অগ্রগতি, নাকি ভ্রান্ত পরিতৃপ্তি?

0

সারা বুশরা:

আচ্ছা এরকম মেয়ে কি এ যুগে আর খুঁজে পাওয়া যাবে, যারা রান্না ঘরের হাঁড়ি পাতিল নাড়াতে আর বাচ্চা পালার মধ্যে জগতের সকল সুখ অনুভব করে? নাকি এরকম ছেলেও আর খুঁজে পাওয়া যাবে, যাদের এমন বউ পছন্দ? স্মার্ট ও কর্মজীবী মেয়েরাই আজকাল বউ হিসেবে অনেক বেশি অভিপ্রেয় বলেই আমি জানি… তাই যখন অনলাইনে নানান জনের লেখায় এখনও এই ব্যাপারে অভিযোগ আর প্রতিবাদের সুর পাই তখন খানিকটা অবাক না হয়ে পারি না।

বেশির ভাগ আন্দোলন এর টপিকই থাকে মেয়েদের আরও স্বাবলম্বী হতে হবে, আর সেক্ষেত্রে স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকেদের পূর্ণ সহযোগিতা থাকা বাঞ্ছনীয়। যারা এখনো ঘরের বৌদের বাইরে কাজ করার ক্ষেত্রে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন বা careerist মেয়েদের বৌ হিসেবে চান না তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর জন্য কত রকমের পোস্ট, কতই না প্রতিবাদ, অথচ আজ পর্যন্ত এরকম একটি লেখা পেলাম না যেখানে নারীদের স্বতন্ত্রতার ও স্বাধীনতার সবগুলো aspects এর প্রতি সমানভাবে আলোকপাত করা হয়েছে….আমরা কেবল অধিকারের একটা দিক প্রতিষ্ঠা করতেই সোচ্চার হয়েছি। একবারও খেয়াল কেন করছি না যে আরেকটা দিক বাদ পড়ে যাচ্ছে…..

একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই, ২০০৮ সালের শেষ এর দিকে আমার এক বান্ধবীর বিয়ের কথাবার্তা চলার সময়ে পাত্র পক্ষের লোকজন শর্ত দিয়েছিলো মেয়েকে অবশ্যই চাকরি করতে হবে, কারণ তাদের ছেলে একা সংসারের বোঝা (!!!) টানতে পারবে না। অতি আধুনিক লোকজনের হয়তো কথাটা ভালো লাগলেও লাগতে পারে, কিন্তু আমার বান্ধবী ও তার মা-বাবার এই শর্তটি ভালো লাগেনি বিধায় তারা আর বিয়ের কথা নিয়ে সেখানে এগোননি…তাদের কাছে মনে হয়েছিল, মেয়ে যখন শিক্ষিত, সে যদি চায় অবশ্যই জব করবে, কিন্তু সেটা শর্ত দিয়ে মাথার ওপর জোর করে কেন চাপিয়ে দিতে হবে? তাহলে যারা বৌকে জব করতে বাধা দেয়, তাদের সাথে তফাৎ কী থাকলো? সেই একই তো হলো ”জোর করা” বা ”মেয়েটির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা”…

এরকম মানসিকতার মানুষ কিন্তু একটা দুইটা নয়, প্রচুর আছেন। হয়তো তাদের বলার ধরন আরেকটু মার্জিত, আরেকটু সভ্য। কিন্তু তারা ষোলো আনা কামাই করা বৌ চান, আর সেই পয়সায় আরাম আয়েশ করে জীবন কাটানোকে সোসাইটিতে নিজেদের স্ট্যাটাস মেইনটেইন করা হচ্ছে বলেই মনে করেন। কিছু কিছু ছেলের মা আবার মনে প্রাণে চান বৌ কাজের জন্য সারাদিন বাইরেই থাকুক, এতে করে সংসারের উপর পুরো কর্তৃত্ব তাঁর একারই বজায় থাকবে।
বৌ সারাদিন কাজের পর ক্লান্ত হয়ে বাড়ি এসে অন্য কোনোদিকে মন বা চোখ দেয়ার সময় বা সুযোগ পাবে না, কাজেই সংসার তিনি নিজের হাতের মুঠোয় রেখে পরিচালনা করতে পারবেন। এক্ষেত্রে সবদিক থেকে ঠকে কে? সেই মেয়েটি, যে সারাদিন পরিশ্রম করে বাসায় ফিরছে, নিজের সন্তানকে ঠিকমতো সময় দিতে পারছে না, নিজের উপার্জনের টাকা সংসারে ঢালছে, অথচ সংসারের কোনো সিদ্ধান্তে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। এ কিরকম অগ্রগতির নমুনা? আর কেউ না হোক, আমি অন্তত বুঝতে অপারগ।

আমার সামান্য জ্ঞান দিয়ে এটুকু জানি, এযুগের কোনো মেয়ের জন্যই শুধু ”মিসেস অমুক” অথবা ”অমুকের মা” এই দুটো উপাধি যুক্তিযুক্তভাবে কাম্য হতে পারে না, কিন্তু তবুও কোনো মেয়ে যদি এতেই সুখ পায় তাহলে কারো কি কিছু বলার আছে? না বলা উচিত? এক এক জনের কাছে সুখ এর সংজ্ঞা এক এক রকম…. তাই নয় কি? আবার কেউ ভাবতে বসবেন না যে আমি হাউস ওয়াইফ হওয়াকে promote করছি। একদমই না….

আমার মা’র যখন ২৩ বছর বয়স তখন থেকে তিনি চাকরি করেন, আজ এই ৫৭ বছর বয়সেও তিনি জব করে চলেছেন। মার সাথে বাইরে কোথাও গেলে সেখানে যদি তার ছাত্রছাত্রীদের বা তাদের মা-বাবাদের সাথে দেখা হয়ে যেত, অবাক বিস্ময় আর গর্ব নিয়ে দেখতাম তারা কত বিনয়, কত সম্মান আর কত সমীহ করে মা’র সাথে কথা বলছে। আজ পুরনো কোনো কলেজ এর ক্লাসমেট এর সাথে কথা হলে তারা সবার আগে জিজ্ঞ্যেস করে, ”ম্যাডাম কেমন আছেন?”

তাই মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়ার, স্বামী সংসার ছাড়াও নিজের আলাদা একটা আইডেন্টিটি থাকার মর্ম, মূল্য আর প্রয়োজনিয়তা আমি যথেষ্ট ভালো করেই জানি। আমি নিজেও জব করেছি, যখন আর ইচ্ছে করেনি ছেড়ে দিয়েছি, যখন ভালো লাগবে তখন আবার নতুন করে শুরু করবো, তাই কাজ না করার পক্ষে কোনো কথাই আমি বলছি না, বা বলতে পারি না। আমার একটাই কথা, একটাই প্রতিবাদ, একটাই দাবি আর সেটা হলো, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী কী করবে, সেটার সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র তার কেন হবে না?

কোনও মেয়ে যদি বিয়ে না করে সারাজীবন নিজের মতো থাকতে চায়, একা কাজ করে খেতে চায়, তাহলে কেন সমাজ তাকে জোর করে বিয়ে করতে বাধ্য করে? কেউ যদি শোবিজ এর অংশ হতে চায়, তাহলে কেন ধর্মের দোহাই দিয়ে তাকে সেই পথ এ যাওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য সবাই এতো উঠে পড়ে লাগে? কোনও নারী যদি মা হতে না চায়, তবে কেন আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশী আর শশুড়বাড়ির লোকজন ‘বাচ্চা নাও না কেন’ বলে বলে তার মাথা খারাপ করে দেয়? তাহলে কোন জিনিষটা একটা মেয়ের/নারীর নিজের ইচ্ছায় হচ্ছে?

একটা মেয়ের বা নারীর ঘরে থাকা বা বাইরে কাজ করা নয়, জরুরি হলো তাকে তার ইচ্ছা অনুযায়ী চলতে দেয়া। সে কী করবে আর কী করবে না এটার সিদ্ধান্ত তার একান্তই নিজের হওয়া, তাকে কোনো কিছু করতে বাধ্য না করা….তাই নয় কি? সেটাই কি স্বাধীনতার সত্যিকার সংজ্ঞা হওয়া উচিত না? স্বাবলম্বিতা মানে শুধু রোজগেরে হওয়া না, এটা কেন সমাজের অধিপতিরা বলেন না? কেন আমাদের নামি দামি প্রভাবশালী লেখিকারা শুধুমাত্র সমস্যার একটা অংশ নিয়েই মাথা ঘামান?

একজন নারী হাউস ওয়াইফ হবে নাকি মিড্ ওয়াইফ হবে, কর্পোরেট অফিসার হবে নাকি পুলিশ কনস্টেবল হবে, বিমানবালা হবে নাকি ম্যাকডোনাল্ডস এ বার্গার ভাজবে, মঞ্চে নাটক করবে নাকি মিসেস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবে সেটা তো একান্তই তার ব্যাপার, সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, একদমই তার নিজস্ব ইচ্ছা।এখানে অন্য কারও অনুমতির অপেক্ষা কেন করতে হবে?

যতদিন না একজন নারী উৎফুল্ল চিত্তে নিজের পছন্দমতো কাজটি বেছে নিতে পারছে, যতদিন না সমাজ, মা-বাবা, স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোক তার উপর কিছু করার বা না করার শর্ত রাখা বন্ধ না করছে ততদিন কিন্তু নারী পরাধীনই থেকে গেলো। জব করা মানেই যে সবলা হয়ে গেলাম এই মিথ্যে সান্তনা নারীরা নিজেকে আর কতদিন দিবে আমার জানা নেই, কিন্তু আমি আশা করবো সেই দিন দূরে নয়, যখন শুধু চাকরি করা বা টাকা উপার্জন করা নয়, নিজের ইচ্ছামতো প্রফেশন চয়েস করতে পারার আনন্দে আনন্দিত আর গৌরবে আমরা গৌরবান্বিত হবো, সেদিনই আমরা নারী স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ বুঝবো আর সেটাই হবে মেয়েদের সত্যিকার অগ্রগতি। ততদিন পর্যন্ত আমাদের এই ফাঁকিতে ভরা আত্মতৃপ্তি নিয়েই থাকতে হবে মনে হচ্ছে। কী আর করা?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 440
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    441
    Shares

লেখাটি ১,৬১০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.