‘ডুব’ কি সম্পূর্ণ যন্ত্রণা দেখাতে পেরেছে?

সালমা লুনা:

‘ডুব’ কতটা সিনেমা আর কতটুকুই বা বাস্তব, এটা ছাড়াও অবশ্যাম্ভাবী যে বিতর্কের জন্ম দেবে বলে ধারণা ছিলো তা অবশেষে শুরু হয়েছে।

বিতর্কের বিষয় অবশ্য একটা না। বিষয়টা ভেঙে বলতে গেলে বেশ কয়েকটাই হবে। পরকীয়ায় আমি তুমি আর সে এই তিনের মধ্যখানে দোষী কে এটা নির্ধারণের চিরন্তন বিতর্ক। পরকীয়ার ভালো খারাপ। অসম বয়সী সম্পর্কের ন্যায় অন্যায়। পরিবার ভাঙার দায়। সন্তানের দায়।

মোটের উপর শেষ নেই বিতর্ক।
ফারুকী বিষয়টা বেছেই নিয়েছেন এমন। যদিও আমার কাছে বিষয় হিসেবে এটি বর্তমান বিবেচনায় অত্যন্ত সম্ভাবনাময় লেগেছিলো।

আমি সিনেমা হলে সমাজের জ্বলন্ত বা বহুল চর্চিত একটি বিষয় নিয়ে ফারুকীর চিন্তাভাবনার প্রাপ্তমনষ্কতা বা মুন্সীয়ানা দেখতে গিয়েছিলাম আসলে।
তার ভক্তদের মতে তিনি একজন চিন্তাশীল সৃষ্টিশীল ও তার সৃষ্টির জন্য দেশ বিদেশের নানাবিধ চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া মানুষ। সেই মানুষটি যখন এইরকম পরকীয়া এবং অসম বয়সী প্রেমের সম্পর্কের মতো বিষয় নিয়ে সিনেমা বানান তখন সেটি আমাদের নতুন কি চিন্তা করতে বাধ্য করে সেইটি নিয়েই আমার বেশ একটা উগ্র আগ্রহ ছিলো।
ভেবেছিলাম তিনি নির্মোহভাবে আমাদের দেখাবেন পরকীয়ার ফলে পারিবারিক সম্পর্কের বুনন কেমন রূপ ধারণ করে আর আমরা চিন্তা করে নেবো বাুঁকিটা। হয়তো নতুন করে কিছু ভাবতে বাধ্য হবো অসম বয়সী প্রেম নিয়ে- এমনটাই ভেবে বসেছিলাম।
বিখ্যাত পরিচালকগণ তাদের বিখ্যাত সিনেমাগুলোতে এমনটাই করে দেখিয়েছেন।

ডুব সিনেমা নিয়ে বিখ্যাতদের সাথে যখন তার তুলনাই চলছে তখন বলতেই হয় বিখ্যাত কোন পরিচালকের ছবির কোন চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত বা অনুভূতি এবং বহুদিন ধলে লালন করা সমাজের ঘুণে ধরা চিন্তার মেলবন্ধন ঘটিয়ে মগজের কোষে করে দর্শককে বয়ে আনতে হয় না, যেমনটা ফারুকী করেছেন বা করতে চেয়েছেন।

এখানেই ফারুকী আমার সাথে সম্ভবত আমার মতো আরো অনেকের চিন্তা এবং আশা বা এক্সপেক্টেশনের সাথে ঠিক প্রতারণা বলবো না ইনজাস্টিস বা অবিচার করেছেন।

এবং এখানেই নীতু চরিত্রটির সাথে তিনি অবিচার করেছেন। এমনকি কায়দা করে মায়া চরিত্রটিকেও জাভেদের পরকীয়ার জন্য দায়ী দেখিয়েছেন। শুধু জাভেদকে সুকৌশলে অবস্থার শিকার হিসেবে দেখিয়েছেন।

উনি যখন সিনেমাতে দেখান নীতু দেয়াল টপকে একাকি পরিচালকের সান্নিধ্য পেতে রাতের আঁধারে নয়নতারা নামক শুটিংস্পটে চলে আসে। জাভেদের একলা থাকার দিনে খোঁজ নিয়ে বা খাবার পাঠিয়ে তার ঘনিষ্ঠ হতে চায়, বৃষ্টিতে ভিজে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। এমনকি ফারুকী যখন জাভেদের কন্যা সাবেরির মুখ দিয়ে বলিয়ে নেন, নীতু যখন কোনভাবেই সাবেরিকে হারাতে পারবে না, তখনই সে পরিচালককে বিয়ে করে শুধু জিতে যেতে চায়- তখন এই ঘটনাগুলি বলে না যে ফারুকী পরিচালক হয়ে নির্মোহ ছিলেন ঘটনা বিন্যাসে। বরং তিনি পরিচালকের দ্বিতীয় স্ত্রী নীতুকে দোষী প্রমাণে বেশ তৎপর -এমনটাই দেখা যায়। দ্বিতীয় স্ত্রীকে নেগেটিভভাবে উপস্থাপনের কারণ হয়তো এটাই যে, লোকে এমনটাই ভাবতে ভালোবাসে বা ভেবে নেয়। এখানটাতেই সমাজের ঘুণে ধরা চিন্তার সাথে মিলে যায় একজন পুরষ্কারজয়ী পরিচালকের ভাবনা।

উনি অস্বীকার করলেও ছবিতে হুমায়ুন আহমেদ, শাওন, গুলতেকিন, শিলা আর নুহাশকেই না শুধু তার দখিন হাওয়া নুহাশপল্লীকেই কি স্পষ্ট দেখেনি দর্শক প্রতিমুহুর্তে?

এইরকম অসংখ্য হুমায়ুন শাওন গুলতেকিন আর শিলারা আছে সমাজে। আছে পরকীয়া। আছে ভাঙা সংসারের যন্ত্রণা। সামাজিক হেনস্থা। আত্মহত্যা। মাদকাসক্তি। এবং অনেক অনেক অপরাধ। এমনকি হত্যা পর্যন্ত।

প্রেম একা করা যায়না। দুজন মানুষ লাগে প্রেম করতে। দুজনের সম্মতিতে প্রেম হয় । সেটি পরকীয়া হোক কিংবা স্বকীয়া। সেই প্রেমের দোষগুণ যা কিছু তা ওই দুজনেরই। দায়দ্বায়িত্বও তাদের দুজনের।
দায় যদি মেয়েটির হয় সংসারী এক বয়ষ্ক পুরুষকে ভাগিয়ে আনার, তবে সেই একই দায় বর্তায় সংসারত্যাগী দ্বায়িত্বহীন পুরুষটির উপরেও।
তবে আমাদের সমাজ সবসময়ই কারো না কারো প্রতি একচক্ষু আচরণ করে থাকে।
সমাজ নারীর প্রতি খড়্গহস্ত সবসময়। দোষও তাই বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই নারীর বলেই জানা এবং মানা হয়। এক্ষেত্রেও তাই করে দেখিয়েছেন ফারুকী।

আমজনতা যা ভাবেন যেভাবে দেখেন, একজন লেখক পরিচালক এবং সৃষ্টিশীল মানুষকে সেভাবে ভাবলে, দেখলে চলে না। আরেকটু এগিয়ে, আরেকটু বেশি, আরেকটু ভবিষ্যতে গিয়ে তাঁকে দেখতে হয়। তাকে গড়পরতা মানুষের মতো ভাবলে চলে না যে, নারীই পুরুষটিকে ফুসলাতে বা প্রোভৌক করতে চেষ্টা করেছে। তাকে দর্শকের মগজে কৌশলে ঠুসে দিলে চলে না যে স্ত্রীর উদাসীনতা, স্বামীকে ফেরানোর চেষ্টা না করা এবং চলমান দাম্পত্যের শীতলতাই পরকীয়াকে ডেকে এনেছে। এগুলো কাহিনীতে এলেও তাকে খুবই নির্মোহভাবে দেখাতে হয়।

পুরুষের তেমন কোন দোষ নাই পরকীয়াতে। সে অসহায়। সে অবস্থার শিকার। সে কেবলি নাকানিচুবানি খাওয়া এক অসহায় মানবসন্তান যার শেষ পরিণতি মৃত্যু এবং মৃত্যুতেই তিনি মহান।

স্ত্রীর সাথে সম্পর্কের শীতলতা চলাকালীন পর যে নারী তাকে রেঁধে এনে খাওয়াবে, শরীর স্বাস্থ্যের খোঁজ নেবে, যে নারীর সাথে সে সিগারেট ভাগাভাগি করে খাবে, যে একটু মানসিক প্রশান্তি দেবে,সেই নারীর সাথে প্রেম করা পুরুষটির হক !
স্ত্রী ছেলেমেয়ে নিয়ে আলাদা থাকলে পতির পরকীয়াই গতি এবং জাভেদ চরিত্রটির প্রতি ফারুকীর পক্ষপাতিত্বে এটিই প্রতীয়মান হয়েছে।

এইরকম কাহিনী দেখিয়ে আবেগপ্রবণ বাঙালি সমাজে বাহবা পাওয়া যায়। রাজা রাণীর সুখী রাজত্বে একটা ডাইনীকে দেখাতে পারলেই হাততালি পাওয়া যায়, পরকীয়াও হয়তো জায়েজ হয়ে যায়, কিন্তু বাস্তবে যে পরিবারের বাবা বা স্বামীটি সন্তান এবং স্ত্রীকে ফেলে রেখে চলে যায় সে পরিবারের সীমাহীন বেদনা অদেখা, অধরাই রয়ে যায় সিনেমার রূপালী পর্দায়।
সে অর্থে ‘ডুব’ যে গোলাপের শয্যা শুধু নয় – একটি কণ্টকাকীর্ণ জীবনের ছবি, এটি সম্পূর্ণ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে বলা চলে।

শেয়ার করুন:
  • 849
  •  
  •  
  •  
  •  
    849
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.