বৃদ্ধ আশ্রম কনসেপ্টটা কি আসলেই খারাপ?

0

জেসিকা ইরফান:

কখনো ভেবে দেখেছেন কি? বৃদ্ধাশ্রমের বিষয়টা আমরা এমনভাবে তুলে ধরি যে ব্যাপারটা মনে হয় যিনি বৃদ্ধ আশ্রমে আছেন তিনি না জানি কী নিদারুণ কষ্টে আছেন, আর তাঁর ছেলেমেয়েরা না জানি কী নিষ্ঠুর!
অনেকটা বৃদ্ধাশ্রম আর কারাগারকে আমরা সমার্থক করে ফেলি!
কিন্তু আমার তো খুব ভালো লাগে ব্যপারটা।

একজন মানুষ সমস্ত জীবন ধরে অনেক অনেক রকম যুদ্ধ করে, কখনো জয়ী হয় কখনো পরাজিত হয়। কিন্তু সেই জয়ের গরিমা যতই থাকুক না কেন, বৃদ্ধ বয়সে এসে মানুষ যখন জরাগ্রস্থ হয় তখনই মানুষ কেবল উপলব্ধি করে সমস্ত পৃথিবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সাহস থাকলেও জরার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যায় না। এটা সাহসের ব্যপার নয়, অর্থ কড়ির ব্যাপারও নয়, এটা একটা ফিজিক্যাল স্টেইট। এটাকে মেনে নিতেই হয়। প্রকৃতিই এটাকে মেনে নিতে শক্তি যোগায়।

তাই খুব ধীরে চারদিকের আবহর মতো নিজের বুকের মধ্যের আবহ শান্ত থেকে শান্ততর হতে থাকে, মনও তখন অনেক অনেক কিছু মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। যা আগে ভাবতেই পারা যেত না।
এই মেনে নেওয়ার মধ্যে যেমন এক নিবিড় প্রশান্তি আছে, বাধ্যতামূলক প্রশান্তি ঠিক তেমন সফলতম মানুষেরও মনে একধরনের পরাজয়ের গ্লানিও মাখামাখি হয়ে থাকে। মাঝে মাঝেই নিজের জীবনকে নিভিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়।

যখন এই পৃথিবীকে দেওয়ার মতো আর কিছুই থাকে না, নেওয়ার মতোও আর কেউ প্রতিদিন অপেক্ষা করে না, তখন এই জীবনের ভার বওয়াটা সত্যিই অর্থহীন মনে হয়। একদিনের বা একজীবনের সফলতম মানুষও এই গ্লানির হাত থেকে বাঁচতে পারে না। প্রত্যেক মানুষকেই স্বীকার করতেই হয় সাফল্যের মধ্যেও এক গভীর ব্যর্থতা এবং একঘেয়েমি বোধ লুকিয়ে থাকে যারাই এই কথা উপলব্ধি করেছেন তারাই তা জানেন।
আরোহীর মধ্যেই সঙ্গোপনে লুকিয়ে থাকে অবরোহী। মানতেই হয় এই সত্য।

এবার আসি বৃদ্ধাশ্রম ছাড়া কী অপশন আছে আমাদের হাতে একজন অবরোহীর বা বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার জন্য। যদি ছেড়ে যায় তার সাথী (ভালো মন্দ যাই হোক)
১ । নিজের বাড়ি
২ । সন্তানের বাড়ি বা
৩। কোন আত্মীয় বাড়ি।

আমাদের সমাজে প্রায়ই সব মেয়েরই নিজের বাড়ি থাকে না। যদিও আমি এখানে শুধু মেয়েদের কথা লিখছি না। নিজের বাড়িতে একা থাকা রিস্কি হয়ে যায়। তাছাড়া বৃদ্ধ বয়সে একা একটা বাড়ি মেনটেইন করাও প্রশ্ন সাপেক্ষ। বিশেষ করে পুরুষের পক্ষে।  গৃহকর্মে সহায়তাকারী  লোকের এখন যা অবস্থা, সবার জন্য ওটা সব অর্থে বহন করাও সম্ভব হয় না। রাতদিনের কাজের লোকের ব্যাপারে একটা রিস্ক ফ্যাক্টর কাজ করে।

সন্তানের বাড়িতে থাকতে গেলে অনেকের নিজেকে বড় বেশি অপাক্তেয় মনে হয়। সারা জীবন ডিগনিটি বা স্বাধীনভাবে যে মানুষ বেঁচেছে, তাঁর তা মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, ওরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত। ওদের একটা পার্সোনাল লাইফ আছে, বাচ্চা আছে। বাবা-মা ছোট বেলায় যতটুকু কোয়ালিটি টাইম সন্তানদের দেয়, সন্তান কিন্তু তার সিকি ভাগও বৃদ্ধ বাবা-মাকে দিতে পারে না। এটা সম্ভবও নয় ,চাইলেও পারা যায় না। বয়স্ক মানুষটার কথা বলার বা শোনার কেউ থাকেন না। হয়তো বাবা-মার জন্য একটা রুম বরাদ্দ হয়। সে রুমে হয়তো একজন নাতি-নাতনীও ঘুমায়। সত্যিকার অর্থে ওটাকে কি নিজের রুম বলা যায়?

অনেকে হয়তো সকালে উঠে একটু প্রার্থনা করতে চায়, লাইট জ্বালাতে হয় অন্যদের ঘুমে ডিস্টার্ব হতেই পারে। এমন হাজারো কারণ আছে। তাছাড়া সবার সন্তান দেশে নাও থাকতে পারে। কী করবেন ওনারা? নিজেদের আজন্ম লালিত জায়গা ছেড়ে স্মৃতি স্বজন চেনা ভূমি সব ছেড়ে চলে যাবেন প্রবাসে?
কী করবেন ওখানে?
ভেবে দেখুন তো!
একই অবস্থা আত্মীয়ের বাড়ির।

একটা মানুষ যদি জীবনের সব দায়-দায়িত্ব শেষ করে ভাবেন আমি নিজের মতো করে কয়েকদিন বাঁচতে চাই, সম্পূর্ণ ভারহীন, তাহলে এটাকে কেন মন্দ বলবো আমরা?
পেছনে ফিরে জীবনকে দেখতে ইচ্ছে হতেই পারে, নিজের ভুল শুদ্ধ ন্যায় অন্যায় একবার জরিপ করার ইচ্ছে হতেই পারে … কোলাহলে তো তা সম্ভব নয়।
এর জন্য চাই নির্জনতা, সংসারে দাঁড়িয়ে নিজের মুখোমুখি হওয়া যায় না।
সংসারের বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে হয় একান্তে নিজের মুখোমুখি …।

মানুষ যখন ভারহীন হয়ে যায় বা বৃদ্ধ, মৃত্যু চিন্তায় সে আর মনে হয় না তেমন করে পীড়িত হয়। জীবনে হাজার হাজার মৃত্যুর মিছিল এর মধ্যে চোখে দেখে সেও জেনে যায়, ও মনে প্রাণে উপলব্ধি করতে শিখে মৃত্যুর মতো অমোঘ সত্য মানুষের জীবনে আর দ্বিতীয়টি নেই। বার্ধক্য মেনে নেয় মন, মৃত্যু আসছে এটাও, তখন এসব আর পীড়া দেয় না আদৌ। কারণ বার্ধক্য মৃত্যুর মতোই অবশ্যই বরণীয় ও সহনীয় একটা অবস্থা। এই নিয়ে অনুযোগ বা অভিযোগ অন্তত কোনো বুদ্ধিমানের করা উচিত নয়, করেও না।

এই বৃদ্ধ অবস্থায় এসে কেউ যদি মনে করেন আমি ভারহীন বাঁচবো, নিজের মতো করে একটু চিন্তা করবো ভুল শুদ্ধ হিসেব করবো বা বই পড়া ধর্ম চর্চা বা নিজের সুকুমার বৃত্তি যা তেমন করে কখনো নার্সিং করা হয়নি সংসারের চাপে, চারপাশে থাকবেন আমার মতো বয়স্ক কিছু মানুষ যাদের তারপর দিন অফিস যাওয়ার তাড়া নেই, পার্টি নেই, সামাজিকতা নেই। রান্নার বাজার করার বা সংসারের নিত্য ঝামেলার কোন দায় থাকবে না, অসুখ বিসুখে মাথার কাছে বসে থাকবেন কিছু মানুষ, যারা বয়সের পরম আত্মীয় বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা, বয়সের সহমর্মিতায় হাত রাখবেন মাথায়।

সময় সুযোগে বেড়িয়ে যাবে নিজের আত্মীয় স্বজন বা তিনিও থেকে আসতে পারেন কয়েকদিন তাদের কাছে …।
মন্দ কি বলুন ?
সাঁকোর ওপরে দাঁড়িয়ে আমি
ওদিকে রয়েছে গত, এদিকে আগামী
কোনদিকে যেতে হবে
বলে দেবে অন্তঃযামি।

(এ আমার একান্ত নিজস্ব মতামত । ভিন্নমত থাকতেই পারে এবং আমি ভিন্নমতের ওপর শ্রদ্ধাশীল)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 4.3K
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4.3K
    Shares

লেখাটি ১২,৪০২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.