একজন রিসিলার মৃত্যু (?) এবং সাংবাদিকতার দায়

0

জেসিকা ইরফান:

রিসিলাকে আমি চিনতাম, তবে মডেল রিসিলাকে নয়, বনানী কবিরের মেয়ে রিসিলাকে।
আজ থেকে প্রায় দশ বৎসর আগে। ওর মায়ের সাথে ওদের তিন বোনকে আমি দেখেছি অনেকবার।
গত কয়েকদিন আগে জানলাম বনানীর মেয়ে রিসিলা মারা গেছে। সেই রিসিলা মডেল হয়ে উঠেছিলো এবং সে ‘আত্মহত্যা’ করেছে।

খুব স্বাভাবিকভাবে বনানীকে একটা কনডোলেন্স জানানোর জন্য আমি খুঁজতে থাকি তার সেল নাম্বার এবং পেয়েও যাই।
বনানীর সাথে কথা হয়। সে কিছুতেই মানতে পারে না যে রিসিলা আত্মহত্যা করেছে। একটা মায়ের পক্ষে এটা মানা সত্যি-ই কষ্টের, তীব্র বেদনার! একজন মা মাত্রই তা অনুভব করতে পারেন।

মায়ের কথা:
ও মডেলিং করতো। বিয়ে হয়েছিল নিজের পছন্দে। একটা বাচ্চা আছে। বাচ্চা এখন আমার সাথেই থাকে। বাচ্চার বয়স এখন সাড়ে তিন বছর। সময় ৩১শে জুলাই। ২০১৭। দুপুর বারোটায় ফোন আসে আমার মোবাইলে। ফোন করে রিসিলার স্বামী। রিসিলার ছোট বোনকে বলে, সে যেন গিয়ে রিসিলার ফ্ল্যাট থেকে রিসিলার মেয়েকে নিয়ে আসে। তার বোন ২০ মিনিটের মধ্যে রিসিলার ফ্ল্যাটে পৌঁছায়, বেল দিতেই ঘুম ভাঙ্গা চোখে রিসিলা দরজা খুলে দেয়, ওর বাচ্চা তখনো ঘুমাচ্ছে। বারবার করে কনফার্ম হয় তার স্বামী বলেছে কিনা বাচ্চা নিয়ে যেতে!
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে!
ঘুমন্ত বাচ্চাকে ঘুম থেকে তুলে ওর বোন। রিসিলা দেখিয়ে দেয় কী কী জিনিস নিতে হবে। বাচ্চা বোনের সাথে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বিষণ্ণ মুখে বাচ্চাকে বলে মা’কে একটু জড়িয়ে ধরে আদর করে দিতে। রিসিলা কি কিছু সেন্স করছিল?
ঠিক ১২.৪০ মিনিটে রিসিলার বোন নিজ বাসায় পৌঁছায় বাচ্চা নিয়ে। তার থেকে ৫-৭ মিনিটের মাথায় রিসিলার মায়ের ফোনে ফোন আসে তাড়াতাড়ি যেতে রিসিলার বাসায়, কারণ সে আত্মহত্যা করছে। সে আত্মহত্যা করছে তার স্বামীকে ভিডিও কলে রেখে…

আবার ফোন ৫ মিনিটের মাথায়, কেন মা পৌঁছাতে এতো দেরি করছে? এতোক্ষণে করে ফেলেছে …
মা বনানী কবির যখন রিসিলার ঘরের দুয়ারে পৌঁছায়, তখন ওখানে অনেক ভিড়। উনি সিকিউরিটি গার্ডকে ডেকে দরজা ভাঙ্গান।
রিসিলা ঝুলছে ফ্যানের সাথে পা দুটো বিছানায়। রিসিলা অনেক লম্বা ছিল প্রায় ৫ ফিট ৮ ইঞ্চি। গলায় একটা কাপড় পেঁচানো, কাপড়টা রিসিলার শাড়ি নয়, ওড়না নয়, স্কার্ফ নয়। কী ওটা?
একটা চিকন লম্বা কাপড়, লম্বায় প্রায় শাড়ির সমান, কিন্তু প্রস্থে শাড়ির অর্ধেক বা তারও কম।
কোথা থেকে এলো?
নো কমেন্ট।
সুইসাইডের ভিডিওটা কি রিসিলার মা বা পরিবারের কেউ দেখেছে?
না।
পোস্টমরটেম রিপোর্ট কি ওর পরিবার দেখেছে বা হয়েছিল কী?
হয়েছিল, কিন্তু দেখেনি।
কী লেখা ছিল?
জানি না।
কখন গোসল ও দাফন হয়েছিল?
তার পরদিন। অর্থাৎ ১লা অগাস্ট। ১২ টার দিকে। বাবা গলায় হালকা একটা লাল দাগ দেখেছেন লিপসটিকের দাগের মতো। (যে কাপড় তার গলায় পেঁচানো ছিল ওর রং ছিল লাল।)
ওর স্বামীর সাথে আপনাদের যোগাযোগ আছে?
না।
ফেসবুকে?
আমরা সবাই ব্লকড।
ওর স্বামী কি সেই বাসায় আছে?
না।
এখন কোথায় থাকে?
তিন মাসে তিনবার বাসা বদল করেছে।
রিসিলার মোবাইল বা অন্য সব জিনিস কোথায়?
ওর স্বামীর কাছ।
পুলিশ কখন এসেছিল? কোনো আলামত জব্দ করেছিল স্পট থেকে?
এসেছিল ৩/৪ ঘণ্টা পর, শুধু মোবাইল নিয়ে গেছে।
মোবাইল এখন কোথায়?
জানি না। কিন্তু শুনেছি পুলিশ ওর স্বামীকে ফেরত দিয়েছে।
রিসিলার ফেসবুক কেউ একজন অপারেট করছে। সে কে?
জানি না।
কী এমন হয়ে গেল যে ১২.৩০ থেকে ১২.৫০ – এই বিশ মিনিট সময়ের মধ্যে সে ফাঁসির দড়িতে ঝুলে পড়লো?
জানি না।
কী মনে হয় আপনার?
আমার আত্মহত্যা মনে হয় না। হত্যা বা কোনো ষড়যন্ত্র হতে পারে। হতে পারে এর মধ্যে কেউ ঢুকেছিল ওর ফ্ল্যাটে। (এই ছিল রিসিলার মায়ের সাথে আমার কথোপকথন)।

আমি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বলতে চাই, আমি হয়তো এখানে কিছুই প্রমাণ করতে পারবো না। এটা প্রমাণ করার জায়গাও নয়। কিন্তু আমার বিবেক জানতে চাইছে কী হয়েছিল আসলে? কিন্তু কেন মিডিয়াগুলো ঘটনার তদন্তের আগেই ‘আত্মহত্যা’ বলে ঘটনাটা প্রতিষ্ঠিত করে ফেললো? সাংবাদিকদের কাজ কী আসলে?

আমরা একটা মেয়েকে নানান ভাবে মারি। মৃত্যুর পরও মারতে থাকি পৃথিবীর জঘণ্যতম উপায়ে। আমরা যখন তাকে লাগামহীন নানান অপবাদে ভূষিত করি, মেইনস্ট্রিম মিডিয়া থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় বা গেট টুগেদার থেকে পার্টিতে, সেই সময় কিন্তু তার মা তার বোন তার স্বজনেরা সবাই তা পড়ে ও শোনে।
কেমন লাগে তাদের একবার ভেবেছেন কখনও? কখনো ফিল করেছেন?
করেননি- করেননি বলেই মৃত্যুর ঠিক পরমুহূর্তেই খবর ছাপতে পারেন বা লিখতে পারেন ও আত্মহত্যা করেছে। কোন অফিশিয়াল তথ্য প্রমান ছাড়াই! শুধুমাত্র স্যারকামস্যিয়াল এভিড্যান্স এর উপর ভিত্তি করে? চোখ কি যা দেখে কান যা শোনে সব সঠিক হয়?

কোন পোস্ট মরটেম রিপোর্ট হলো না, কোন আলামত সিজ হলো না (মোবাইল ছাড়া), কারো প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য নেওয়া হলো না, তার মা-বাবার কোনো স্টেটমেন্ট নেওয়া হলো না, সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হলো না, ফরেনসিক রিপোর্ট এলো না, হায়, আপনারা বিচার করে ফেললেন?
কনক্লুশনে এসে গেলেন সে ড্রাগ নিতো, ইয়াবা নিতো, যাচ্ছেতাই জীবনযাপন করতো, ব্লা ব্লা ব্লা …
এই জাজমেন্ট দেওয়ার আপনারা কে? আপনারা কি মাননীয় আদালত?
এই স্বাধীনতা পেলাম আমরা? এই সেই প্রত্যেকটা বীরঙ্গনার বাবা ‘বঙ্গবন্ধুর’ বাংলাদেশ? আমরা কি সূর্য সেন, প্রীতিলতার সত্যি-ই উত্তরসুরি?

একটা মেয়ে যে প্রতিদিন যুদ্ধ করছিল বাঁচার জন্য, তাকে মৃত্যুর পরও বারবার নোংরাভাবে মারছি কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়া? আরে আমরা মেয়েরা তো এই সমাজে মরতে মরতে বেঁচে থাকি, মরার পরই না আমাদের জীবন শুরু হয়।
আপনাদের এই সমাজ কি মরার পরও বাঁচতে দেবে না কোনো নারীকে?

আমরা কিছুই খুঁটিয়ে দেখলাম না। সত্যিই যদি রিসিলা আত্মহত্যা করে থাকে, তাহলে করেছে। কিন্তু কেন কোনো তদন্ত চলার সময়ে লেখা হয় আত্মহত্যা? আপনারা কি জানেন না বিখ্যাত লি-বেন থিওরি? ‘যখন ম্যাস পিওপ্যাল একই কথা বারবার বলতে থাকে, একজন হাই ইনট্যাক্ট মানুষ যদি তাদের কথা শোনে বা যোগ দেয় তাহলে তার ইন্টেলেকচুয়াল লেভেল ম্যাস পিওপ্যালের লেভেলে নেমে যায়’, কেন তবে এতো জ্যাজমেনটাল হওয়া?
কোন আলামত সিজ না হলেও (মোবাইল ছাড়া ), কোন ফরেনসিক এক্সপার্টের মতামত নেওয়া না হলেও, কেউ আসামী না হলেও, সিসিটিভি ফুটেজ সিজ করা না হলেও, শুধু আন্দাজের ভিত্তিতে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার কারণ এখন সমাজে ইয়াবা, ড্রাগ, সুইসাইড, নারী, হত্যা এগুলো ডালভাত হয়ে গেছে। কারণ রিসিলার পরিবারের হাই প্রোফাইল কানেকশন নেই।

সে আত্মহত্যা করেছে, কী করেনি, ওটা এখানে প্রধান ইস্যু নয়, কিন্তু আমি ভীত, খুব বেশি ভীত, কারণ এর পর আমরা পরিকল্পনা করে যে কোনো নারীকে হত্যা করে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দেবো আর মেইনস্ট্রিম মিডিয়া থেকে সোশ্যাল মিডিয়া পর্যন্ত সবাই তার এক্সক্লুসিভ কভারেজ করবে আত্মহত্যা বলে।
ড্রাগ এডিকট বলে, এনটি সোশ্যাল বলে।
আর আমরা?
মুড়িঘণ্টেরগল্প করতে করতে তা রেলিশলি গিলবো আর লিখবো আত্মহত্যার শাস্তির বয়ান! মহাপাপ! মহাপাপ!

মেয়েটা বাঁচার জন্য প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে করতে সে যদি আত্মহত্যা করেও থাকে, তাহলে সেই দায় কি একটুও আমাদের ঘাড়ে আসে না? কে তাকে প্রভোক করলো? কে তাকে ড্রাগ সাপ্লাই করতো? সে যদি এডিকট’ই হয়ে থাকে, তার স্বামীর কি দায়িত্ব ছিল না তাকে রিহাবে দেওয়া? সাইক্রিয়াটিসট দেখানো বা সাইকো থেরাপিসট? যদি সে অসৎ জীবনযাপন করতো, তাহলে তার স্বামী কি আঙ্গুল কামড়াচ্ছিল সাত বৎসর ধরে?
প্রেম করে বিয়ে করতে পারে, সন্তানের জন্ম দিতে পারে, লং ড্রাইভে যেতে পারে, ড্রাগের কথা জানতে পারে, এডিকশনের কথা জানতে পারে!
কেবল পারে না স্ত্রীর দায়িত্ব নিতে!

রিসিলা জানতো না এই পচাগলা সমাজে সততা প্রেম সংসার বিষণ্ণতা কষ্ট কমিটমেনট এগুলো নিজ থেকে প্রমাণ করা যায় না। এর জন্য জনসভা লাগে, জনমত লাগে, পলিটিক্যাল ব্যাক আপ লাগে, সোশ্যাল ব্যাক আপ লাগে, সবচেয়ে বেশি লাগে মিডিয়ার ব্যাক আপ। আমি বলবো রিসিলার মতো হাজার রিসিলা ‘ইজ অ্যা এবসুল্যেট ভারডিকট অফ ট্রায়াল বাই মিডিয়া’।
এতোদিন পর আমিই বা জানলাম কেন, কলম ধরলাম কেন, তা উপরে যিনি বসে আছেন তিনি-ই জানেন। কিন্তু আমার মনে হয় আমার মাধ্যমে ও ওর ফেলে যাওয়া নিষ্পাপ কন্যাকে জানাতে চেয়েছিল,
মাটি খুঁড়ে দেখে নিও পাপ ছিল, নাকি ছিল না। এতোগুলো মাস ধরে রিসিলা হয়তো এই কথাগুলোই বলতে চাইছিল তার মেয়েকে।
ও একদিন বড় হবে হয়তো, আমি থাকবো না, কিন্তু আমার লেখাটা যেন থাকে, ও হয়তো ওর মায়ের মৃত্যুর ব্যাপারে কিছুটা হলেও জানবে।

(কিছুক্ষণ (রাত ৮.৩৫ মি, ২৯শে অক্টোবর) আগের খবর: রিসিলার সাড়ে তিন বছর বয়সী মেয়েটিকে ওর বাবা দেখার কথা বলে নিয়ে গেছে, আর এরপর থেকেই তার ফোন বন্ধ।)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 616
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    616
    Shares

লেখাটি ৫,৩৫৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.