লেখক হওয়া সহজ, কিন্তু লেখিকা হওয়া কঠিন!

0

শরিফা তাসমীম টুলটুলী:

আপনার মাথায় গল্প ঘুরে বেড়ায়, আপনি গল্পগুলোকে কলমের কালি দিয়ে কাগজে আটকিয়ে রাখতে চান, গল্পের চরিত্রের ডায়লগগুলো আপনার মাথায় সারাদিন প্রতিধ্বনি করে, কিন্তু গত সপ্তাহে কিনে রাখা রান্না ঘরের মিষ্টি কুমড়াটা আপনাকে ডেকে বলবে, কী গো, আর কতদিন আমায় এভাবে ফেলে রাখবে? দ্যাখো, ফ্রিজে কিছু চিংড়ি আছে, ওগুলো দিয়ে আমাকে একটু কেটেসেটে রেঁধে ফেলো।

মাছ বের করতে যেই না আপনি ডিপ ফ্রিজ খুলবেন অমনি পলিথিনের ভেতরে বরফ হয়ে থাকা মুরগিটা আপনায় বলবে, বাচ্চা তো মাছ-টাছ খায় না, এক কাজ করো আমায় নিয়ে নাও, কম ঝাল দিয়ে রেঁধে ফেলো।
কয়েকটা কাঁচা মরিচ নিতে ফ্রিজের নিচের তাক খুলবেন, অমনি গত সপ্তাহের আনা পালং শাক আপনায় বলবে,”বলি, ও হতচ্ছারী, আমায় ক্যান পচাচ্ছিস গা? রেঁধে ফেল না আমায়। আজ না রাঁধলে কালই নির্ঘাত আমায় ফেলে দিতে হবে, এতো অপচয় ভালো নয়। ডালের ডিব্বাটা বলবে,”তোমার বর তো ডাল ভালো খায়, আমায়ও রেঁধে ফেলো। রান্নাঘর হুঙ্কার দিয়ে বলবে, “এতো যে আমার উপর অত্যাচার হচ্ছে, দয়া করে আমায় ভালো করে মুছে -টুছে রেখে যেও।

সকালে ধুয়ে দেওয়া কাপড়গুলোকে বারান্দা থেকে আনতে যাবেন, পেছনের বারান্দাটা আপনায় বিনীতভাবে বলবে, “কিছু সুক্ষ ধূলা আর কয়েকটা পাতা আমার উপরে, বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে একটু পরিষ্কার করে দেবে গো? আর শোনো, আমার যে যমজ বোনটা মানে তোমার ঘরের সামনের বারান্দাটার কথা বলছি, ওকেও একটু পরিষ্কার করে দিও।

এদের সবার আর্জি শুনে, আর তা মেটাতে মেটাতে আপনার দুপুর পেরিয়ে বিকাল ছুঁই ছুঁই হবে। এরপর ঘরের মেঝে আপনায় বলে উঠবে, উফ! আমার উপরে বড্ড জঞ্জাল! আর সইতে পারছি না, দে না রে একটু ঝাড়ু দিয়ে। ঠিক এমনভাবে খাবার টেবিল, বিছানা পত্র, আলমারি, আলনা সবাই বলবে, আমরা তো তোর সংসারেরই অংশ, রাখনা একটু পরিপাটি আমাদের!

তাদের দাবি আবদার মিটিয়ে সন্ধ্যায় আপনি গোসলখানায়। উঁকি দিয়ে দেখবেন শৌচাগার রেগেই আগুন, বলে বসলো, “এই যে মহাশয়া, গত দুদিন যাবত আমার উপর তোমরা সবাই মিলে যে নির্গমন করে যাচ্ছো, বলি আমি তো একটা কমোড, নাকি! সবকিছুর একটা সীমা আছে। গত দুদিন জীবাণুরা আমার চারপাশে হেঁটে বেড়াচ্ছে,গা ঘিনঘিন করছে, দয়া করে আমায় হারপিক দিয়ে ভালো করে মেজে দিবে, প্লিজ!

সব দাবি শেষে বাড়ির সবাইকে খাইয়ে, বিছানা পত্র গুছিয়ে দিয়ে যখন আপনি একটু বসবেন, আপনার শরীর আপনায় বলবে, কী গো, আর কতো, আমায় একটু বিশ্রাম দাও। আপনার চোখ দুটো বলে উঠবে, আমি যে আর খোলা থাকতে পারছি না, এবার একটু বিশ্রাম চাই।

আপনি আপনার চোখ আর শরীরের সব আবদার উপেক্ষা করে খাতা-কলম নিয়ে বসতে যাবেন, কম্পিউটারের কিবোর্ডে হাত দিবেন, ঠিক তখনই …আপনার খাতা-কলম আর কিবোর্ড বলে উঠবে, “এভাবে তুমি লেখিকা তকমা চাও! তুমি সারাদিন ধরণীর যাবতীয় কাজ শেষে এখন এলে আমাদের কাছে ঢুলুঢুলু চোখে! রোজ তুমি এমনই করো। ভেবেছো কী তুমি, লেখিকা হওয়া এতো সহজ?

ভুল ভাবছো, ওসব হবে টবে না তোমাদের দ্বারা, তোমরা রমণীকুল পুরোপুরি সংসার ধর্ম করবে, চাকরি করবে, আবার লেখালেখিও করবে! দুই নৌকায় পা দিয়ে নদী পার হওয়া বড় কঠিন, সেখানে তুমি দিতে চাচ্ছো তিন নৌকায় পা! বলি হে রমনী, তোমার ঠ্যাং তো দুখানাই! অতএব লেখিকা হবার ওসব স্বপ্ন-টপ্ন বাদ দাও বা – লি -কে!

কিন্তু, বালিকা/নারী থামে না। তিন নৌকায় পা দিয়েই সে নিয়ত চলতে থাকে, সফলতার স্বপ্ন দেখে। সে ভাবে, “এতো প্রতিকূলতার মাঝেও নারীর শরীর অথবা মস্তিষ্কে নয় তো বল কম, অতএব ধরণীতে নারীই তো উত্তম”।
ভালো থাকুক নারীকুল, শত প্রতিকূলতায় ও যেন এলোমেলো না হয় তার চুল, নারী যেন ভাঙ্গতে পারে পাহাড়সম ভুল।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

লেখাটি ১,৪৪৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.