মূল্যবোধ সচেতন ফরাসিরা

0

ফারজানা আকসা জহুরা:

গত বছর আমার পার্টনার ব্যাংকে তার প্রয়োজনীয় কাজ করতে গিয়ে স্থায়ী আবাসিকের কার্ডিটি আর পাচ্ছিল না। তার মনেও নেই কার্ডটি সে কোথায় হারিয়েছে! তার কয়েক মাস আগেই ফ্রান্সের টেরোরিস্ট হামলা হয়েছে। তাই আমি খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। অবশ্য অনেকেই তাদের অভিজ্ঞতা থেকে বলছিল যে, এটা নাকি চিন্তার কিছু না। কেউ যদি কার্ড পায় তাহলে নাকি তারা আমাদের ঠিকানায় পৌঁছিয়ে দিবেন! কেন জানি কথাটা আমার বিশ্বাস হয়নি। তাই জোর করে আমার পার্টনারকে প্রিফেকচারে অর্থাৎ পুলিশ স্টেশনে পাঠালাম রিপোর্ট করার জন্যে। অথচ এক মাস যেতে না যেতেই এক ব্যক্তি নিজের টাকা খরচ করে কার্ডটি আমাদের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলেন!

আবার আমার এক বোন, ভুল করে প্রিফেকচারের ভিতরে সদ্য হাতে পাওয়া অস্থায়ী আবাসিকের কাগজ ফেলে রেখে চলে আসেন। বাসে করে বাসায় আসতে তার একটু দেরি হচ্ছিল। কিন্তু যখন সে বাসায় ঢুকবে, ঠিক তখন এক ফরাসি ভদ্রলোক তার নাম ধরে ডাকে। বোনটি তাকাতেই দেখে লোকটি তার ঐ অফিসে ফেলে আসা গুরুত্বপূর্ণ অস্থায়ী আবাসিকের কাগজটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। অথচ বোনটি তখনও খেয়াল করেনি যে সে তার অতি মূল্যবান কাগজটি ঐ অফিসেই ফেলে এসেছে!

কথাগুলি অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা এটাই। এইদেশে আপনার প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট কখনও হারাবে না। এমনকি আপনার যদি চিন্তাই হয় কিংবা ব্যাগ চুরি হয়, তবুও আপনার কাগজপত্র আপনি ফেরৎ পাবেন। সাধারণ রাস্তায় পড়ে থাকা কাগজপত্র যদি কারোর চোখে পড়ে, সে সেইগুলি নিজেই পোস্ট করে দেয়। আবার কোনো অফিসে যদি ভুল করে প্রয়োজনীয় কোনো কাগজ ফেলে এলে কিংবা অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত কোনো কাগজ জমা দেন, সেইগুলিও আপনাকে কর্তৃপক্ষ ফেরৎ পাঠাবে।

শুধু কাগজপত্র না, যদি কেউ চুরি না করে, তাহলে আপনি আপনার ফেলে যাওয়া জুতা ব্যাগও ফেরৎ পাবেন। আর আমার নিজেই এমন হয়েছে কয়েকবার!

আমার মেয়ে তখন নতুন নতুন হাঁটতে শিখেছে কিন্তু পায়ে জুতা রাখতে চাইতো না। একবার এক ভাবীর বাসায় যাওয়ার সময় মেয়ে সদ্য কেনা নতুন জুতা হারিয়ে ফেলে। আর তাড়াহুড়োতে আমিও খেয়াল করিনি। বাস থেকে নেমে যখন খেয়াল করলাম তখন ভাবীর বাসার সামনে! কী আর করা! সারা দিন মন খারাপ! নতুন জুতা আমার অসাবধানতার জন্য হারিয়ে ফেলেছি।

সন্ধ্যায় আবার যখন বাসায় ফিরছিলাম। ঠিক তখন রাস্তার ওপাশের তাকাতেই দেখি যাত্রী ছাউনিতে মেয়ের জুতা রাখা। কী অবাক করা কাণ্ড! কোনো এক সচেতন নাগরিক সযত্নে মেয়ের জুতা সিটের উপরে তুলে রেখেছেন। আর একা একা বাচ্চা সামলাতে গিয়ে এই ধরনে অঘটন প্রায় ঘটাতাম। আর সচেতন লোকেরা আমার ছোট ব্যাগ, ছেলে মেয়ের জুতা সবই ফেরত দিতেন।

আসলে ফরাসিরা তাদের শিশুদের খুব ছোট থেকেই সচেতন নাগরিক হওয়ার সকল শিক্ষা দিয়ে থাকে। বড়দের প্রতি সম্মান, ছোটদের আদর, পথচারী ও প্রতিবেশীর সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া, এই ধরনের মূল্যবোধ তাদের হাতে কলমে শেখানো হয়।

এছাড়াও রাস্তাঘাটে সর্বত্র আপনি আন্তরিকতার ছোঁয়া পাবেন। বাস চালক, দোকানদার, এমনকি পথচারিরা একে অপরকে সকলেই “বঁজু” Bonjour বলে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এছাড়াও “মেসি” (Merci) ধন্যবাদ আর “থে জন্তি” (Très gentil) খুব ভালো বা চমৎকার, এই রুপ শব্দের ব্যবহার খুব বেশি। এছাড়াও পথচারীরা সবসময় একে অপরকে সাহায্য সহযোগিতা জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়।

এই সেদিন এক ভাই বললেন যে, তার নতুন গাড়ির চাবিটি তিনি গাড়ির সাথে রেখেই ভুল করে কাজে চলে যান। এক ফরাসি ভদ্রলোক, সেই চাবিটি নিয়ে একটি চিঠি রেখে যান গাড়ির উপরে। ঐ চিঠিতে লোকটির নাম আর ফোন নাম্বার দেওয়া ছিল। ভাইটি পরে বিষয়টা বুঝতে লোকটিকে ফোন দিতেই লোকটি ভাইয়ের বাড়িতে এসে চাবি দিয়ে যান।

এর চেয়েও অবাক করা ঘটনা হলো, গত মাসে আমি আমার মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে সরকারী হাসপাতালের গিয়ে ছিলাম। ডাক্তারি পরীক্ষার সময় আমার মেয়ে ও ছেলে এত চিল্লাচিলি করছিল যে, ওদের হাতে আমাদের দুইটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি আর দুইটি ভিজিটিং কার্ড দিয়ে ছিলাম। আসার সময় ঐগুলি নিতে মনে ছিল না। আর পরে যখন মনে পড়লো, তখন আমি চলন্ত বাসে। ভাবলাম ঐগুলি এতো গুরুত্বপূর্ণ না যে, হারিয়ে গেলে সমস্যা হবে!

অথচ সচেতন ফরাসি ডাক্তার! সযত্নে আমার ছবি আর ভিজিটিং কার্ডগুলি ঐ দিনই পোস্ট করে দিয়েছেন। মাত্র দিন পরেই ঐ কাগজগুলি পেয়ে আমি তো খুবই অবাক ! আমাদের বাংলাদেশের ডাক্তাররা যেখানে চিকিৎসার নিরাপত্তা দিতে পারেন না, সেখানে এই দেশের ডাক্তারা রুগীর ফেলে যাওয়া কাগজপত্রেরও দায়িত্ব নেয়!

কী চমৎকার সচেতনতা। সভ্য সমাজ বুঝি একেই বলে!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৯৩৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.