পূণ্য পাপে ডুবে থাকুক জীবন তবে! হায় জীবন!

0

পৃথা শারদী:

ডুব সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম , মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী সিনেমাটি ভালো বানিয়েছেন বটে, স্থান- কাল- শব্দ শৈলী তার কাজ ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে। লাল ইটের সাথে সবুজের বন্ধুত্ব, এলিভেশনের ডিটেল দেখানো, কালো গাড়ির ছাদে ঝুম বর্ষণ, কনক্রিটের সিঁড়িগুলোর সাথে কাঁচের দেয়ালের সখ্যতা, ওপাশে কৃষ্ণচূড়া গাছের হাতছানি, ডাবল হাইটের লুকোচুরি, কাঁচের রেলিং, হালকা চালে মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এক জলাশয়ের ছোঁয়া, এক কথায় লা-জবাব।

স্থাপত্যকলায় পড়েছি বলে সিনেমা দেখতে খারাপ লাগেনি, বরং মনে হয়েছে আর্কিটেকচারাল ভালো ডকুমেন্টরি এ হতে পারতো। যাই হোক মোদ্দা কথায় ফিরে আসি, লেখাটা পড়লে কেউ ভাবতে পারেন ডুব সিনেমার রিভিউ দেয়া হচ্ছে , লেখাটি ডুব সিনেমার কোন রিভিউ নয় ,শুধু এটা চোখে আংগুল দিয়ে দেখানো আমাদের মুক্তমনা হৃদয়ে কত সংকীর্ণতা বাস করে।

সিনেমার কাহিনী প্রায় সবারই জানা ,কারো সাথে মিল আছে কিনা ,এ তর্কে আমি যাবো না , সংক্ষেপে কাহিনীর সারমর্ম, একজন বিবাহিত যশস্বী পুরুষের সাথে এক অবিবাহিতা রমনীর অসম প্রেম, পরকীয়া, পুরুষটির সংসার ছেড়ে নতুন সংসারে প্রবেশ, সমাজের ঘৃণা, সমাজের সমালোচনা নিয়ে বেঁচে অবশেষে মৃত্যুর মাধ্যমে ভদ্রলোকের মুক্তি।

কোনো সিনেমা এমন হতে পারে কি পারে না, হলে কি হয়, না হলে কি হয়, কী হবে, এমনটা হতে পারে কিনা পারে, এ বিতর্ক তোলা থাকলো বোদ্ধাদের জন্য। প্রশ্ন তুলছি সিনেমায় দেখানো দ্বিতীয় প্রেম নিয়ে, যে প্রেম সমাজের জন্য এখনো ট্যাবু ,সিনেমাটায় কী নেতিবাচকভাবে একটি চরিত্রকে তুলে ধরা হয়েছে ! যেমন তুলে ধরা হয়, এই সমাজে।

সমাজের নিয়মানুসারে প্রথম ব্যতীত একাধিক প্রেমে পুরুষের কোনো হাত থাকে না, দ্বিতীয় প্রেম কিংবা বিয়ে যা কিছুই হয় না কেন পুরুষ ঠিক সম্পর্কে জড়াবেন না, বিবাহিত হলে তো প্রেমে আরো পড়বেন না (যেন তার মস্তিষ্ক মন সব দাসখত দিয়ে লিখে দিয়েছেন বউকে!), তাকে কালোজাদু করে প্রেমের ফাঁদে ফেলা হয়, দ্বিতীয় প্রেমে কোন সুখস্মৃতি জমে না, জমে শুধু শরীর আর স্বার্থ! দ্বিতীয় প্রেমে ভালোবাসা বলে কোথাও কিছু নেই, যা আছে তা হলো মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং! এসব প্রেম হয় টাকার কারণে, শান-শওকতে, কোনো এক জাদুটোনায় , তারপর হঠাত ফাঁদে পড়ে (!) ঘরের শান্ত সুবোধ পতিদেব বউ সংসার ছেড়ে অন্যদিকে দৌড়ায় !

বলা কওয়া ছাড়া দুম করেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রাপ্তমনস্ক ভদ্রলোক তাঁর সংসার সন্ততি ছেড়ে তাঁর হাঁটুর বয়সী এক মেয়েকে বিয়ে করে নিয়েছেন, তা কেবলমাত্রও শুধুমাত্র শরীরের জন্য! আজকাল ঘোমটা পরে খ্যামটা নাচা এই সমাজে শুধুমাত্র শরীর শরীর প্রেমের লাগি কোনো নারীর সাথে প্রেম বিয়ে পর্যন্ত গড়ালো, এমন বিদঘুটে চিন্তায় হাসবো না হাসি বন্ধ করে চোখ কপালে তুলবোো, তাই বুঝি না!

সিনেমায় ফিরে আসি, প্রথম থেকে শেষ, প্রতিটি শটে দেখানো হয়েছে, দ্বিতীয় নারী, দ্বিতীয় প্রেম মানে পাপ, সব দোষ একমাত্র নীতু’র, জাবেদ খানের আদৌ কোন দোষ ছিল না। বস্তুত সমাজও ঠিক একইভাবে প্রত্যেক নারী্র দিকে কাঁদা ছোড়ে, এ সিনেমা সমাজেরই এক স্বচ্ছ প্রতিচ্ছবি।

এই সমাজের চিত্র তুলে ধরি যদি তো;
বিবাহিত পুরুষের সাথে অবিবাহিতা নারীর প্রেম; আংগুল তোলো মেয়েটির দিকে। মেয়েটির টাকার লোভ ছিল, মেয়েটি লোকটিকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছে, মেয়েটির মাঝে আর যাই কিছু থাক না কেন, প্রেম ভালোবাসা ছিল না এবং অবশ্যই পুরুষটি গোবেচারা, চপলা রমণী যা বলবেন তাই করতে রাজী!

অবিবাহিত পুরুষের সাথে বিবাহিতা নারীর প্রেম; চোখ চলে যায় নারীর দিকে। মহিলার ঘরে মন টেকে না, স্বামী সন্তানের প্রতি টান নেই, এদের জন্যই এমন সংসার ভাংগে। কখনোই মুখ ফুটে বলা যাবে না , মহিলাটি ঘরে বসে স্বামীর মার খাচ্ছেন, স্বামীর পরকীয়া দেখে, প্রতিরাতে ধর্ষণের শিকার হয়ে তার মানসিক শান্তি আজ অন্য পুরুষে। পুরুষ এখানেও দুধে ধোয়া তুলসী পাতা!

বিবাহিত পুরুষের সাথে বিবাহিতা নারীর প্রেম; অবশ্যই নারী দায়ী! নিজের স্বামী থাকা সত্ত্বেও অন্যের স্বামী নিয়ে টানাটানি, কাড়াকাড়ি, মারামারি! স্বামী যেন দোকানের পুতুল! নিজের তার মান অভিমান নেই! নিজের পছন্দও নেই, ইচ্ছা আহ্লাদ তো আরো নেই!
এ সমাজের মতে যা কিছু নিন্দিত তার দোষ দেব নারীকে আগে, পুরুষরা এ ব্যাপারে শিশু শ্রেণির ছাত্র, তা সে ছাত্রের বয়স হোক পঁয়ত্রিশ, কী পঞ্চাশ! তাতে যায় আসে না কিছু!
আচ্ছা?
কোথায় লেখা আছে ,অসম প্রেম প্রেম হয় না?
বিবাহিত জীবনের পরে দ্বিতীয়বার ভালোবাসায় সাঁতার কাটা যায় না?
যদি দ্বিতীয়বার তৃতীয়বার কিংবা হাজার বার প্রেমে পরা হয়ও, তাকে বৈধতা দেয়াও বৈধ কাজের মধ্য পড়ে না?
এখানে বলা চলতেই পারে, সংসার বড় অদ্ভুত! দায়িত্ব আসে, দায়বদ্ধতা থাকে, মন্দ হোক ভালো হোক, তা টিকিয়ে রাখতেই হবে, তবে এটাও কি ঠিক নয়, এক মরে যাওয়া সম্পর্ককে বাঁচানোর বৃথা চেষ্টা না করে, পরকীয়ায় না জড়িয়ে, সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখতে শেখা?

আমজনতা থেকে শুরু করে খ্যাতিমান যত মানুষ আছেন সকলে, যাই বলি আর তাই বলি না কেন, দোষ চাপে ওই নারীর ঘাড়েই।
সত্যজিত-মাধবীর সেই প্রেমে সত্যজিত রায়ের ঘর টিকেছিল বটে, তবে মাধবী দেবীকে তাঁর স্বামী মেনে নেননি, পাক্কা নায়িকা মাধবী দেবী সবার চোখে ভিলেন হয়েছিলেন, এ নিয়েই তো আবহমান সিনেমাটি, সে সিনেমা দেখে তো মনে হয়নি দোষ শুধু মাধবী দেবীরই ছিল? কেন মনে হয়নি, হয়ে গেল মানে হয়েই গেল? হয়ে গেছে মানে হয়ে গেছে !
ভাবছেন কলকাতা, মানে ওপার বাংলার কথা বলছি, এপার বাংলায় কেন আসছি না?

এপার বাংলায় এক অভিনেতা জুটি’র বন্ধুত্ব থেকে প্রেম, একসময় ভদ্রমহিলা বের হয়ে আসলেন, বিয়ে করলেন বেশ কনিষ্ঠ এক নাট্যকারকে, এ প্রসঙ্গে তাঁকে এক টকশোতে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছিলেন, বন্ধুত্ব ছিল না তাই বেরিয়ে এসেছি। বলা হয়েছিল, টাকার জন্যই সে অভিনেতাকে ঘর ভাঙ্গিয়ে বিয়ে করেছিলেন তিনি, ফাঁসিয়ে ফুসলিয়ে! মানসিক শান্তি আর স্বস্তিকে কেউ যেন দেখলেনই না !

এক স্থপতি দম্পতিকেই বা কেন ছাড়ি! একাধিকবার বিয়ে করা এক স্থপতির সাথে ঘর বাঁধার সময় পোর্টালগুলোতে খবর এসেছিল তৃতীয়বারের মতো এক অভিনেত্রী-স্থপতি ঘর বাঁধছেন ! কী পাপ ! কী মহা পাতকিনী তিনি!

গুণীজনদের শুধাই, কিছু দেখার সময় শুধু কি নারীর দোষ গুণ বিচার করলে চলে?
আর সব শেষে আছেন ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল উদাহরণ, এক সাহিত্যিক-অভিনেত্রী জুটি। এ পর্যন্ত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই অভিনেত্রীকে ডাইনী বলেছেন, ঘর ভাংগানী বলেছেন, টাকার লোভে লোভী এক নারী বলেছেন, বারবার বলেছেন বাবার বয়সী লোকের সাথে প্রেম, এ শুধু ওপরে উঠার মোহ!

আমি সবার কাছেই প্রশ্ন করছি ,সাহিত্যিক ভদ্রলোক কি অবুঝ ছিলেন? অন্ধ ছিলেন? নাকি তাঁর মাথা ছাড়াও মন বলেও কিছু একটা ছিল, যা বুঝতে পেরেছিল যেখানে অন্তঃসার শূন্য সংসার নামের খোলসকে ধারণ না করে যেখানে মন বলে সেখানেই থিতু হওয়া ন্যায্য!
বাংলা সমাজ এমন এক সমাজ, এখানে পরকীয়া করলে লোকে বাহবা দেয়, এটা ভেবে সংসার টিকে আছে, দাঁতে দাঁত চেপে চালিয়ে নেয়া সংসার, সে সংসারের পাশাপাশি ডাবল টাইমিং দেখে পেছনে সবাই দু এক কথা বলে কাষ্ঠ হাসি হাসে; তবে পরকীয়া থেকে বের হয়ে, সত্যিকার অর্থে যদি ঘর বাঁধে, পিঠ চাপড়ে দেয়ার মতো কাজ করে, তখন বোঝা যায় সমাজের পিছপা হওয়া দেখে বুঝি সমাজ কোথায় আছে , আমরা কোথায় আছি , আমাদের মনের ভেতরটা কত অন্ধকার আর স্যাঁতস্যাঁতে!

আরে! এই নষ্ট সমাজে ভোগ করে, পরকীয়া করে যেসব মানুষ সুখে থাকেন তাদের থেকে কিছুটা হলেও বেশি সম্মান নিশ্চয়ই পাবার দাবি রাখেন সেসব মানুষ যারা নতুনভাবে নিজেদের জীবন সাজিয়েছেন!
হোক তা ভুল, হোক তা ঠিক! একজন মানুষের জীবন কেমন ধারায় বয়ে যাবে, কাকে সে সঙ্গী করবে, এসব ঠিক করে দেবার আমরা কে! তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলার অধিকার পাই কোত্থেকে আমরা!

এই সমাজে আমরা কারো বৌ, কারো স্বামী, কারো মা, কারো বাবা, কারো সন্তান, তবে আমরা এটা বারবার ভূলে যাই, আমরাও মানুষ! এতো পরিচয়ের মাঝে নিজেদের ভুলে গিয়ে অশান্তি নিয়ে আমরা দিন কাটিয়ে যাচ্ছি! এই নশ্বর জীবনে কোনকিছুই অবিনশ্বর নয়, একজনেই যে প্রেম সারাজীবন টিকে থাকবে এ মনে করা একই সাথে যেমন সম্ভব, তেমনি অসম্ভব, সম্পর্ক ভাঙ্গবে, সম্পর্ক গড়ে উঠবে ,দু হাত এক হলেই তা হয়, তাই নারীকে একা দোষ দেয়া কি আদৌ ঠিক? পুরুষ যদি হাত না বাড়ান একা একা কি ইট পাথরের ঘর বাঁধা যায় নাকি!

তাই দোষ যদি দিতেই হয় দু’হাত ভরে নরনারীকে দেই না কেন?
এক নারীকে দোষ দিলেই কি শোধ ওঠে নাকি!
জীবনকে নিয়ে তাই বলাই যায়, পাপে পূণ্য কাটুক তবে সবার জীবন! হায় জীবন ! আহারে জীবন !

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares

লেখাটি ৫,৯৪৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.