অনেকদিন ধরে চাকরি করেও, উনিশ বছরের ছেলে আর তের বছরের মেয়ের মা হয়েও আমার সন্ধ্যার পর একা বাইরে থাকতে অস্বস্তি হয়, আমার অচেনা, অজানা রাস্তায় গাড়ি চালাতে ভয় হয়, ট্যাক্সিতে একা উঠতে আতঙ্ক হয়, চাকরির প্রয়োজনে অন্য শহরে একা বসবাস করতে অনেক চিন্তা করতে হয় সেটা কী আমার দোষ, নাকি আমার দুর্ভাগ্য যে মেয়ে বলে আমাকে সেভাবে ছোট থেকে বড় করা হয়নি?

আমাকে নিয়ে যখন কেউ হাসে ‘তুমি এটা পারবে না বলে’, বা আমার ছেলে, মেয়েরা আমার উপরে ভরসা করতে পারে না একজন শক্তিশালী, নির্ভরশীল মানুষ হিসেবে, সেই যন্ত্রণা যে কীভাবে কুড়ে কুড়ে খায় সেটা বোঝানো অসম্ভব। আমার মনে হয়, কী লাভ হয়েছে বুয়েট থেকে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে? আমি তো আসলে সমাজের জন্য এক ধরনের বোঝাই, একজন মানসিকভাবে পঙ্গু মানুষ, শারীরিকভাবে পঙ্গু মানুষের মতোই বিরাট বোঝা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ১,৩১৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.