রাজা, তোর কাপড় কোথায়?

0

রহমতউল্লাহ ইমন:

শৈশবে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়নি এমন শিশু বিশেষ করে কন্যা শিশু খুঁজে পাওয়া বিরল। এ সময় অনেক ছেলে শিশুও যৌন নিগ্রহের শিকার হয় তবে আনুপাতিক হারে বেশ কম। আর যে কারণে আমরা যে বয়সে শারীরিক বিষয় সম্পর্কে অনেকটাই অসচেতন ছিলাম, আমাদের সমবয়সী মেয়েরা তখন থেকেই রীতিমত শরীর বাঁচিয়ে চলা শিখে ফেলেছে কেননা ঘরে বাইরে তারা ইতোমধ্যেই নানা ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে।

আমি শহরের ছেলে হলেও বছরে অন্তত দুইমাস কাটাতাম গ্রামে। আর সে কারণেই শরৎচন্দ্রের পল্লীসমাজ আমার নিজের চোখে দেখা- তা শহুরে বাবুদের চোখ দিয়ে দেখা নয়। আর তা থেকেই বুঝেছি এই যৌন নিগ্রহের ব্যাপারটি গ্রামে শহরের থেক কোন অংশে কম তো নয়ই- বরং ক্ষেত্র বিশেষে বেশিই। তখন বয়স খুবই কম। তারপরেও ঘটনাটি মনে আছে। প্রতিবেশি একজনের বাসায় একটি অনুষ্ঠান চলছিল- ধর্মীয় অনুষ্ঠান রাতের বেলায়। হঠাৎ করেই আমারই সমবয়সী একটি মেয়ের আর্ত চিৎকারে সবাই সেদিকে ছুটে গেল। টুকরো টুকরো নানা কথা কানে ভেসে আসতে লাগল। যতটুকু বোঝা গেল প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবার জন্য মেয়েটি অন্ধকারে একটু নির্জন জায়গায় যেতেই বাবার বয়সী এক প্রতিবেশী তাকে ধর্ষণে উদ্যত হয়। মেয়েটির চিৎকারে পরে সে দৌড়ে পালিয়ে যায়। কয়েকজন যুবক বয়সী ছেলেকে দেখলাম সেই দুর্বৃত্তকে ধরার জন্য ছুটোছুটি করতে, কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না। এবার পরিস্থিতি একটু শান্ত হবার পর দেখলাম মেয়েটির মায়ের পুরো ক্ষোভ পড়লো নির্যাতিতা মেয়েটির ওপরেই। মেয়েটি তখনও ট্রমার শিকার হয়ে থরথর করে কাঁপছে। কিন্তু সব দোষ তার।
কেন সে রাতের আঁধারে নির্জন জায়গায় গেল? তার থেকেও বড় যে কথাটি সেই মা মেয়েকে বলেছিলেন তা এখনও আমার কানে বাজে। ‘না হয় দিসিলোই তোর গায়ে আত, তাই কইয়ে এম্বায় চিল্লোবি? এট্টু চুপ থাহতি পারলি তো আর কেউ জানতি পাইরতনা। এহন যে গিরাম শুদ্দু লোক জানাজানি হইয়ে গেইল, তোরে ক্যম্বায় এহন বিয়ে দিবানে?’ একটা আধবয়সী বুড়ো লোক ধর্ষণ করতে গেল তাতে দোষ নেই- যত দোষ হলো শিশুটির চিল্লানোর কারণেই। চুপ থাকো- সব অন্যায় মেনে নাও, তাহলেই তো আর কোন সমস্যা থাকে না।

দেশে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মওসুম চলছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা অনুষদের ভর্তি পরীক্ষার ৭৬ নম্বর প্রশ্নটি ছিল এমনঃ

৭৬। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থের নাম কি?
(ক) পবিত্র কুরআন শরীফ, (খ) পবিত্র বাইবেল, (গ) পবিত্র ইঞ্জিল, (ঘ) গীতা

পরীক্ষার্থীদের সঠিক উত্তরে টিকচিহ্ন দিতে হবে। প্রশ্নটি দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। ভাবা যায় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের, তাও আবার চারুকলার মতো অনুষদের শিক্ষক এমন প্রশ্ন করতে পারে, আবার তা সমীক্ষণ বোর্ডের নজর এড়িয়েও যেতে পারে? এই অকাট মুর্খ নিজেই জানে না যে বাইবেল আর ইঞ্জিল একই গ্রন্থ।

তবে কথা সেটি নয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এমন সাম্প্রদায়িক, দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রশ্ন কেউ করতে পারে এটি কল্পনার অতীত। এর সঠিক উত্তর কী? নিশ্চয় একেক জন একেকভাবে এর উত্তর দেবেন। একজন পরীক্ষক কোন উত্তরকে সঠিক ধরে নম্বর দেবেন? এমন কোনো পরীক্ষার্থীও তো থাকতে পারে যে এর কোনটিকেই সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ বলে মনে করে না। আর তিনটি ধর্মগ্রন্থের পূর্বে পবিত্র লেখা থাকলেও গীতার আগে তা লেখা হয়নি। অর্থাৎ প্রশ্নকর্তা গীতাকে অপবিত্র গ্রন্থ বলে মনে করেন।

এ ধরনের বিষয় কোনভাবেই অনিচ্ছাকৃত ভুল হতেই পারে না। এটি ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেবার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে। এই ধরনের প্রশ্নকর্তাকে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা আশু প্রয়োজন। তবে পরিতাপের বিষয়, কেউ কেউ সেই প্রশ্নকর্তার কোন অপরাধ খুঁজে পাচ্ছেন না। অপরাধ তাদের, যারা এর প্রতিবাদ করছেন। এই প্রতিবাদের কারণেই নাকি লোক জানাজানি হচ্ছে আর তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। সব শুনে হাসবো না কাঁদবো, বুঝে উঠতে পারছি না।

হায় ভাব- হায় মূর্তি! ছোটবেলার সেই ঘটনাটিই আবার মনে পড়ে গেল ‘না হয় দিসিলোই তোর গায়ে আত, তাই কইয়ে এম্বায় চিল্লোবি? এট্টু চুপ থাহতি পারলি তো আর কেউ জানতি পাইরতনা। এহন যে গিরাম শুদ্দু লোক জানাজানি হইয়ে গেইল, তোরে ক্যম্বায় এহন বিয়ে দিবানে?’

অন্যায় সহ্য করতে করতে পরিস্থিতি এই পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে এখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকেই অন্যায় ভাবা হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে এখন তাঁর ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে’ চরণটির জন্য করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।

উলঙ্গ রাজা রাস্তায় নেমেছেন। তার তো কোনো লজ্জা নেই। এমনকি যারা তাকে দেখছেন লজ্জা করছে না তাদেরও কেননা তারা ভাবছেন রাজা মশাই স্কিন কালারের সুইমস্যুট পরে ঘুরছেন। তাই এখন দরকার সেই শিশুটির. যে চিৎকার করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবে-

রাজা, তোর কাপড় কোথায়?

লেখক: প্রফেসর, স্ট্যাটিসটিকস, বল স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.3K
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares

লেখাটি ৩,৯৪৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.