তাজউদ্দীন আহমদঃ পর্দার অন্তরালের নায়ক

taj uddinআমিনুল হক পলাশ: “দীর্ঘ পথ শ্রমে ক্লান্ত। সীমান্ত থেকে সামান্য দূরে বৃটিশ আমলে তৈরি কালভার্টের উপর শরীর এলিয়ে দেন। তাঁর অবসন্ন চোখের পাতায় নেমে আসতে চায় রাজ্যের ঘুম। না, তিনি ঘুমিয়ে পড়েননি। তিনি ঘুমিয়ে পড়লে তো চলবেনা। দেশ স্বাধীন করতে, স্বাধীন দেশকে ভূমিষ্ঠ করাতে তিনি তো নিজেই ধাত্রী। তাঁর চোখে তো ঘুম শোভা পায়না। তাঁর ভাষায়, ‘আমি সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা হলো : একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার জন্য কাজ শুরু করা।’ (তাজউদ্দীন আহমদ-ইতিহাসের পাতা থেকে। পৃষ্ঠা-২৯১)।”

হ্যাঁ, আমি তাজউদ্দীন আহমদের কথা বলছি। আমি বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর কথা বলছি। আমি একজন মহাবিপ্লবী স্বপ্নদ্রষ্টার কথা বলছি। আমি একজন অকুতোভয় নেতার কথা বলছি। মূলত তার উদ্যোগেই ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়েছিল। সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে এটি ছিল এক অনন্য পদক্ষেপ। এই সরকারের সুযোগ্য নেতৃত্বেই পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় নতুন এক বিস্ময়ের, যার নাম বাংলাদেশ। অতএব নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশের জন্মের সাথে ওতোপ্রতো ভাবে জড়িয়ে আছেন তাজউদ্দীন আহমদ। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন এই মহান মানুষটি।

আজ তাজউদ্দীন আহমদের জীবনী লিখব না। সেই গল্প না হয় অন্যকোন দিনের জন্য তোলা থাকুক। আজ উনার জীবনের কিছু মুহূর্তের কথা বলব, কিছু খন্ডচিত্র তোলে ধরার চেষ্টা করব। এথেকেই বোঝা যাবে কত মহান ছিলেন এই মানুষটি।

১৭ই এপ্রিল, ১৯৭১। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ কে প্রধানমন্ত্রী করে গঠন করা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহন শেষ হল মেহেরপুরের বদ্যিনাথ তলার আম্রকাননে । এবার ভারতে প্রবেশের পালা। সেখান থেকেই আপাতত রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এই সরকার। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ছাড়া ভারতে প্রবেশে অস্বীকৃতি জানান তাজউদ্দীন আহমদ। কারণ এতে বাংলাদেশের মর্যাদাহানি হবে। অবশেষে ভারত সরকার যথাযথ মর্যাদা সহকারে গার্ড অব অনার দিয়েই বরণ করে নেয় নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারকে। দেশের মর্যাদা প্রসঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন এমনি আপোষহীন।

১৯৭১ সালের ৪ঠা এপ্রিল ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয় নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের। এই বৈঠকে উপস্থিত হতে বেশ কিছুক্ষন দেরি হয়েছিল তাজউদ্দীন আহমদের। এর কারণ ছিল বাইরে পড়ে যাওয়ার মত তাঁর একমাত্র শার্টটি উনি ধুয়ে দিয়েছিলেন এবং এটি শুকাতে দেরি হয়েছিল। এতোটাই সাধাসিধে ছিল উনার ব্যক্তিজীবন। ভারতে অবস্থানকালীন সময়ে উনি থাকতেন ৮নং থিয়েটার রোডের প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর অফিস কক্ষের পেছনে লাগোয়া একটি কক্ষে। একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উনি বিন্দুমাত্র অতিরিক্ত সুবিধাও গ্রহন করেননি। এমনকি, ১৯৫৯ সালের ২৬শে এপ্রিল উনি যখন সৈয়দ জোহরা খাতুল লিলির সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তখন অলংকার হিসেবে নববধূকে দিয়েছিলেন একটি বেলী ফুলের মালা। এর বেশি কিছু দেয়ার সামর্থ্য তাঁর ছিল না। নিতান্ত সাধারণ পোশাক আর মোটা ফ্রেমের চশমা পরা এই অসাধারণ মানুষটির জীবনে শৌখিনতা বা বিলাস বলতে যেটুকু ছিল তা তাঁর ভাষায়- ‘আমার আর কিছু না থাক চুল আঁচড়াবার বিলাস আছে। হোক সামান্য, তবুতো বিলাস।'(তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি ১ম খন্ড) একজন রাজনৈতিক নেতার সাধাসিধে জীবন যাপনের এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসেই বিরল।

২৫শে মার্চের কালোরাত্রির পর ভারতে উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার আগে তাজউদ্দীন আহমদ পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করে যেতে পারেননি। স্ত্রীর উদ্দেশ্যে উনি একটি চিরকুট লিখে রেখে গিয়েছিলেন যাতে লিখা ছিল, “সাড়ে সাত কোটি মানুষের সাথে মিশে যেও”। এমনি দেশদরদী ছিলেন এই মানুষটি যার কাছে পরিবার পরিজনের চাইতেও দেশের স্বার্থ ছিল শত সহস্রগুণ বড়।

ইয়াহিয়া-ভুট্টোর সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিটি আলোচনায় তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন ফাইলপত্র নিয়ে নিয়মিত হাজির হওয়া গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী, যিনি তাঁর দাবির ব্যাপারে সবসময়ই থাকতেন অনড়। ইয়াহিয়া খানও তাজউদ্দীনকে ভয় করতেন। কারণ আলোচনার টেবিলে তিনি ছিলেন খুবই কঠোর, কোনো ছিটেফোঁটা আবেগও তাঁর মাঝে কাজ করত না। দূরদর্শী এই নেতা ছিলেন জাতির পিতার চরম আস্থাভাজন। তাঁর প্রতিটি মতামতকেই জাতির জনক যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতেন। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে বঙ্গবন্ধু পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট যে দলীয় হাই কমান্ড গঠন করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন তাঁর অন্যতম সদস্য। জাতির পিতার এই আস্থার প্রতিদান উনি দিয়ে গেছেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। কর্মময় জীবনে উনি কখনোই নিজ কৃতিত্বের দাবি করেননি। কর্তব্য বিবেচনা করে নিঃস্বার্থভাবে, একাগ্রচিত্তে কাজ করে গেছেন। বলেছেন, “মুছে যাক আমার নাম কিন্তু বেঁচে থাক বাংলাদেশ।”

আজ এই মহান নেতার জন্মদিন। আজ থেকে ৮৮ বছর আগে ১৯২৫ সালের ২৩শে জুলাই শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ের, গজারি বনের ছায়াঘেরা, ঢাকার অদূরে কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে এক মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন তাজউদ্দীন আহমদ। ৮৮তম জন্মদিনের প্রাক্কালে এই মহান নেতার প্রতি রইল শত সহস্র সালাম ও শ্রদ্ধাঞ্জলী।

হে মহান নেতা, দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে না ফেরার দেশে অনেক ভালো আছেন আপনি। সেখান থেকে আমাদের জন্য শুধু দোয়া করবেন, আমরা যেন আপনার আদর্শ বুকে ধারণ করে নিঃস্বার্থভাবে এই দেশের জন্য কাজ করে যেতে পারি। এই দুখী বাংলাকে আক্ষরিক অর্থেই সোনার বাংলায় পরিণত করতে পারি। নিশ্চিতভাবেই জানি এটা করতে পারলে আপনার থেকে বেশি খুশি খুব বেশি কেউ হবে না।

লেখক পরিচিতি: ছাত্রনেতা ও অনলাইন এক্টিভিস্ট

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.